কালপ্রেরিত। অর্থাৎ যেন এখানে পাণ্ডব-ভাইদের বা কুন্তীর কোনও দোষ নেই। মহাকাল যেন আগে থেকেই তাদের মৃত্যু লিখে রেখেছিলেন, এবং মরবার জন্যই যেন তারা স্বয়ং অন্নার্থী হয়ে উপস্থিত হল। আমরা খুব আক্ষরিক অর্থে এ কথা বিশ্বাস করি না। তার কারণ আগেই বলেছি। বিপদ এগিয়ে আসছে বুঝে যুধিষ্ঠির নিজেই ভীমকে বলেছিলেন যে,–আমাদের পরিবর্তে ছয়টি মানুষকে এখানে রেখে ঘরে আগুন দিয়ে আমরা পালাব ষটপ্রাণিনো নিধায়েহ দ্ৰবামানভিলক্ষিতাঃ। বরঞ্চ বলা যায়–ব্যাধ-গিন্নি তার পাঁচ ছেলেকে নিয়ে হঠাৎ করে খাবার লোভে এখানে চলে এল বলেই যুধিষ্ঠিরের পূর্ব পরিকল্পনা রূপায়ণের সুযোগ এসে গেল।
মহাভারতের কবি লিখেছেন–ব্যাধ-গিন্নি তার পাঁচ ছেলেকে নিয়ে খুবসে মদ খেল এবং মাতাল হয়ে গেল–সা পীত্বা মদিরাং মত্তা সপুত্রা মদবিহ্বলা। অতিরিক্ত মদ খেয়ে তাদের এমন অবস্থা হল যে, তারা কেউ একটুও প্রকৃতিস্থ রইল না! সংজ্ঞা হারিয়ে মরা মানুষের মতো এখানে ওখানে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল–সুধাপ বিগতজ্ঞানা মৃতকল্পা নরাধিপ। এখানেও আমাদের একটু বক্তব্য আছে। আগে দেখেছি–ব্রাহ্মণদের এই নেমন্তন্নে আরও অনেকেই এসেছিলেন এমনকি অনেক মেয়েরাও–আজগুস্তত্র যোষিতঃ। তো তারা তো সব নিজের ইচ্ছে মতো পান-ভোজন করে কুন্তীর কাছে অনুমতি নিয়েই চলে গেল–তা বিহৃত্য যথাকামং ভুক্তা পীত্ব চ ভারত। কিন্তু এই ব্যাধের ঘরের মানুষগুলি, যারা অন্নের চেয়ে মদ বেশি ভালবাসে, তারা কিন্তু নিজের ইচ্ছেয় যত মদ্যপান করেছে, তার চেয়ে বেশি মদ্যপান করেছে পাণ্ডব ভাইদের। পরিকল্পনা অনুসারে। অন্তত আমাদের তাই অনুমান। মদ পেলে যারা অন্য কিছুই চায় না, তাদের যদি হত্যা করার পরিকল্পনা থাকে, তবে তাদের আরও মদ সরবরাহ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এখানেও তাই করা হয়েছে। অন্যেরা স্বেচ্ছায় পান–ভোজন করে ফিরে গেলেও এই ব্যাধ-গিন্নির পরিবার মদের লোভে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে থাকল জতুগৃহের এখানে সেখানে। পাণ্ডব ভাইরা তাদের বার করে দিলেন না, লোক-জন ডেকে এনে তাদের সংজ্ঞানহীন দেহ সরিয়ে দেবারও ব্যবস্থা করলেন না।
রাত গাঢ় হচ্ছে। পাণ্ডবরা যে জতুগৃহে আছেন সেটি এমনিতে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা সকলেই জেগে আছেন। পাঁচ পুত্র নিয়ে ব্যাধের বউ নিশ্চিন্তে মরার মতো ঘুমোচ্ছ। আশেপাশে যে কয়েকটি বাড়ি আছে, রাত গম্ভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে সব বাড়ি থেকে এতটুকু শব্দও আর ভেসে আসছে না। সারা সন্ধে নেমন্তন্নের ঝামেলা গেছে, পুরোচনকেও সে ঝামেলা কিছু সামাল দিতে হয়েছে বলে সেও আজ কিছু ক্লান্ত। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে সেও আজ ঘুমিয়ে পড়ল।
