হস্তিনাপুরের যুবরাজ যুধিষ্ঠিরের প্রতি শ্রদ্ধায় সেই রাত্রে বারণাবতের পুরবাসীরা অনেকেই আর ঘুমতে পারল না। সারা রাত তারা প্রায় দগ্ধ জতুগৃহের চারপাশ ঘিরে বসে থাকল–পরিবাৰ্য গৃহং তচ্চ তন্তু রাত্রৌ সমন্ততঃ। সেই সঙ্গে একটিও গালাগালি না দিয়ে শুধু সব কথা কানে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিদুর-প্রেরিত সেই খনক। পুরবাসীদের বিলাপে এবং অপলাপে রাত্রি ভোর হয়ে গেল! জনপদবাসীদের মধ্যে যারা রাতে উঠে আসেনি, তারা সবাই এবার এসে জড় হল রাত-জাগা পুরবাসীদের সঙ্গে–অথ রাত্ৰাং ব্যতীতায়মশেষো নাগরো জনঃ
জতুগৃহের লাক্ষা, চর্বি নিমেষে ছাই করে দিয়েছে অত সুন্দর চকমিলানো বাড়িটাকে। চতুর্দিকে শুধু ছাই-ভস্ম আর ছাইচাপা আগুন। বারণাবতবাসীরা সকলে জল নিয়ে এসে ছেটাতে লাগল সেই অগ্নিভম্মের ওপর। বিদুরের পাঠানো সেই খনক, যে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরবাসীদের গালাগালি আর বিলাপ শুনছিল, সে সুযোগ বুঝে কাজে লেগে গেল। সেও জল আনছে, জল ছিটোচ্ছে, অনেক কিছু করছে। আগুন নেবানোর পরে যে কাজটা, সেটা হল কুদ্দালকের সাহায্যে ছাই-ভস্ম সরিয়ে দেখা–কারা ঠিক মরেছে। বিদুর-প্রেরিত খনকটি জতুগৃহের মাঝবরাবর কাজ করছিল।
বারণাবতবাসীরা প্রথমে পুরোচনের ঘরের দিকে নজর করে দেখল। ভস্ম আর দগ্ধ–শন-বংশের জঞ্জাল কোদাল দিয়ে সরাতে সরাতে তারা পুরোচনের দগ্ধ দেহাবশেষ আবিষ্কার করে ভীষণ খুশি হল। অন্তত এই বদমাশ মরেছে–তগৃহং দগ্ধম্ অমাত্যঞ্চ পুরোচন।
বিদুরের সেই খনকটি কিন্তু অন্য কোনও দিকে তাকিয়ে দেখছে না। কোথায় সে খনন করে সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল, এটা তার বেশ খেয়াল আছে। কুদ্দাল–চালকদের দলে মিশে গিয়ে ছাই–ভস্ম সরিয়ে দেহাবশেষ আবিষ্কার করার চেয়েও তার কাছে অনেক বেশি যেটা প্রয়োজনীয়, তা হল সেই সুড়ঙ্গের মুখটা বুজিয়ে দেওয়া, যাতে বারণাবতবাসীদের কোপটা ধৃতরাষ্ট্র–দুর্যোধনের ওপরই সম্পূর্ণ পড়ে। জতুগৃহের দগ্ধাবশেষ পরিষ্কার করার ছলে সেই খনক ছাই–মাটি তুলে এনে সেই সুড়ঙ্গের দ্বারটুকু বুজিয়ে দিল। কেউ বুঝতেও পারল না–পাংশুভিঃ পিহিতং তচ্চ পুরুষেস্তৈ–ন লক্ষিতম্।
অন্যেরা ছাই-জঞ্জাল সরাতে সরাতে জতুগৃহের এখানে ওখানে পড়ে থাকা সেই ব্যাধ–পত্নী এবং তার পাঁচ ছেলের বিকৃত দেহাবশেষ দেখতে পেল। পাণ্ডবদের মৃত্যু সম্বন্ধে তাদের আর কোনও সন্দেহই থাকল না। আবারও পুরবাসীদের গালাগালির বাণ ছুটল। কেউ বলল–আরে ধৃতরাষ্ট্র-মশাই সব জানেন, দুর্যোধন তাকে না জানিয়ে এই এত বড় অপকম্মটি করেননি। সব জানেন ধৃতরাষ্ট্র–বিদিতে ধৃতরাষ্ট্রস্য ধার্তরাষ্ট্রোন সংশয়ঃ। দগ্ধবান্ পাণ্ডুদায়াদা। আরেকজন বলল–নিশ্চয়ই জানেন ধৃতরাষ্ট্র এবং জেনেও তিনি দুর্যোধনকে নিষেধ করেননি একবারও–ন