পুরোচনকে এমন খুশি খুশি দেখে যুধিষ্ঠির ভাইদের বললেন–এই পুরোচন ব্যাটা আমাদের খুব বিশ্বাস করেছে। আমরা যে ব্যাটাকে কীরকম ঠকিয়েছি তা তো বুঝতে পারছে না। কিন্তু যাক এসব কথা। এবার আমাদের পালাতে হবে–বঞ্চিততায়ং নৃশংসাত্মা কালং মন্যে পলায়নে। যুধিষ্ঠির এবার পলায়নের পরিকল্পনা দিয়ে বললেন–ব্যাটা পুরোচন যখন ওই অস্ত্রাগারে থাকবে, তখন ওই বাড়িতেই আগুন দিয়ে আমরা ছয়টি প্রাণী এখান থেকে পালাব। কিন্তু একটাই ব্যাপার। আমাদের বদলে আর ছয়টি প্রাণী এখানে রেখে যেতে হবে এবং তাদের পুড়িয়েও মারতে হবে–য প্রাণিনো নিধায়েহ দ্ৰবামো নভিলক্ষিতাঃ।
যুধিষ্ঠিরের এই পরিকল্পনার মধ্যে নৃশংসতা এবং অধর্মের ছাপ দেখেছেন কেউ কেউ। এমনকি এই কারণে সিদ্ধান্তবাগীশ উপরিউক্ত শ্লোকাংশের অর্থ করেছেন একেবারেই অন্যরকম। তার মতে–নিজেদের বদলে ছয়টি অন্য মানুষকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা যদি যুধিষ্ঠিরই করে থাকেন, তবে যুধিষ্ঠিরের ধর্মরাজ-আখ্যায় কলঙ্ক লাগে, ধর্মরাজের পক্ষে এমন অধর্ম করা সম্ভবই নয়–কেচি অপরাণেব ষটপ্রাণিননা নিধায়েতি ব্যাচক্ষতে, তন্ন। তথাত্বে ধর্মরাজস্য গুরুতরাধর্মোৎপত্তাপত্তেঃ। যুধিষ্ঠিরের কলঙ্ক হবে বলে মহাকবির লেখা শ্লোকের সহজ অর্থ এখানে পরিত্যাগ করা উচিত হবে বলে মনে হয় না। তার সবচেয়ে বড় কারণ, এর পরে যে ঘটনা ঘটবে, তাতে যুধিষ্ঠিরের পরিকল্পনা কাজে পরিণত হবে। আর দ্বিতীয় কথা মনে রাখতে হবে–যুধিষ্ঠির কিংবা পাণ্ডব–ভাইদের কাছে তখন আত্মরক্ষাই সবচেয়ে জরুরী ছিল এবং সেই আত্মরক্ষাও করতে হবে দুর্যোধনকে ফাঁকি দিয়ে। নইলে বিপদ তাদের পিছু নেবে।
মহাভারতেই বহু জায়গায় দেখা যাবে যে, আত্মরক্ষার জন্য অন্যায় এবং হীন কাজ করলেও তাতে দোষ লাগে না। এখানে আবার এর মধ্যে রাজনীতির প্রবেশ ঘটেছে। রাজনীতিতে সিংহাসনচ্যুত যুবরাজ নিজের এবং আপনজনের প্রাণ বাঁচানোর জন্য অন্য প্রাণী বধ করছেন–এটা খুব বেশি অসহনীয় নয়। আসলে যুধিষ্ঠিরকে সদা-সর্বদা ধর্মের মোড়কে বাঁধা একটি পুরিয়ার মতো যারা দেখতে পান, তাদের সঙ্গে আমরা একমত নই। মনে রাখতে হবে, তিনি রাজার ঘরের ছেলে, তার ওপরে যুবরাজ হয়েছিলেন। তা তেমন মানুষকে পদচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে বিনা দোষে।
সহায়-সম্পদহীন অবস্থায় এখন আত্মরক্ষাই তার কাছে এক দায় হয়ে উঠেছে। নিজের ছাড়াও তাঁর ভাইদের তথা গর্ভধারিণী জননীর প্রাণ বাঁচানোর দায়ও তো যুধিষ্ঠিরেরই। এই অবস্থায় অন্য মানুষকে পুড়িয়ে মেরে নিজেরা বাঁচতে চাওয়ার মধ্যে যুধিষ্ঠিরের দোষ না খোঁজাই ভাল। