প্রহাদ তার বক্তব্য শেষ করলেন একেবারে অভিজ্ঞ যুক্তিবাদী আধুনিক বৃদ্ধটির মত। এত যুক্তি জগজ্জননী চণ্ডিকার পক্ষে একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব হয়নি। দেবতাদের স্বার্থপরতা এবং ত্রুটিগুলি তিনি স্বীকার করে নিতেও বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু তাই বলে অসুরদের তিনি স্বর্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠিতও হতে দেননি। তাদের বাবা-বাছা’করে পাঠিয়ে দিয়েছেন পাতালে।
এতক্ষণ ধরে দেবী-ভাগবত পুরাণ থেকে অসুরদের জবানীতে এই যে দেব-সমালোচনা শোনালাম, তার কারণ এই নয় যে, এই পুরাণখানিকে আমি সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ বলে মনে করি। দেবী-ভাগবত পুরাণে দেবী চণ্ডিকার মাহাত্ম্যই প্রথম এবং শেষ কথা, ফলত স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু পর্যন্ত এখানে এক বিষ্ণুভক্তের মুখেই সমালোচনার পাত্র। কিন্তু তবুও দেবী-ভাগবতের এই অংশটুকু স্মরণ করলাম এই কারণে যে, দেবতা এবং অসুরদের পারস্পরিক স্থিতিটা এই সমালোচনা থেকে বুঝতে সুবিধা হবে। মহাভারতের অমৃত-মন্থন-পর্বে দেবতা এবং অসুরদের ন্যায়-অন্যায়ের বাহ্যিক একটা ইঙ্গিত আছে, সেই ইঙ্গিতটা পুরাণগুলির মধ্যে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু দেবী-ভাগবত পুরাণে যেহেতু আলোচনার সঙ্গে সমালোচনাটাও বাড়তি পাওয়া গেল, তাই সেটা উল্লেখ করে আমি আমার অন্য উদ্দেশ্যগুলিও সাধন করতে চাইছি, যদিও সেই সাধনায় অন্যান্য পুরাণ তথা ভারতীয় দর্শনগুলিও আমাদের সাহায্য করবে।
বস্তুত ছলনা, হিংসা, অসংযম, স্বার্থপরতা, ধর্ষণ–এই অন্যায় আচরণগুলিকে আমরা সব সময় অসুর-রাক্ষসদের ক্রিয়া-কাণ্ড বলেই এতকাল ভেবে এসেছি। এমনকি মনুষ্য-সমাজের মধ্যেও যাদের মধ্যে আমরা ইন্দ্রিয়-বৈকল্য তথা কাম-ক্রোধ-হিংসা বেশি দেখতে পাই, আমরা আর তাদের মানুষ বলি না। অসুরদের সম্বন্ধে কোনও ধারণা না থাকলেও আমরা সংযমহীন, অনিয়ন্ত্রিত মানুষের মধ্যে অসুরের চিহ্ন দেখতে পাই। একটি মানুষের গায়ে অসম্ভব শক্তি থাকলে আমরা তার মধ্যে আসুরিক শক্তি লক্ষ্য করি; এমনকি একটি মানুষ অতিরিক্ত ভোজন করলেও তাকে আমরা তুলনা দিই রাক্ষসের সঙ্গে এবং এর মধ্যে যদি কারও অতিরিক্ত খিদে থাকে, তো সেই খিদে রাক্ষুসে খিদে না হয়ে যায় না।
অন্যদিকে, এর বিপরীত কোটিতে যে সমস্ত মানুষের মধ্যে পবিত্রতা, সততা অথবা সত্ত্বগুণ বেশি লক্ষ্য করা যায়, আমরা তাদের দেবতা বলে সম্বোধন করি। যাঁদের মধ্যে দয়া এবং সহৃদয়তার মাত্রা সমধিক, তারা দেবতুল্য মানুষ বলে প্রতিনিয়ত তাদের কাছে আমরা নত হই। সংযতেন্দ্রিয়, নিঃস্বার্থ, নীতিযুক্ত মানুষ আমাদের কাছে দেবতার সম্মানেই সম্মানিত। মানুষই যখন এই পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন, সেখানে দেবতা মানেই তো তিনি পবিত্রতা, সততা অথবা নীতি-ধর্মের প্রতিমূর্তি।
