পাণ্ডবরা সুড়ঙ্গের মুখ থেকে বেরিয়ে বনের মধ্যে এসে পৌঁছলেন, তখন রাত্রির তৃতীয় প্রহর শেষ প্রায়। চারদিক অন্ধকার, রাত্রির নক্ষত্র দেখে দিক নির্ণয় করতে হয়। সারা রাত ঘুম নেই, তার মধ্যে শতরকম ভয়–সকলের অলক্ষিতে জতুগৃহে আগুন দিয়ে, পুরোচনের ঘরে আগুন দিয়ে, নিমেষের মধ্যে পালাতে হবে। কম টেনশনের ব্যাপার নয়। অনিদ্রা, ভয় এবং পরিশ্রমে পাণ্ডবদের শরীর তখন ভেঙে আসছে। জননী কুন্তী আর পারছেন না। অথচ এই সুড়ঙ্গ-পথ থেকে বেরিয়ে বনের মধ্যে উত্তাল হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়বার উপায় নেই। বারণাবতের সীমান্ত অতিক্রম করে তাদের সবাইকে পালিয়ে যেতে হবে অন্যত্র। রাত ভোর হলেই দুর্যোধনের চরেরা চারদিকে খুঁজে দেখবে পাণ্ডবদের। যদিও ছয়টি প্রাণী জতুগৃহের মধ্যে দগ্ধ হয়ে পড়ে থাকার ফলে দুর্যোধনের চরেরা যথেষ্ট বিপ্রলব্ধ হবে, তবু রাজনীতিতে শত্রুপক্ষকে কোনও বিশ্বাস নেই। বিশেষত দুর্যোধনের মতো শক্ত, যিনি অনবরত পাণ্ডবদের ছিদ্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
অতএব এই অন্ধকার বনচ্ছায়ে বিশ্রাম নেবার উপায় নেই পাণ্ডবদের। রাত-জাগা নক্ষত্রলোক পাণ্ডবদের পথ নির্দেশ করল। অবশ্য এতদিন ধরে মৃগয়ার ছলে ঘুরে বেড়াবার সময়েই তারা যথেষ্ট পথ চিনে রেখেছিলেন। এখন এই উদার নীল আকাশের নক্ষত্র-স্থিতি দেখে পাণ্ডবরা বুঝতে পারলেন তাদের কোন দিকে যেতে হবে। কারণ অদূরেই গঙ্গা। গঙ্গার ওপারেই পাঞ্চাল দেশের সীমানা। আগে থেকেই তারা ঠিক করে রেখেছিলেন যে, যেভাবেই হোক রাত ভোর হবার আগেই গঙ্গা পার হয়ে যেতে হবে।
গঙ্গা পার হওয়ার পরিকল্পনাটা ঠিকই আছে। কিন্তু জননী কুন্তীর পা তো আর চলছে না। যুধিষ্ঠির-অর্জুন, নকুল-সহদেবের অবস্থাও তথৈবচ। একমাত্র ভীম, অসাধারণ তাঁর বল, অফুরন্ত তার প্রাণশক্তি। জননী কুন্তীকে তিনি পাঁজাকোলা করে কাঁধে তুলে নিলেন, নকুল-সহদেব দুটি ছোট-ভাইকে তুলে নিলেন কোলে–স্কন্ধমারোপ্য জননীং যমাবঙ্কেন বীর্যবান্। মহাভারতের কবি যেমন লিখেছেন–ভীম একই সময়ে মাকে কাঁধে, নকুল-সহদেবকে কোলে আর যুধিষ্ঠির-অর্জুনকে হাতে তুলে নিয়ে মহাবেগে গমন করতে লাগলেন, তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব বুদ্ধিতে যা বুঝি, তাতে মাকে একবার কাঁধে তুলে নিয়ে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে আসা এবং তারপরে নকুল-সহদেবকে কোলে নিয়ে আবার রেখে আসা এবং পুনরায় অর্জুন-যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে অন্যত্র রেখে আসাটাই স্বাভাবিক। মহাভারতের কবিও হয়তো এই কথাই লিখতেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর উদ্দেশ্য আছে ভীমের অতিমানবিক শক্তি পাঠককে বুঝিয়ে দেওয়া। অতএব ক্রমান্বয়ে যে ঘটনা ঘটেছিল, সেই ঘটনাকেই একই সময়ে কাঁধে, কোলে এবং বাহুর ব্যবহারে দেখিয়ে ভীমের অতিমানুষিক শক্তি-খ্যাপন করলেন কবি। মহাকাব্যের কবিরা এইভাবেই বিষয় বর্ণনা করেন।