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বলে জীবনের সমস্ত ধর্ম ত্যাগ করে মা-ভাইদের তিনি দগ্ধ হতে দেখবেন–এটা যুধিষ্ঠির যেমন চাননি, তেমনি মহাকাব্যের কবিও তা যুধিষ্ঠিরকে দিয়ে করাননি। এখানে অন্যায় হলে হয়েছে। যুধিষ্ঠিরের ধর্মরাজ-আখ্যা না হয় কলঙ্কিতই হল। কিন্তু তাই বলে যুধিষ্ঠির যা ভেবেছিলেন, সেটাকে অগ্রাহ্য করতে পারছেন না মহাকাব্যের কবি। অন্যদিকে রাজনৈতিক কূটদৃষ্টিতে বিচার করলেও এখানে যুধিষ্ঠিরকে দোষ দেওয়া খুব কঠিন। বরঞ্চ বাঁচবার জন্য তিনি যে পরিকল্পনা নিয়েছেন, তা প্রশংসাজনক না হলেও এতে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায় এবং সেইজন্যই ধর্মরাজের এই অধর্ম ব্যবহার সমর্থনও করা যায়।
যুধিষ্ঠিরের এই পরিকল্পনার সঙ্গে মিলে গেল আরও একটি ঘটনা, যদিও সেটা আগে থেকেই ছক-কষা বলে মনে হয়। কারণ, মহাভারতের কবি লিখেছেন–পাণ্ডবজননী কুন্তী দান করার ছলে বারণাবতের বামুনদের নেমন্তন্ন করে পাঠালেও নেমন্তন্ন করলেন রাত্রিবেলায় খাবার জন্য–অথ দানাপদেশেন কুন্তী ব্রাহ্মণভোজন। চক্রে নিশি মহারাজ…। ব্রাহ্মণরা সাধারণত রাত্রিতে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতেন না। কারণ তারা এক সূর্যে একবার খান। কিন্তু এখানে দানের অপদেশ বা ছল আছে বলে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা গৌণ হয়ে দাঁড়াল। বোঝা যাচ্ছে–এই রাত্রির প্রহরগুলি পাণ্ডবদের কাছে অতি প্রয়োজনীয় এবং কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই এই দানের ছল প্রযুক্ত হয়েছে। সিদ্ধান্তবাগীশ ছটি প্রাণী পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনায় যুধিষ্ঠিরের দোষ দেখতে পেলেন, কিন্তু রাত্রিতে ব্রাহ্মণভোজন এবং দানের ছলে কোনও দোষ পেলেন না। বস্তুত মহাভারতের কবি এবং যুধিষ্ঠিরের অভীষ্ট এখানে একেবারেই অন্য চালে চলছে। সেটাই এখানে ঠিক ঠিক কবির অনুকূলে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে যুধিষ্ঠিরের অনুকূলে।
.
১১৬.
কথায় বলে মচ্ছোব-বাড়ি। ব্রাহ্মণ-ভোজন করাবেন হস্তিনাপুরের যুবরাজের জননী কুন্তী। অতএব তার উপক্রম-আয়োজন কিছু কম নয়। এই উপলক্ষে বামুনদের সঙ্গে রবাহূত, অনাহূত অনেক মানুষই মচ্ছোব-বাড়িতে খেতে আসবে–এ ঘটনা পাণ্ডব ভাইদের জানা ছিল। মহাভারতের কবি অবশ্য বলেছেন–কুন্তী দান করার ছলে ব্রাহ্মণদের নেমন্তন্ন করলেন সেখানে অনেক মেয়েরাও খাবারের আশায় এসেছিল–আজগুস্তত্র যোষিতঃ, তারা সময়মতো খাওয়া-দাওয়া সেরে চলেও গেল। কিন্তু এক নিষাদী, মানে ব্যাধের বউ তার পাঁচ-পাঁচটি ছেলেকে নিয়ে কালপ্রেরিত হয়েই যেন ভাত পাবার আশায় সেই নেমন্তন্ন বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিল–অন্নার্থিনী সমভ্যাগাৎ সপুত্ৰা কালচোদিতাঃ।
