তবে বারণাবতে পাণ্ডবদের সম্ভাব্য বিপদের কথা নিয়ে যুধিষ্ঠিরের চেয়েও যিনি বেশি চিন্তা করেছিলেন, তিনি হলেন বিদুর। তিনি জানতেন যে, খুব তাড়াতাড়ি অঘটন কিছু ঘটাবে না পুরোচন। সে নিজের ওপর যুধিষ্ঠিরের বিশ্বাস উৎপাদন করার জন্য সময় কিছু নেবেই। সামান্য সময়ের এই সুযোগটুকু অদ্ভুত সুন্দরভাবে ব্যবহার করলেন বিদুর। তিনি তার একটি অতি বিশ্বস্ত মানুষকে ডেকে পাঠালেন, মাটি খুঁড়ে সুড়ঙ্গ প্রস্তুত করতে যার জুড়ি নেই। বিদুর তাকে আগেভাগেই সমস্ত কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিলেন যুধিষ্ঠিরের কাছে।
এরই মধ্যে আরও একটা অতি গোপন খবর বিদুরের কাছে পৌঁছে গেছে। বারণাবতে জতুগৃহ-নির্মাণের সময় থেকেই বিদুর চারদিকে গুপ্তচর লাগিয়ে দিয়েছেন। বাড়ি তৈরি হয়ে যাবার পর পুরোচন যখন দুর্যোধনের কাছে নতুন নির্দেশ নিতে এসেছিল, সেই সময়েই বিদুরের গুপ্তচর খবর নিয়ে আসল যে, কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর রাত্রে যখন বারণাবতের ছোট্ট গ্রাম-শহরটি অন্ধকারে ডুবে থাকবে তখনই জতুগৃহে আগুন লাগাতে বলা হয়েছে পুরোচনকে। বিদুর আর দেরি করলেন না। সময় এগিয়ে আসছে। তিনি চতুর-কুশল খনককে পাঠিয়ে দিলেন যুধিষ্ঠিরের কাছে।
চতুর খনক বারণাবতে এসে গোপনে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দেখা করে বলল–মহারাজ। আমাকে বিদুর-মশায়ের বন্ধু বলে জানবেন। আমি একজন খক, আমি খুব ভাল সুড়ঙ্গ তৈরি করতে পারি। আমি যথাসাধ্য আপনাদের উপকার করতে চাই, বিদুর সেইজন্যই আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন–প্রহিতো বিদুরেনাস্মি খনকঃ কুশলঃ হ্যহম্। অন্য জায়গা থেকে কোনও উটকো লোক অন্য কোনও অসুদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছে কিনা, লোকটা পুরোচন-দুর্যোধনের কোনও চর কিনা–সে সব চিন্তা করার আগেই খনক বলল–আমি আপনাদের হিতৈষী ব্যক্তি কিনা সেটা বোঝানোর জন্য বিদুর আমাকে কিছু নির্দেশ দিয়েছেন। আপনাকে প্রথম কথা জানাই–কৃষ্ণচতুর্দশী রাত্রে পুরোচন আপনার বাড়ির দরজাটিতে আগুন দিয়ে দেবে–কৃষ্ণপক্ষে চতুর্দশাং…প্রদাস্যতি হুতাশন। দুর্যোধনের আদেশ সেইরকমই। আমাকে বিশ্বাস করার জন্য একটি ঘটনার উল্লেখ করব শুধু। বিদুর আপনাকে ম্লেচ্ছ ভাষায় কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন এবং আপনিও তার উত্তর দিয়েছিলেন ম্লেচ্ছ ভাষাতেই। আপনি তাকে বলে এসেছিলেন যে, আপনি সব বুঝেছেন। আশা করি, আমি যে এইভাবে আপনাদের গূঢ় কথোপকথনের ঘটনা উল্লেখ করলাম, সেইটুকুই আমাকে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে প্রমাণ বলে মেনে নিতে পারেন–ত্বয়া চ তত্তথে্যুক্ত এত বিশ্বাস কারণম্।
