ঠাকুমা-দিদিমা, কৃত্তিবাস-কাশীদাসের বর্ণনায় স্বর্গের কথা শুনেছি কত। বড় মনোরম সে জায়গা। সেখানে দেবতারা থাকেন। গন্ধর্ব-কিন্নরেরা সেখানে নাচে, গান গায়। স্বর্গসুন্দরী অপ্সরারা বিলোভনী নৃত্যভঙ্গিতে সবার মনোরঞ্জন করে, রূপে-রসে মন ভোলায়। মানুষ বেঁচে। থাকতে সেখানে যেতে পারে না। মানুষ যদি অনেক পুণ্য করে, ইহলোকে যদি ভাল ভাল কাজকর্ম করে, তবে নাকি মৃত্যুর পর স্বর্গে যায়। আমাদের বেদ, মহাভারত, পুরাণ, ধর্মশাস্ত্র এবং অন্যান্য শাস্ত্রও তাই বলে। এমনভাবে বুলে যাতে মনে হয়–স্বর্গ যেন পৃথিবীর ওপর, অন্তরীক্ষ-লোকের ওপর এক দুর্লভ জায়গা। আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে কোনও কল্পনার জগৎ।
‘কল্পনার জগৎ’ কথাটা ঠিকই আছে, কিন্তু ধরা-ছোঁয়ার বাইরে কি না সেটাই শুধু বোঝবার। ভারি আশ্চর্য লাগে শুনতে, যখন মহাভারতেই দেখতে পাই–পৃথিবীবাসী কত রাজা স্বর্গে গেছেন দেবরাজ ইন্দ্রকে রণক্ষেত্রে সাহায্য করতে। রামায়ণের দশরথ গেছেন, পাণ্ডব কৌরবের পূর্বপুরুষ পুরূরবা গেছেন, দুষ্মন্ত গেছেন, আরও কত মানী রাজা, তাঁদের নাম। করতে চাই না। কালিদাসের কুমার রঘু তো স্বর্গরাজ্য আক্রমণই করেছিলেন। অপরদিকে মানুষের এই কর্মভূমি পৃথিবীতে দেবরাজ ইন্দ্রের গতায়াতও কিছু কম ছিল না। মানুষের মানসিক উন্নতি হলে, অথবা মর্ত্য রাজা যদি শতবার অশ্বমেধ করতেন তো ইন্দ্রের ভয় হত–তার ইন্দ্ৰত্বই চলে যাবে হয়তো। আরও একটা কথা, এই পৃথিবীর মানবী রমণীরাও দেবতাদের কম প্রিয় ছিলেন না–মহাভারতের অন্যতম প্রসঙ্গে সে সব কথা পরে জানাব। এখন শুধু একটা গল্প বলব–সোমদেব-ভট্টের কথাসরিৎসাগর থেকে।
গল্পটা বলব, কেননা, স্বর্গের সঙ্গে মর্ত্যভূমির যোগাযোগ কত গভীর, কত সহজ হতে পারে, সেটা বোঝা যাবে এই কাহিনী থেকে। আরও বলব এই কারণে যে, গল্পটা পাণ্ডব বংশেরই উত্তরপুরুষ জনমেজয়ের ছেলেকে নিয়ে। অবশ্য গল্প শোনার আগে মনে রাখবেন–কথাসরিৎসাগরের কবির পক্ষে মহাভারত-পুরাণ বা ভারতের ঐতিহ্যবিরোধী কোনও কথা বলা সম্ভব নয়। তাই কথাসরিতের কাহিনীকে শুধুই গল্প বলে উড়িয়ে দেবেন না। গল্পের অন্তরে যে বিশ্বাসটুকু আছে, সেই বিশ্বাস যে সাধারণ বিশ্বাস, সেটা মনে রেখেই গল্পটা শুনবেন।
গল্পের পটভূমি-ইতিহাস-বিখ্যাত সেই বৎস-দেশ। এমন সুন্দর সে দেশ যে মনে হয় বিধাতা যেন স্বর্গভূমির সঙ্গে পাল্লা দেবার জন্য প্রতিযোদ্ধার মতো তৈরি করেছিলেন এই দেশ-স্বর্গস্য নির্মিতো ধাত্রা প্রতিমন্নু ইব ক্ষিতৌ। এই বৎস দেশের মধ্যে আবার কৌশাম্বী নগরী, যেন পদ্মফুলের হলুদ-বরণ হৃদয়খানি। এই কৌশাম্বীতেই থাকতেন রাজা শতানীক, জনমেজয়ের ছেলে পরীক্ষিতের নাতি। অসীম তার প্রতাপ, প্রবল তার ক্ষমতা। রাজার স্ত্রীর নাম