ব্রাহ্মণরা এবং অন্যান্য অতিথিরা যখন নিমন্ত্রণ খেতে এসেছিলেন, তখন সন্ধ্যাকাল। আবহাওয়া ছিল গুমট। বাড়তি কাজকর্ম এবং গরমে ক্লান্ত পুরোচন নিজের ঘরের দরজা এঁটে শুয়ে পড়েছিল। পাণ্ডবদের বিশ্বাস উৎপাদন করার জন্য সে নিজের ঘরখানাও বানিয়েছিল জতুগৃহের মাল–মশলা দিয়েই। ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য অতিথিরা চলে যাবার পরেও যে ছয়টি প্রাণী নিঃশব্দে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় জতুগৃহের মধ্যে পড়ে রইল–এই ছোট্ট ঘটনাটি পুরোচনের নজর এড়িয়ে গেল।
রাত বেশি হতে নিস্তব্ধতা বাড়ল, গুমট কেটে গিয়ে হাওয়াও ছাড়ল বেশ ভাল মতো–অথ প্রবাতে তুমুলে নিশি সুপ্তে জনে তদা। পাণ্ডব ভাইদের পূর্ব–পরিকল্পনা রূপায়ণের এই উপযুক্ত সময়। হাওয়ার সঙ্গে আগুন–সোনায় সোহাগা। মধ্যম পাণ্ডব ভীম চারদিক দেখে নিয়ে একটি মশাল জ্বালিয়ে নিলেন। সেই জ্বলন্ত মশাল ধরিয়ে দিলেন পুরোচনের ঘরের দরজায়–তদুপাদীপয় ভীমঃ শেতে যত্র পুরোচনঃ। তারপর জতুগৃহের ভিতরে এসে জতুগৃহের দ্বারে আগুন লাগালেন ভীমসেন। তারপর একে একে বাড়ির চারদিকে। যাতে আগুন ভাল করে ধরে–সমস্ততো দদৌ পশ্চাদগ্নিং তত্র নিবেশনে। বাড়ির সর্বত্র আগুন লেগে গেল।
ভীমকে চারদিকে আগুন লাগাতে দেখেই, চার পাণ্ডব ভাই কুন্তীকে সঙ্গে নিয়ে সেই সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকলেন। ভীম মশাল হাতে নিয়েই সবার শেষে এসে ঢুকলেন সুড়ঙ্গের ভেতর। দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে লাগল জতুগৃহে। খড়-শন বাঁশের চটপটা শব্দের সঙ্গে লাক্ষা চর্বি আর ঘিয়ের উৎকট গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই বারণাবতের জনপদবাসীরা সকলে জেগে উঠল। যুবরাজ যুধিষ্ঠিরকে এতদিনে তারা বেশ ভালবেসে ফেলেছে। তাছাড়া হস্তিনাপুরের সিংহাসন নিয়ে জ্ঞাতি-বিরোধের কথাও তাদের অজানা ছিল না। জতুগৃহের ভয়ঙ্কর আগুন দেখে তারা সকলে হায়-হায় করতে লাগল। ধৃতরাষ্ট্র এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র কোন জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছেছে সেই অনুমান করে তারা গালাগালি করে বলতে লাগল এতদিনে বুঝতে পারছি, এই নতুন বাড়িটা পুরোচন এমন সাত তাড়াতাড়ি তৈরি করল কেন। দুর্যোধনের বুদ্ধিতে পুরোচন ব্যাটা পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার জন্যই এই বাড়ি তৈরি করেছে। বাড়িটাতে কীভাবে আগুন লাগিয়েছে দেখ–গৃহমাত্ৰবিনাশায় কারিতং দাহিতঞ্চ তৎ।
পুরবাসীরা যারা জেগে উঠেছিল তারা পুরোচনের ওপর সমূহ আক্রোশ প্রকাশ করে বলল–এখানে কাজের কাজ একটাই হয়েছে, পুরোচন ব্যাটা নিজেও পুড়ে মরেছে। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র মানুষটা মোটেও ভাল নন। মানুষ অতি বড় শত্রুকেও এমন করে পুড়িয়ে মারে না। আর তিনি কিনা এইভাবে নির্দোষ, নিরীহ পাণ্ডব ভাইদের আগুনে পুড়িয়ে মারলেন! নিজের ছেলেদের সঙ্গে পাণ্ডবদের মোটেই এক দৃষ্টিতে দেখেন না ধৃতরাষ্ট্র, যার জন্য এমন শত্রুর মতো পুড়িয়ে মারলেন নিজের ভাইপোদের–যঃ শুচী পাণ্ডুদায়াদা দাহয়ামাস শত্রুবৎ।
