অবশ্য উপনিষদ বা বেদান্ত-দর্শনের চরম উপাস্য তত্ত্ব যে ব্রহ্ম, সেই তিনিও কিন্তু বেশিদিন তার কাঠিন্য বজায় রাখতে পারেননি। উপনিষদের জ্ঞান সাধনার ধারা এতই কঠিন, এতই তা গভীর এবং সূক্ষ্ম যে সেই পথে–ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া/দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি–সাধারণ জনের ঈশ্বর বিষয়িনী তৃষ্ণা একটুও নিবারিত হয়নি। উপনিষদের পূর্ব যুগের ইন্দ্রাদি দেবতার মূর্ত কল্পনা তখনও মানুষের মনে অম্লান, এবং বেদের প্রামাণ্য অবিসংবাদিতভাবে চিরন্তন। অন্যদিকে উপনিষদ বা বেদান্ত দর্শনের চরম দার্শনিক তত্ত্বগুলিও মানুষকে গভীরতা দেয়, তার দার্শনিক জিজ্ঞাসা পরিতৃপ্ত করে, তাকে মুক্ত পুরুষের মাহাত্ম্য দেয়। ঠিক এই রকম একটা অবস্থা থেকেই মানুষ-দার্শনিক এমন একটি দেবতাকে কামনা করে বসল–যাঁর রূপ-রস এবং আঙ্গিক হবে বৈদিক দেবতার মতো, আর তার অন্তরে থাকবে উপনিষদের সেই পরম তত্ত্ব-জ্যোতি। অর্থাৎ যিনি মানুষের প্রার্থনায় এবং ভালবাসায় ধরা দেবেন অথচ তার তত্ত্বটি হবে গভীর এবং জ্ঞানগম্য। আমাদের আলোচ্য মহাভারতে যেহেতু এইরকমই এক পরম দেবতার সন্ধান পাব আমরা, তাই আগেভাগেই আমরা তার আগমনী রচনা করছি।
মহাভারতের আখ্যান-উপাখ্যান মুলতুবি রেখে এই পরম দেবতার প্রতিষ্ঠা আমার সহৃদয় পাঠক-মণ্ডলীর কাছে যে হৃদয়গ্রাহী হবে না, তা জানি। আর আমি আনুষ্ঠানিক বা দার্শনিকভাবে সে প্রতিষ্ঠার বিস্তারে যাবও না। তার কারণ কৃষ্ণ যে কী করে আস্তে আস্তে ভগবান হয়ে গেলেন–মহাভারতের প্রক্ষেপবাদীদের কাছে তা যত আশ্চর্যের ঘটনাই হোক, আমার পক্ষে মহাভারতের প্রমাণ দিয়েই সেটা দেখানো কিছু অসম্ভব নয়। আরও অসম্ভব নয় এই জন্য যে, তিনি এক ঐতিহাসিক চরিত্র। কিন্তু কৃষ্ণকে নিয়ে আমি একটুও চিন্তিত নই, কারণ মহাভারতে তিনি স্বয়ং-প্রকাশ। আমি শুধু চিন্তিত সেই পরম ঈশ্বর নিয়ে–যাকে ক্কচিৎ আমরা কৃষ্ণ বলে ডেকেছি, শিব বলে ডেকেছি অথবা দুর্গা বলেও ডেকেছি–সেই পরম ঈশ্বর তত্ত্বকে যেন দেবতা বলে গুলিয়ে না ফেলি। আবারও বলছি, পরম ঈশ্বর বা ভগবান নয়, আপাতত আমার আলোচ্য শুধু দেবতা, অসুর এবং মনুষ্য। এই তিনটি প্রাণীকে বুঝে নিয়েই আমরা সৌতি উগ্রশ্রবার আসর ছেড়ে একেবারে মহারাজ জনমেজয়ের রাজসভায় উপস্থিত হব। কারণ নাগ, অসুর অথবা দেবতাদের কাহিনী বলে সৌতি উগ্রশ্রবা ততক্ষণে আমাদের মহাভারত-কথার মূল আসরে বসার যোগ্যতা তৈরি করে দেবেন।
.
১২.
