যুধিষ্ঠির বললেন–না ভাই! আমাদের এই বাড়িতেই থাকতে হবে। কিন্তু থাকতে হবে এমনভাবে যেন আমাদের মনে কোনও সংশয়-দ্বিধা নেই–ইহ যত্তৈর্নিরাকারৈ বক্তব্যমিতি রোচরে। আগুন লাগলে আমরা কোথায় যাব–সেটা সাবধানে খুঁজে দেখতে হবে, ভাই। আর সব সময় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যাতে আমরা বিপদে না পড়ি। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা–আমাদের সন্দেহটা যেন পুরোচন একটুও বুঝতে না পারে। কারণ আমাদের সন্দেহ বুঝে গেলে পুরোচন তার কাজ করবে তাড়াতাড়ি এবং জোর করেই হঠাৎ একটা অঘটন সে ঘটিয়ে ফেলতে পারে–ক্ষিপ্রকারী তত ভূত্বা প্রসহ্যাপি দহেত নঃ।
ভীম যা বলেছিলেন, তার উদ্দেশ্য ছিল সরল। কিন্তু যুধিষ্ঠির যা বলছেন, তা রাজনীতির অন্তৰ্গঢ় কথা। মনুসংহিতা থেকে মহাভারত সর্বত্রই এই নীতি এক রকম। মনু বলেছেন–শত্রুর ইঙ্গিত–আকার চেষ্টা সব সময় বুঝতে হবে, কিন্তু নিজের ইঙ্গিত-আকার যেন শত্রু একটুও না বোঝে। আশ্চর্য কথা হল, মহাভারতে কণিকের মতো শৃগালবুদ্ধি ব্যক্তি ধৃতরাষ্ট্রকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন যুধিষ্ঠির এখন সেই নীতিতে চলছেন। সর্বদা মনের মধ্যে সশঙ্ক থেকেও অশঙ্কিত আকার প্রকাশ করাটা হল অসাধারণ রাজনৈতিক চাতুর্যের পরিচয়, যুধিষ্ঠির তাই করছেন। কে বলে যুধিষ্ঠির কূটনীতি বোঝেন না!
যুধিষ্ঠির বললেন–দেখ ভাই! পুরোচন লোকনিন্দারও ভয় করে না, পাপেরও ভয় করে না, তার মধ্যে সে এখন দুর্যোধনের মতে কাজ করে যাচ্ছে। কাজেই যে কোনও সময় ঘরে আগুন দিতে তার আটকাবে না। তার চেয়ে এটা কিন্তু অনেক ভাল হবে যে, আমাদের জন্য যে বাড়ি তৈরি হয়েছে, তাতে আমরাই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে চলে যাব। এরপর যদি পিতামহ ভীষ্ম এবং অন্যান্য কুরুবৃদ্ধদের বুঝিয়ে বলি যে, আমাদের জন্য এইরকম অগ্নি–গৃহ তৈরি করিয়েছিলেন দুর্যোধন, আমরা তাই নিজেরাই সে বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছি–তাতে তারা অন্তত আমাদের দুষবেন না, দুষবেন দুর্যোধনকেই। কিন্তু আমরা যদি গৃহদাহের ভয়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যাই, তবু দুর্যোধন কিন্তু ছাড়বে না। সে অন্য গুপ্তচর লাগাবে আমাদের অন্যভাবে মারার জন্য। স্পশৈর্নো মারয়েৎ সর্বান্ রাজ্যলুব্ধঃ সুবোধনঃ।
যুধিষ্ঠির নিজে বুঝতে পারছেন যে, এখন আর তিনি যুবরাজ পদে নেই। হস্তিনাপুরের রাজনৈতিক শক্তি এখন আর তাকে সাহায্য করবে না। কারণ তিনি পদে নেই। রাজনৈতিক শক্তি পিছনে নেই বলেই তাকে চলতে হবে আপন প্রজ্ঞায়, কূটপদ্ধতিতে। কারণ বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে জরুরী কথা। যুধিষ্ঠির বললেন–দুর্যোধন নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত আছে সমস্ত রাজনৈতিক শক্তি হাতে নিয়ে। হস্তিনাপুরের