গল্পটা আরও একটু বলি। শতানীকের মৃত্যুর পর নবীন রাজা সহস্রানীক রাজ্য চালাতে আরম্ভ করেছেন। ওদিকে কোনও মতে স্বর্গের রাজা ইন্দ্রও হটিয়ে দিয়েছেন অসুরদের। স্বর্গে বিজয় মহোৎসব আরম্ভ হল আর এই আনন্দ-বিজয়ের দিনে ইন্দ্রের মনে পড়ে গেল এই মর্তসধার কথা। তার দুঃখের দিনে মর্ত্য থেকে শতানীক এসেছিলেন তারই হয়ে যুদ্ধ করার জন্য। তিনি মারা গেছেন তারই জন্য। ইন্দ্র আবারও মাতলিকে পাঠালেন কৌশাখীতে, যাতে বন্ধুপুত্র সহস্রানীক তার এই বিজয়োৎসবে যোগ দেন
ততঃ শত্রু? সুহৃৎপুত্রং বিপক্ষ-বিজয়োৎসবে।
স্বর্গং সহস্রানীকং তং নিনায় প্ৰেষ্য মাতলিম্।
আমার কাছে এটা খুব বড় কথা নয় যে, সহস্রানীক স্বর্গের বিজয় মহোৎসবে অবশ্য যোগ দিয়েছিলেন। বড় কথা নয় এটাও যে, মর্ত্যের রাজাকে স্বর্গসুন্দরী তিলোত্তমা ডেকেছিলেন ক্ষণিক ভালবাসার জন্য। এত সব কাহিনীর বিস্তারে আমি আর যাব না। কারণ, আমার প্রশ্ন রয়ে গেছে সেই একটাই–কৌশাম্বী থেকে কত দূর সেই স্বর্গভূমি, যেখানে পৃথিবী রাজা সহস্রানীক নন্দন-বনের অন্তরালে দেব-পুরুষদের রমণী-বিলাসে মত্ত দেখেছিলেন? কোথায়, কত দূর সেই স্বর্গভূমি যেখান থেকে ফেরবার সময় মাতলির রথ-ঘর্ঘরে ডুবে গিয়েছিল তিলোত্তমার প্রেমের আহ্বান? আমরা সেই স্বর্গের ঠিকানা চাই।
আচ্ছা, গল্প শুনে মনটা যখন হালকাই আছে, তবে স্বর্গভূমির দার্শনিক চর্চা করে প্রাথমিকভাবে বিষয়টাকে একটু গভীর করে নেওয়াই ভাল। বস্তুত স্বর্ণ ব্যাপারটা একটা স্থান-বিশেষ, নাকি এই জায়গাটা একটা কল্পিত সুখের ‘অ্যাবস্ট্রাকশন’–তা নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে প্রবল মতভেদ আছে। বেদান্ত দর্শনের পণ্ডিতেরা বলেন-বেদের মন্ত্রে, উপনিষদের নানা তথ্য এবং পুরাণ-ইতিহাসের মধ্যে যেহেতু দেবলোক বা স্বর্গলোকের নানা বর্ণনা আছে, অতএব এ রকম একটা স্বতন্ত্র সুখভোগের স্থান অবশ্যই আছে, যেখানে দেবদেহ লাভ করে স্বর্গসুখ ভোগ করা যাবে। বেদাতীদের যুক্তি খুব সোজা। তারা বলেন–ধর, তুমি একটি শুয়োর। সারাক্ষণ নোংরা-কাদায় শুয়ে ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করা সেই শুয়োরের দেহ ধারণ করে অথবা শুয়োরের ভাবনা-চিন্তা মাথায় নিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের মতো স্বর্গসুখ ভোগ করবে, তা কি হয় বিড়-বরাহাদি-দেহেন ন হ্যৈং ভুজ্যতে ফলম্? স্বর্গসুখ চাইলে বাপু বেদ-বিহিত কর্ম করো, চিত্ত শুদ্ধ করো, তাহলে মরণান্তে দেবদেহ লাভ হবে, ভোগ করবে অনন্ত স্বর্গসুখ।