বিষ্ণুমতী। রাজার ঘরে এত ঐশ্বর্য, এত সম্পত্তি কিন্তু তার ছেলে নেই। মনের দুঃখে রাজা মৃগয়া করতে বেরিয়েছেন এবং হঠাৎ করে শাণ্ডিত্য মুনির সঙ্গে তার পরিচয় হয়ে যায়। মুনি যাগ-যজ্ঞ করে মন্ত্রপূত পায়েস খাইয়ে দিলেন রানিকে। যথাসময়ে রানির ছেলে হল, তার নাম হল সহস্রানীক। ছেলে বড় হতে তাকে যুবরাজ করে দিয়ে রাজা শতানীক ভাবলেন কিঞ্চিৎ ভোগ-বিলাস করবেন এবার। ছেলে বড় হয়ে গেছে, আর কত রাজকর্ম করবেন তিনি।
কিন্তু ক্ষত্রিয়ের ঘরে আরাম বেশিদিন সয় না। ভোগ করব ভাবলেই ভোগ করা যায় না। রাজা সুখেই আছেন, তার মধ্যে স্বর্গরাজ্য থেকে ইন্দ্রের দূত মাতলি এসে পৌঁছলেন শতানীকের কাছে-দূতস্তস্মৈ বিসৃষ্টো’ভূদ রাজ্ঞে শক্রেণ মাতলিঃ। কী? না, স্বর্গে বড় বিপদ চলছে, অসুরদের সঙ্গে লড়াই লেগেছে দেবতাদের। অতএব এই বিপন্ন অবস্থায় ইন্দ্র শতানীককে স্মরণ করেছেন সাহায্য করার জন্য সাহায়কেচ্ছয়া। রাজা শতানীক সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রী-সেনাপতি আর প্রিয় পুত্রের হাতে রাজ্যের ভার সঁপে দিয়ে মাতলির রথে চড়ে গিয়ে পৌঁছলেন স্বর্গরাজ্যে ইন্দ্রের কাছে। যুদ্ধের ভার বুঝে নিয়ে তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রণাঙ্গনে নেমে পড়লেন।
পাণ্ডবকুলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মানুষটির ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। অসুরদের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ হল তার। যম-দংষ্ট্রা নামে এক অসুর দলের অনেককেই তিনি মেরেও ফেললেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, স্বয়ং ইন্দ্র দেখছেন এই অবস্থায় অসুরদের সঙ্গে লড়াইতে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। এই অবস্থায় ইন্দ্র কী করেন? একে তো লড়াই তখনও চলছে, এদিকে মর্ত-বন্ধুর মৃত্যু ঘটল। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি নিজের প্রিয় সারথি মালিকে পাঠিয়ে দিলেন কৌশাম্বীতে। মাতলি অশেষ শ্রদ্ধায় রথে করে বয়ে নিয়ে চললেন রাজা শতানীকের মৃতদেহ মাতল্যানীতদেহ।
কৌশাম্বীতে যখন রাজার মরদেহ এসে পৌঁছল, তখন হাহাকার পড়ল রাজবাড়িতে। রানি বিষ্ণুমতী শতানীকের অনুগামিনী হলেন চিতাগ্নিতে। রাজলক্ষ্মী আশ্রয় লাভ করলেন শতানীকের পুত্র সহস্রানীকের কাছে।
ঘটনাটা খুব সামান্য। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল-কৌশাখী থেকে কতদূর এই স্বর্গরাজ্য, যেখান থেকে ইন্দ্রের বার্তাবহ দূত এসে পৌঁছয় মর্থ্য রাজার কাছে? কতদূর এই স্বর্গরাজ্য, যেখান থেকে কোনও অলৌকিক পদ্ধতিতে নয়, বায়ুপথে নয়, একেবারে রথে করে সংগ্রাম-ভূমি থেকে মরদেহ বয়ে আনা যায় কৌশাম্বীতে?