ওঁরা বলেছেন, মনে বড় আনন্দ হয়। এমন আনন্দ, যা লাভ করলে পৃথিবীর সমস্ত সুখ এবং আনন্দ তার কাছে লঘু হয়ে যায়–যং লধ্বা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ। শম-দমের সাধন, এখানেও কিছু চাই না, মরে যাবার পরেও কিছু চাই না’–এমন একটা নিঃস্বার্থ ভাব, আর মুক্তির জন্য উদগ্র একটা ইচ্ছে–এই সব দুর্লভ যোগ্যতা যার আছে, তিনিই–একমাত্র তিনিই হলেন ব্রহ্মবিদ্যায় অধিকারী।
বেশ তো, ব্রহ্মবিদ্যার ছাত্র কী রকম হবে–সেটা তো বোঝা গেল, তা এই বিদ্যায় কার দেখা মিলবে? কী পাব? দেখা মিলবে সেই অমৃত জ্যোতির, পাবে পরম আনন্দ। তিনি কোথায় থাকেন? কোথাও না, কিন্তু সর্বত্র–তিনি অণুর থেকেও ছোট, সব চেয়ে বড়র থেকেও তিনি বড়।
এ তো কিছুই বুঝলাম না। ভীষণ কঠিন। হ্যাঁ কঠিন। ব্রহ্মতত্ত্ব বড় কঠিনই বটে। সহজ কিছু চাও তো ভগবানকে ডাক। তিনি ব্রহ্ম-স্বরূপ। তাকে কেমন দেখতে? ভারি সুন্দর। গোপবেশ বেণুকর, নবকিশোর নটবর। থাকেন কোথায়? গোলোকে, বৈকুণ্ঠে। হ্যাঁ, এই চেহারাটা বেশ পছন্দ হয়েছে। তা একে পেতে হলে কী কী যোগ্যতা থাকার দরকার? ভক্তি, শরণাগতি, ভালবাসা। বাঃ এ তো বেশ সহজ, আমি পারব, আমি এঁকেই চাই।
দুটো পরম উপাস্য তত্ত্বের পার্থক্য দেখলেন? প্রথমটা বুঝতেই পারছি না। কিন্তু দ্বিতীয়টা বেশ বুঝতে পারছি। কেন বুঝতে পারছি জানেন? পরম উপাস্য তত্ত্ব হলেও তার একটা চেহারা আছে, তার কিছু ক্রিয়াকলাপ আছে, এবং থাকবার একটা ঠিকানা আছে। অর্থাৎ আমরা ভারতের মানুষেরা অদ্বৈত, দ্বৈত দ্বৈতাদ্বৈত, শুদ্ধাদ্বৈত–এমনই হাজার কিসিমের সূক্ষ্ম আলোচনা সেরে নিয়ে যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, তাতে পরম ঈশ্বরের চেহারা, ঠিকানা এবং সারা জীবনের ‘অ্যাকটিভিটি’ ভাল রকম বিচার না করে তাকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা ভগবান বলে মানতে রাজি হইনি।
আমার বক্তব্য–স্বয়ং ভগবানেরই যখন এই অবস্থা, তখন সাধারণ দেবতাদের কথা আর কী বলব? তাদের ঠিকানা, তাদের রূপ, ক্রিয়া-কলাপ, ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, লোভ, হিংসা, ভালবাসা–সবই আমরা দেখতে পেয়েছি ইতিহাসে পুরাণে। বলতে পারেন–পৌরাণিক কথক ঠাকুরের কল্পনা আর আমাদের অফুরান বিশ্বাস–এই দুয়ের যোগফল হল আমাদের দেবতা।
বলতেই পারেন। অনেকে অনেক কথাই বলছেন, তো আপনারা বললে আর ক্ষতি কী! তবে কিনা, এই আধুনিক যুগে বসে মহাভারতের অমৃত-কথা আরম্ভ করেছি, তাই পৌরাণিকের কথার ভিতরে কোথায় ইতিহাসের অভিসন্ধি মেশানো আছে, সেটুকু আমরা অসীম সমব্যথায় দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব, না হলে, আমার মহাকবির হৃদয়টাই যে একেবারে ব্যর্থ হয়ে যাবে। বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে উত্তরাধিকারী কি কখনও পূর্বপুরুষের সঙ্গে কৃতঘ্নতা করে? অতএব শুনুন মহাশয়! স্বর্গ নামে একটা জায়গা আছে।