বিদুরের সঙ্গে যেসব কথা হয়েছিল, তা এই খনকের মুখে শুনে যুধিষ্ঠির তাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করলেন। যুধিষ্ঠির বললেন–তোমাকে আমি বিদুরের বিশ্বস্ত পুরুষ বলেই বুঝলাম। এই মুহূর্তে তোমাকে বিশেষ প্রয়োজন আমাদের। আর কী আশ্চর্য, প্রয়োজনীয় এমন কোনও বিষয়ই নেই যা মহামতি বিদুরের অজানা আছেন বিদ্যতে কবেঃ কিঞ্চিদবিজ্ঞাতং প্রয়োজন। সেই বিদুর তোমাকে পাঠিয়েছেন, অতএব তুমি আমাদের কাছে বিদুরের মতোই আদরণীয়। অতএব বিদুর যেভাবে আমাদের রক্ষা করেন, তুমিও সেইভাবেই আমাদের রক্ষা করবে।
যুধিষ্ঠির খনককে নিজের কঠিন অবস্থা বুঝিয়ে বললেন। বললেন–এই অগ্নিগৃহের মধ্যে পুরোচন আমাদের পুড়িয়ে মারতে চাইছে। দুর্যোধন এই অপকর্মটি করাচ্ছে তাকে দিয়ে। দুর্যোধনের অর্থ আছে, সৈন্য-সামন্ত আছে, সম্পূর্ণ রাজযন্ত্র তার পিছনে। সে সব সময়ই চেষ্টা করছে যাতে আমাদের সর্বনাশ হয়–অস্মৃনপি স পাপাত্মা নিত্যমেব প্রবাধতে। এই বাড়ির প্রাচীরের কাছে একটা বিশাল অস্ত্রাগারও তৈরি করে রেখেছে দুর্যোধন-পুরোচনেরা। সব দিক থেকেই দুর্যোধন চায় আমরা ধ্বংস হই। মহামতি বিদুর আমাদের বিপদ আগেই বুঝেছিলেন এবং সেই বিপদই এখন হয়েছে। তুমি এই বাড়ির মধ্যে গর্ত খুঁড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করে আমাদের বাঁচাও, কিন্তু সাবধান! পুরোচন যেন একটুও টের না পায়–পুরোচনস্যাবিদিতা অস্মাংস্কৃং প্রতিমোচয়।
বিদুর-নিযুক্ত খনক যুধিষ্ঠিরের যুক্তি মেনে নিয়ে খনন কাজ আরম্ভ করল। ঘি-চর্বি গালা দিয়ে তৈরি সেই বাড়ির মধ্যে সে একটি গর্ত তৈরি করল এবং সেই গর্ত থেকেই একটি সুড়ঙ্গও তৈরি করে ফেলল। সুচতুর খনক গৃহের মধ্যে তৈরি সেই গর্তের ওপর একটি ঢাকনা লাগিয়ে দিল এবং তার ওপরে মাটি দিয়ে সমান করে দিল–কপাটযুক্ত অজ্ঞাতং সমং ভূম্যাশ্চ ভারত। পুরোচন সদা-সর্বদা সেই জতুগৃহের দ্বারে বসে পাণ্ডবদের পাহারা দিত, কিন্তু খনকের কুশলতায় সে এই খননকার্যের বিন্দুবিসর্গও জানতে পারল না। পাণ্ডবরা রাত্রিবেলায় সেই গর্তের ভিতরেই থাকতেন। প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্রও কিছু তাদের সঙ্গে থাকত। দিনের বেলায় চলত মৃগয়া, এ বন থেকে সে বনে। পথ চেনার কাজটাও তাতে ভাল হত।
নয় নয় করেও এর মধ্যে জতুগৃহে ছয় মাস কাটানো হয়ে গেছে পাণ্ডবদের পরিসংবৎসরোষিন। ছয় মাস শেষ হওয়ার কিছু আগে বিদুরের খনক যুধিষ্ঠিরের অভীষ্ট কাজটুকু করে দিয়ে গেল। এদিকে পুরোচন ভাবল যে, পাণ্ডবরা তাকে কোনও সন্দেহই করছেন না, সে মনে মনে খুব খুশি হল–বিশ্বস্তানিব সংলক্ষ্য হর্ষচক্রে পুরোচন। পাণ্ডবরা কিন্তু মনে মনে পুরোচনকে ভীষণ সন্দেহ করেও বাইরে দেখাতে লাগলেন যেন পুরোচনকে তারা খুব বিশ্বাস করেছেন–বিশ্বস্তব অবিশ্বস্তা বঞ্চয়ন্তঃ পুরোচন। পুরোচন খুশি হয়ে ভাবছিল–এবার তার সময় হয়ে এসেছে, এবার আগুন লাগাবে জতুগৃহে।