বাস্তবে কিন্তু ঘটনাগুলি এত সাধারণ বা বৈচিত্র্যহীন নয়। পুরাণ ইতিহাসে দেবতাদের চরিত্র যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তাতে মনুষ্য-সমাজকে যদি বাদ দিয়ে পুরোপুরি আলাদা করেও ফেলা। যায়, তবে দেবতাদের মধ্যেও প্রচুর আসুরিক গুণ দেখা যাবে, আবার বহু অসুরের মধ্যেও লক্ষ্য করা যাবে পবিত্র দেব-গুণ। আর মানুষের গুণ? সে তো দেবতা এবং অসুর–দুই পক্ষেরই সাধারণ ধর্ম। এই নিরিখে দেখতে গেলে একমাত্র মানুষই আমার কাছে শেষ পর্যন্ত দেবতা কিংবা রাক্ষসে পরিণত হবেন। সত্যি কথা বলতে কি-দেবতা কিংবা অসুর–এঁরা মানুষই কিনা সেটা প্রমাণ করতে হলে আমাকে বেগ পেতে হবে রীতিমতো।
এই বেগের আগেও অবশ্য আবেগের একটা ব্যাপার আছে। মনে রাখতে হবে–ভারতীয় দর্শনে ঈশ্বর’ বলে একটা কথা আছে। অনেকেই ঈশ্বর বা পরমেশ্বরের সঙ্গে দেবতাকে এক করে ফেলেন। বেদ-উপনিষৎ-পুরাণের মধ্যে ভারতীয় দেবতার যে বিবর্তন পাওয়া যায়, তাতে বেদের যুগ শেষ হতে না হতেই নূতন এক পরম তত্তের অন্বেষণ আরম্ভ হয়ে গেছে। পুরাণ-ইতিহাসের বর্ণনায় সমুদ্রমন্থনে নিযুক্ত যে সমস্ত দেবতাকে দেখলেন অথবা যে সমস্ত দেবতার সমালোচনা শুনলেন বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের কাছে, সেই ইন্দ্রাদি দেবতারা কিন্তু বেদের বর্ণনায় অসীম শক্তিধর। তবে কিনা বেদে ইন্দ্র, বায়ু, সোম, সূর্য ইত্যাদি যে যে দেবতার স্তুতি যখন যখন রচিত হয়েছে, তখন সেই সেই স্তুতি-সূক্তের মধ্যে কিন্তু সেই ব্যক্তি দেবতাই চরম মাহাত্ম্যে ধরা দিয়েছেন। অর্থাৎ বৈদিক ঋষি যখন ইন্দ্র-সম্বন্ধীয় সূক্ত রচনা করছেন, তখন অন্য দেবতারা গৌণ, ইন্দ্রই প্রথম এবং শেষ কথা। আবার যখন সূর্য-সূক্ত রচনা করছেন ঋষি, তখন সূর্যই সব, তিনিই মুখ্যতম, অন্যেরা অপ্রধান।
পণ্ডিতেরা বলেন, এইরকম বহু-দেবতার ব্যক্তি স্তুতির চরম পর্বে ক্লান্ত ঋষির হৃদয়ে এক এবং অদ্বৈত তত্ত্বের অন্বেষণ জেগেছে। দিনের পর দিন শত-সহস্র যজ্ঞে বৈদিক দেবতার ব্যক্তি-স্তুতি রচনা করতে করতে বৈদিক ঋষির মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত হতাশা ধ্বনিত হয়েছে–কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেমঃ-এত ঘি পুড়িয়ে হব্য-কব্য নিবেদন করে কোন্ দেবতার উদ্দেশ্যে আর আহুতি দেব আমরা? পণ্ডিতেরা বলেন, এই হতাশা থেকেই অদ্বৈত তত্ত্বের অন্বেষণ আরম্ভ হয়–যার চরম পরিণতি উপনিষদ আর বেদান্ত দর্শনের মধ্যে। উপনিষদের মধ্যে দেখা যাবে ইন্দ্র-বায়ু-সূর্যের মতো দেবতাদের স্থান নিতান্তই গৌণ, প্রায় মানুষের মতোই তাদের স্থিতি এবং অবস্থান। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল-উপনিষদের তত্ত্ব বা ব্ৰহ্মতত্ত্ব জানবার জন্য আমরা যাদের আগ্রহান্বিত দেখতে পাচ্ছি, তাদের মধ্যে দেবতা, অসুর এবং মানুষদের জায়গাটা একেবারেই সমান, একস্তর।