মন্ত্রী-অমাত্যরা তার সহায় আছে। কিন্তু নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার জমিটুকু আমাদের চলে গেছে। আমাদের না আছে। রাজনৈতিক শক্তি, না আছে মন্ত্রী-অমাত্যের সহায়। টাকা-পয়সা সে যথেচ্ছ খরচা করতে পারে, কিন্তু আমরা তা পারি না। হস্তিনাপুরের সৈন্য-সামন্তও তার হাতে আছে, আমাদের তা নেই। কাজেই আমাদের পিছনে লাগার কোনও অসুবিধেই নেই তার—
অপদস্থান পদে তিন্নপক্ষান্ পক্ষসংস্থিতঃ।
হীনকোশান্ মহাকোশঃ প্রয়োগৈ–ঘাতয়েদ ধ্রুবম্।
যুধিষ্ঠির খুব সহজে কথা বলে দিলেন বটে, কিন্তু গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে যে, প্রাচীন রাষ্ট্রনীতির মধ্যে যে সপ্তাঙ্গ রাষ্ট্রের কথা আছে, তার মধ্যে রাজা, অমাত্য, কোশ, পুর, দুর্গ, দণ্ড এবং মিত্র–এর কোনওটাই এখন যুধিষ্ঠিরের অনুকূলে নেই। অতএব যুধিষ্ঠিরকে এখন যা কিছু করতে হবে তা করতে হবে আত্মরক্ষার জন্য এবং তা করতে হবে কূটনীতির মাধ্যমেই। যুধিষ্ঠির বললেন–এই বদমাশ পুরোচন আর দুর্যোধনকে ঠকিয়ে দিতে হবে। আমরা দেখাব যেন এই বাড়িতেই থাকছি। কিন্তু থাকব এখানে ওখানে গোপনে বঞ্চয়দ্ভির্নিবস্তব্যং ছন্নাবাসং কচি ক্কচিৎ। আমরা সারাদিন মৃগয়া করে যাব এ বনে সে বনে এবং দেখাব যেন মৃগয়ার ব্যসন আমাদের পেয়ে বসেছে, কিন্তু সেই ফাঁকে আমরা, এই অঞ্চলের সমস্ত রাস্তা চিনে নেব। তাতে আমাদের পালানোর সুবিধে হবে–তথা নো বিদিতা মার্গা ভবিষ্যন্তি পলায়ম্। আর আরও একটা কাজ করতে হবে ভীম। আজকেই এই বাড়ির মধ্যে একটা গর্ত খুঁড়ে ফেলব আমরা। আমাদের সেই গর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে হবে ইঁদুরের বুদ্ধিতে। তাতে অন্তত আগুন লাগলেই আমরা মরব না। অতএব গর্তটা খুঁড়তে হবে আজই–ভৌমঞ্চ বিলমদৈব্যং করবাম সুসংবৃত। সেই গর্তের মধ্যে আমরা এমনভাবেই থাকব, যাতে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসেও পুরোচন বা অন্যান্য পুরবাসীদের মালুম না হয় যে, আমরা কোথায় লুকিয়ে আছি–বসতোত্র যথা চাম্মা ন বুধ্যেত পুরোচনঃ।
যুধিষ্ঠির সমস্ত পরামর্শটাই ভীমের সঙ্গে করলেন এইজন্য যে বিপদ-কালে তিনি যেমন ক্ষিপ্র তেমনই বলশালী। নিশ্চয়ই যুধিষ্ঠিরের কথা মতো সেই দিনই জতুগৃহের একান্তে একটি গর্ত খুঁড়ে দিয়েছিলেন ভীম। কিন্তু যুধিষ্ঠির বেশ বুঝতে পারছিলেন যে শুধু একটি গর্ত খুঁড়েই শেষ রক্ষা হবে না। কারণ বাড়িতে আগুন লাগলে গর্তের মধ্যে খানিকক্ষণ থেকে আত্মরক্ষা করা যেতে পারে বটে, কিন্তু আগুন জোরদার হলে নিমেষে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে পালানোর জন্য আর সেই জন্যই সকলকে বাদ দিয়ে ভীমকেই সব কথা সবিস্তারে বলে রাখলেন যুধিষ্ঠির। কারণ কালে ভীমের ক্ষিপ্রতা, শক্তি, উৎসাহ এতটাই কাজে লাগতে পারে যে, তাকে সব কিছু জানিয়ে রাখাটা ছিল অত্যন্ত জরুরী।