একই ভাবে খারাপ ভাবে জীবন চালিয়ে হাজারো অন্যায় করার পর নরক ভোগ করার জন্যও যে অন্য কোনও স্বতন্ত্র দেহ লাগবে, সেটাও মেনে নিয়েছেন দার্শনিকেরা। বাচস্পতি মিত্রের মতো সর্বদর্শনস্বতন্ত্র পণ্ডিত পর্যন্ত বলেছেন–ধর, তোমার অন্যায়-অভব্যতার নিরিখে বহু বহু বছর নরক-যন্ত্রণা নির্দিষ্ট হল। তত তোমার আয়ু যদি ষাট, সত্তর কি আশি হয়, তাহলে তো আর এই মানবদেহে শতবর্ষের শাস্তি-যন্ত্রণা ভোগ করা সম্ভব নয়। তাই নরক-ভোগ করার জন্যও স্বতন্ত্র দেহ চাই। দেহ যেমন চাই, তেমনই নরক নামে আলাদা কোনও জায়গাও আছে, তার প্রমাণ-কঠোপনিষদে যম-নচিকেতার কথোপকথনের জায়গাটা, অথবা ঋগবেদে বর্ণিত–বৈবস্বতং সংগমনং জনানাং/যমং রাজানমিহ তৰ্পয়ধ্ব–এই রকম একটা জায়গা।
বেদান্ত-দর্শনের পণ্ডিত যাঁরা, তাদের কাছে স্বর্গের যে ঠিকানা পেলাম, তা অবশ্যই পৃথিবীর বাইরে অবস্থিত বায়ুমণ্ডলের ওপরে কোনও জায়গা। আমাদের এই পৃথিবীতে নূতন দেহধারী নানা জীবকুলে আকীর্ণ এমন একটা জায়গা খুঁজে বার করা মুশকিল। বরং এ ব্যাপারে আমাদের পূর্ব-মীমাংসা দর্শনের আচার্যরা অনেক বেশি বাস্তব জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। ওঁরা বলেন, স্বর্গ বলতে আলাদা কোনও জায়গা, অথবা বিশেষ কোনও লোক বোঝায় না। স্বর্গ মানেই সুখ অথবা প্রীতি। এমন সুখ, যার মধ্যে দুঃখের স্পর্শমাত্র নেই এবং নিজের ইচ্ছামতো যেখানে সুখের বস্তু লাভ করা যায়–সেটাই স্বর্গ। তাহলে কি স্বর্গ বলে আলাদা কোনও জায়গা নেই? দুঃখস্পর্শহীন সুখই কি তাহলে স্বর্গকিং লোকবিশেষঃ স্বর্গঃ? উত সুখমাত্রম্?
পণ্ডিতেরা বলেন–মীমাংসক আচার্যদের চিন্তাভাবনা ভাল করে বিচার করলে দেখা যাবে–স্বর্গ বা নরকের জন্য আলাদা কোনও জায়গা স্বীকার করার কোনও প্রয়োজনই নেই। বিবরণ-জামেয়সংগ্রহ নামের একখানি গ্রন্থে বেদান্তীরা মীমাংসকদের মত উল্লেখ করে বলেছেন–ওঁদের মতে স্বৰ্গই বল আর নরকই বল–সে সবই এইখানে, এই মাটির পৃথিবীর ভোগসুখের মধ্যেইহৈব নরকস্বর্গাবিতি মাতঃ প্রচক্ষতে। জানি না, এই শ্লোক থেকেই ছোটবেলায় সেই কবিতা তৈরি হয়েছিল কি না–কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর? মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক… ইত্যাদি ইত্যাদি। ওঁদের মতে–মানুষ যদি মনে সুখ পায়, তাহলে স্বর্গ সেইখানেই। আর যদি সুখের বদলে যন্ত্রণাটাই প্রবল আকারে মনকে আচ্ছন্ন করে, তবে নরক-যন্ত্রণা সেইটাই-মনঃপ্রীতিকরঃ স্বর্গো নরক-স্ত-বিপর্যয়ঃ।
মীমাংসকদের কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন–অখণ্ড এবং নিরবচ্ছিন্ন সুখ অনুভব করার জন্য এমন একটা জায়গা চাই যেখানে শীত-উষ্ণ, এসবের দ্বন্দ নেই–যা প্রীতিঃ নিরতিশয়া অনুভবিতব্য, সা চ উষ্ণ-শীতাদি-দ্বন্দ-রহিতে দেশে শক্যা অনুভবিতু। আর আমাদের এই দেশটা এমনই যেখানে জীবনের একটা মুহূর্তও বুঝি কাটে না যেখানে এই দ্বন্দ্ব নেই–অস্মিংশ্চ দেশে মুহূর্তশতভাগো’পি দ্বন্দে ন মুচ্যতে।