হ্যেনং প্রতিষিদ্ধবান্। অন্য আরেকজন বলল–আর এই ভীষ্ম-দ্রোণেরাই বা কীরকম মানুষ? কেমন মানুষ ওই কৃপ আর বিদুরেরা। তাঁদেরও কি ধর্ম বলে কিছু নেই–ন ধর্মমনুবর্ততে। শেষে একজন মাতব্বর গোছের পুরবাসী সিদ্ধান্ত দিল–ভাই সব! আমরা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে দূত পাঠাবতে বয়ং ধৃতরাষ্ট্রস্য প্ৰেষয়ামমা দুরাত্মনঃ। দূত পাঠিয়ে তাকে জানাব যে,–মহারাজ! আপনার মনের সেই উৎকট ইচ্ছেটা এতদিনে পূর্ণ হয়েছে। আপনি পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারতে পেরেছেন–সংবৃত্তস্তে পরঃ কামঃ পাণ্ডবান্ দগ্ধবাসি।
ঘটনাগুলো ঠিক এইভাবে ঘটুক, মহামতি বিদুর তাই চেয়েছিলেন। তিনি ধৃতরাষ্ট্র-দুর্যোধনের চেয়ে অনেক বড় রাজনীতিবিদ। সমস্ত বিপন্নতা তিনি রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করেন। রাগ হলে তিনি ঢাল-তরোয়াল হাতে নেন, ক্রোধে ভ্রুকুটিও করেন না। কিন্তু এই যে জনরোষ তৈরি হল, বিদুর এইটাকে পাণ্ডবদের অনুকূলে এবং ধৃতরাষ্ট্রের প্রতিকূলে ব্যবহার করবেন। ধৃতরাষ্ট্র-দুর্যোধন-পুরোচনের যৌথ প্রয়াসে যে অঘটন সেদিন ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল, তাতে বারণাবতবাসীরা চিরকালের জন্য পাণ্ডব-জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের অনুগত হয়ে যায়। হস্তিনাপুরের দূর প্রান্তে অবস্থিত এই গ্রাম-শহরের সমস্ত মানুষ ধৃতরাষ্ট্রের ওপর চিরকালের জন্য ক্ষিপ্ত হল। মনে রাখবেন–ভবিষ্যতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঠিক আগে যুধিষ্ঠির পাঁচখানি গ্রাম দুর্যোধনের কাছে চাইবেন এবং সেই পঞ্চ গ্রামের মধ্যে বারণাবত একটি। যুধিষ্ঠির নিশ্চিতভাবে এই গ্রামখানি আপন শাসনের জন্য এই জন্যই চাইতে পারবেন যেহেতু জতুগৃহের দুর্ঘটনায় বারণাবতবাসীরা চিরকালের মতো যুধিষ্ঠিরের অনুগত হয়ে গেছে এবং চিরকালের মতো তারা ধৃতরাষ্ট্র-দুর্যোধনেরও বিরোধী হয়ে গেছে। বিদুরের রাজনৈতিক জয়টা এইখানেই।
যাই হোক, ওদিকে জননী কুন্তীকে নিয়ে চার ভাই পাণ্ডব সুড়ঙ্গ-পথে চলতে লাগলেন। তাঁদের সঙ্গে পরে এসে যোগ দিলেন ভীম। তাঁর হাতে সেই আগুন-দেওয়া মশালটি তখনও ধরা আছে। গভীর রাত্রিতে অন্ধকার সুড়ঙ্গের পথ দেখিয়ে ভীমই নিয়ে চললেন সবাইকে। সুড়ঙ্গের পথ বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিদুরের খনক এমনভাবেই সুড়ঙ্গটি কেটেছে যাতে জতুগৃহ থেকে তা খুব দূরেও না হয়, আবার সে দিকটায় লোকালয়ও না থাকে। জতুগৃহের উলটো দিকে সুড়ঙ্গের যে মুখটি খনক তৈরি করেছিল, সেটি একটি বনের ভিতরে পড়ে। মানুষ-জন সেখানে যায় না, তাই খনন করার সময় কেউ তাকে দেখতেও পায়নি। পাণ্ডবরাও নিশ্চয়ই তাই চাইবেন, যাতে পালানোর সময় কেউ তাদের দেখতে না পায়।
