গঙ্গার তীর থেকে সেই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি সু-উচ্চ কণ্ঠে বলল–আগুন ছোট শুকনো বনে প্রথমে লেগে তারপর বড় বনে গিয়ে লাগে, কিন্তু সেইখানে গর্ত করে যে ইঁদুরটি থাকে, আগুন তাকে কিছুই করতে পারে না। ইঁদুরের মতো আত্মরক্ষা করতে পারলে, সেই মানুষই বাঁচতে পারে।
যুধিষ্ঠির এবং অন্যান্য পাণ্ডব-ভাইরা ভূত দেখার মতো চমকে তাকালেন তীরভূমিস্থিত অজ্ঞাত পরিচয় মানুষটির দিকে। নিমেষের মধ্যে অন্তত সকলেই বুঝে ফেললেন যে, লোকটি পাণ্ডবদের হিতৈষী। কারণ এই যে কথাটি বলা হল, এটা বিদুরের কথা। তিনি ম্লেচ্ছভাষায় যুধিষ্ঠিরকে এই কথা বলে জতুগৃহের আগুনের সঙ্কেত দিয়েছিলেন। ঠিক এই কথাটির সঙ্কেত জানিয়ে বিদুরের পাঠানো সেই খনক পাণ্ডবদের কার্যোদ্ধার করেছেন। এখন আবারও সেই সঙ্কেত-শব্দ উচ্চারিত হওয়ায় পাণ্ডব-ভাইরা জননী কুন্তীকে নিয়ে জল থেকে উঠে এলেন। গায়ের ভিজে কাপড় গায়েই শুকোতে লাগল।
অপরিচিত ব্যক্তি জানাল–আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন মহামতি বিদুর। তারই দেওয়া সঙ্কেত আমি আপনাদের সামনে উচ্চারণ করেছি। অতএব আমাকে বিশ্বস্ত বলে জানবেন–তেন মাং প্রেষিতং বিদ্ধি বিশ্বস্তং সংজ্ঞমানয়া। পাণ্ডবদের অবিশ্বাস করার কোনও কারণই রইল না। অপরিচিত ততক্ষণে কথঞ্চিৎ দূরে বাঁধা একটি নৌকার দিকে পাণ্ডবদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সে বলল–এই নৌকাখানির গতিবেগ অন্য সাধারণ নৌকার চেয়ে অনেক বেশি। ছেড়ে দিলে হাওয়ার মতো চলবে–পার্থান্ সন্দৰ্শয়ামাস মনোমারুত- গামিনীম্। আরও একটা কথানদীর মধ্যে জোরে হাওয়া উঠলেও কোনও ভয় নেই এই নৌকায়। এই নৌকার মধ্যে এক আজব কল লাগানো আছে। পাল তুলে দিলে সবরকম বেগ সহ্য করে নৌকো উড়ে চলবে মনের গতিতে–সর্বাতসহাং নাবং যন্ত্রযুক্তাং পতাকিনীম্।
যন্ত্রযুক্তাম–এই শব্দটি শুনে পণ্ডিত-সজ্জনেরা অনেকে মনে করেছেন যে, মহাভারতের কালে প্রায়াধুনিক একরকমের কলের নৌকা চালু ছিল। মহাভারতের কালের অন্যান্য যান্ত্রিক উন্নতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এই কলের নৌকাটির নির্মিতি প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। তবে বিদুর এই নৌকাটিকে বিশেষ পদ্ধতিতে নির্মাণ করিয়েছিলেন; কাজেই পাণ্ডবদের বিপদ বুঝে নৌকার গতি বাড়ানোর জন্য জল-কাটার কোনও বিশেষ পদ্ধতি এই নৌকায় কাজে লাগানো হয়েছিল, কিন্তু এই যুগে যন্ত্র-চালিত নৌকার আধুনিক নির্মিতি সম্ভব ছিল না বলেই আমাদের ধারণা হয়।