যা হোক, সকলেই ভীমের শরীরে ভর করে চলছিলেন পাণ্ডব-ভাইয়েরা। জননী কুন্তীও। ভীম বন–বাদাড় ভেঙে সহজে যাবার মতো জায়গা করে–তরসা পাদপান্ ভঞ্জ মহীং পদ্ভ্যাং বিদারয়–মা-ভাইদের পৌঁছে দিলেন গঙ্গার তীরে। রাতের আঁধারে স্বচ্ছতোয়া গঙ্গার কুলু–কুলু বয়ে যাবার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নদীর ধারে ইতস্তত গজিয়ে ওঠা বৃক্ষরাজির তলায় বসে পড়লেন ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব। এতক্ষণ ভীমের গায়ে ভর দিয়ে পথ চলার ফলে সামান্য শক্তি সঞ্চয় হয়েছে সকলেরই। কাজেই যুধিষ্ঠির এবং কুন্তী আস্তে আস্তে এসে জাহ্নবীর জলস্পর্শ করলেন। ভোর হবার আগেই এই নদী পাড়ি দিয়ে চলে যেতে হবে। তবে মুক্তি। মুক্তিদায়িনী গঙ্গা বাস্তবতই জীবনের মুক্তির মতো বয়ে চলেছেন। তাঁকে পাড়ি দিতে হবে।
জননী কুন্তী যথেষ্টই অভিজ্ঞা। বাপের বাড়িতে যমুনার তীর-ঘেঁষা অঞ্চলে তার শৈশব কেটেছে। পালক পিতা কুন্তিভোজের রাজবাড়ির পাশ দিয়েই বয়ে চলত অশ্ব-নদী। অতএব জল আর জলের গভীরতা তিনি বেশ ভালই বোঝেন। তাঁর সঙ্গে এসেছেন যুধিষ্ঠির। রাজপুত্রদের সর্বব্যাপী শিক্ষায় নদ-নদী সম্বন্ধে তারও কিছু অভিজ্ঞতা আছে। যুধিষ্ঠিরকে মায়ের সঙ্গে জলে নামতে দেখে অন্যান্য পাণ্ডব-ভাইরাও এসে যোগ দিলেন জলের মধ্যে। তারা ডুবে ডুবে দেখার চেষ্টা করছিলেন–জলের গভীরতা কোথায় কেমন–জনন্যা সহ কৌরব্য মাপয়ানা নদী-জলম্।
এদিকে একটি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি গঙ্গার তীরে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে যেন কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। গঙ্গার তীরস্থিত বনস্থলীর মর্মর-পত্র-মোক্ষণের মধ্যে সেই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির পদশব্দ ভালই শোনা যাচ্ছিল বটে, কিন্তু পাণ্ডব ভাইরা জননী কুন্তীর সঙ্গে যেহেতু জলের মধ্যে একবার ডুবে একবার উঠে জলের গভীরতা ঠাহর করার চেষ্টা করছিলেন, তাতে প্রত্যেকের মুখ-চোখ-কান জলস্তব্ধ হওয়ায় অন্য কোনও শব্দ তাদের কানে ঢুকছিল না। ডুব দিয়ে জলের ওপরে উঠলেই গাত্রস্থিত জলপতন-শব্দ অন্য শব্দের প্রবেশ রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
তীরস্থিত অজ্ঞাত ব্যক্তি এতক্ষণ ধরে পাণ্ডব-ভাইদের জলতুম্বির কেরামতি দেখে বুঝল–রাত্রির চতুর্থ প্রহরারম্ভে বিনা প্রয়োজনে কেউ এইভাবে জলে ডুবে ডুবে জলের গভীরতা পরিমাপ করে না। বুঝল–এঁরা জীবন বাঁচাতে গঙ্গার পরপারে যেতে চান এবং আরও বুঝল–এঁরাই পাণ্ডব-ভাই এবং জননী কুন্তী তাদের সঙ্গে আছেন।