বিদুর বিশেষ কারিগর দিয়ে এই নৌকা নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং দুর্যোধন-ধৃতরাষ্ট্ররা যাতে এই নির্মাণ-বৃত্তান্ত না জানতে পারেন, তার জন্য গঙ্গার তীরভূমিতেই এই নৌকা বানিয়ে ধীবর-চালক সহ একটি বিশ্বস্ত লোক দিয়ে বিদুর এই নৌকা আগেই পাঠিয়ে দেন সেই বনের মধ্যে যেখানে পাণ্ডবরা সুড়ঙ্গ-পথ থেকে বেরিয়ে গঙ্গা পার হবার চেষ্টা করবেন–শিবে ভাগীরথী তীরে নরৈর্বিশ্রম্ভিভিঃ কৃতাম্।
পাণ্ডবরা আর কোনও দ্বিধা করলেন না। যাঁরা এই রাত্রিকালে সাঁতরে নদী পার হবার জন্য জলে ডুব দিয়ে দেখছিলেন, তারা হাতের সামনে এমন একখানি অসাধারণ সুন্দর পাল-তোলা নৌকা দেখে আর দ্বিধা করলেন না। অপরিচিত ব্যক্তির সমস্ত কথা বিশ্বাস করে তারা নৌকায় উঠলেন। কল্যাণকারী বিদুরকে শতবার মনে মনে প্রণাম জানিয়ে পাণ্ডবরা জননী কুন্তীকে নিয়ে পতাকিনী নৌকায় আরোহণ করলেন। জাহ্নবীর অনুকূল স্রোত, ধীবর-চালকদের হাতের জোর–দশানাং ভুজবেগেন নদ্যাঃ স্রোতোবেগেন চ–আর অনুকূল বায়ুতে পাণ্ডবরা গঙ্গা পার হলেন খুব তাড়াতাড়ি। গঙ্গা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অজানা এক ভাগ্য নদীও যেন পার হয়ে এলেন পাণ্ডবরা।
তখনও রাতের আঁধার কাটেনি। সূর্য ওঠার দেরি আছে। পাণ্ডবরা এখন বারণাবত থেকে অনেক দূরে। পাণ্ডবরা যখন নৌকা থেকে নামলেন পরপারে, তখন বিদুরের পাঠানো সেই বিশ্বস্ত লোকটি হাত জোড় করে পাণ্ডবদের বলল–মহামতি বিদুর আপনাদের মস্তকাঘ্রাণ করে স্নেহালিঙ্গন জানিয়ে বলেছেন–তোমাদের যাবার পথ সুস্থ এবং নির্বিঘ্ন হোক–অরিষ্টং গচ্ছতাব্যগ্রা পন্থানমিতি চাব্রবীৎ। লোকটি নিজেও পাণ্ডবদের জয়ঘোষ উচ্চারণ করে আশীর্বাদ জানিয়ে সেই নৌকা নিয়ে রওনা দিল বিদুরের নির্দিষ্ট পথে।
রাতের আঁধারে নক্ষত্রের দিক্–সঙ্কেতে পাণ্ডব-ভাইরা জননী কুন্তীর সঙ্গে পথ চলতে লাগলেন। নক্ষত্রের ইশারায় বোঝা গেল তারাও দক্ষিণ দিকে চলেছেন–ততো নাবং পরিত্যজ্য প্রযযু-দক্ষিণাং দিশ। দক্ষিণ কথাটির সাধারণ অর্থ অনুকূল। এতদিন শত্ৰুপুরীতে জতুগৃহের মধ্যে ভয়ে ভয়ে কাটিয়ে এক রাত্রির মধ্যে পাণ্ডবরা যেখানে এসে পড়লেন, সেটা গভীর অরণ্যানী হলেও এই জায়গাটি অন্তত তাদের অনুকূল চলার পথ বটে। অতএব সব দিক থেকেই পাণ্ডবদের যাত্রা–দিক্ সুদক্ষিণ–প্রযযু-দক্ষিণাং দিশম্।
.
১১৭.
পাণ্ডবরা জতুগৃহের আগুনে দগ্ধ হয়ে গেছেন–এই খবর দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বারণাবতের জনপদবাসীরা এই ঘটনায় মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের ওপর ক্ষিপ্ত হয়েই ছিল। পৌর-জানপদের পদস্থ ব্যক্তিরা আগে যেমনটি বলেছিলেন, সেইরকম কড়াভাবে না হলেও হস্তিনাপুরে খবর পাঠিয়ে জানালেন–পাণ্ডবরা তাদের জননী কুন্তীর সঙ্গে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। মারা গেছেন অমাত্য পুরোচনও–ততস্তে জ্ঞাপয়ামাসু-ধৃতরাষ্ট্রস্য নাগরাঃ।
