একটি নতুন জায়গায় গেলে কীভাবে সেই অঞ্চলের মানুষদের মন পেতে হয়, সেই রাজনৈতিক বুদ্ধিটুকু যুধিষ্ঠিরের যথেষ্টই আছে। নগরে প্রবেশ করেই যুধিষ্ঠির আগে দেখা করতে গেলেন বারণাবত-নিবাসী ব্রাহ্মণ-সজ্জনদের বাড়িতে। ব্রাহ্মণরা সমাজমুখ্য এবং শিক্ষা-দীক্ষায় সমস্ত জাতির মধ্যে অগ্রগণ্য বলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সঙ্গে পরিচিত হলেন যুধিষ্ঠির। আপন বিনয়-শিক্ষা এবং বিনম্রভাবে তাদের মন পেতে দেরী হল না তার। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে দেখা করে যুধিষ্ঠির দেখা করলেন নগরপাল ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে। তারা আপন ওজস্বিতায় নগর রক্ষা করছেন, বারণাবতবাসী প্রজাদের পালন করছেন। অতএব তাঁদের সঙ্গে মেলামেশা পরিচিতি দরকার–নগরাধিকৃতানাঞ্চ গৃহাণি রথিনাং তথা। বৈশ্য এবং শূদ্ররা-আধুনিকেরা যাঁদের মনে করেন সেকালের অপদস্থ দাসানুদাস–যুধিষ্ঠির কিন্তু ভাইদের সঙ্গে নিয়ে তাদেরও বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখা করলেন–উপতভু-নরশ্রেষ্ঠা বৈশ্য-শূদ্রগৃহাণ্যপি।
জনপদবাসী সকলের সঙ্গে ধুলো পায়ে দেখা করলেন যুধিষ্ঠির। হস্তিনাপুরের যুবরাজের পদ ছেড়ে এলেও যুবরাজের মর্যাদা এবং কর্তব্য কোনওটাই ভোলেননি তিনি। বারণাবতের পৌর-জনপদবাসী যেভাবে তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, ঠিক তেমনি সাদরে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকলের সঙ্গে দেখা করে তাঁদেরও নাগরিক মর্যাদা রক্ষা করলেন যুধিষ্ঠির।
১১৫. পুরোচন অতিশয় বুদ্ধিমান লোক
১১৫.
পুরোচন অতিশয় বুদ্ধিমান লোক। স্থানীয় মানুষ-জন সকলের সঙ্গে পাণ্ডবদের পরিচয় আপ্যায়ন শেষ হয়ে গেলে পুরোচন তাদের একটি অস্থায়ী আবাসে এনে তুলল। সে জানাল যে, পাণ্ডবদের স্বচ্ছন্দবাসের জন্যই নতুন একটি ভবন তৈরি হচ্ছে। কাজ এখনও কিছু বাকি আছে। নির্মাণ সম্পূর্ণ হলেই নতুন বাড়িতে পুরোচন তাদের নিয়ে যাবে। পুরোচনই যে দুর্যোধনের কার্যসাধক ব্যক্তি, সে কথা পাণ্ডবরা কেউই জানতেন না এবং মহামতি বিদুরও এ বিষয়ে কিছু বলেননি। রাজা-রাজড়াদের প্রোটোকল অনুযায়ী এটা অবশ্যই একটা নিয়ম যে, যেখানে তারা যাচ্ছেন, সেখানকার একজন মান্য ব্যক্তি তাদের দেখাশোনার ভার নেবেন। পুরোচন বারণাবতে এসেছে পাণ্ডবদের অনেক আগে এবং পুরবাসী সকলকে সে বোঝাতে পেরেছে যে, পাণ্ডবদের সুখ–স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই তার আগমন।
অস্থায়ী আবাসে পাণ্ডবদের আবাসন-ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে পুরোচন খাদ্য-পেয়, শয্যা-আসনের ব্যবস্থাও করল ভালভাবে–তেভ্যো ভক্ষাণি পানানি শয়নানি শুভানি চ। পাণ্ডবরাও রাজকীয় চাল-চলনে দামি দামি জামা-কাপড়, ভূষণ-আভরণ পরে রাজকীয় মর্যাদায় সেই বাড়িতে বাস করতে লাগলেন। দুর্যোধনের কার্যসাধক পুরোচনও খুবই আদর করতে লাগল পাণ্ডবদের।
দশ-দশটা দিন এইভাবে কেটে গেল সেই অস্থায়ী আবাসে। এর মধ্যে পুরোচনের বাড়ি সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। সেই ঘৃত-জতুনির্মিত দাহ্য পদার্থের চকমিলানো বাড়ির নাম দেওয়া হয়েছে শিব-ভবন। শিব মানে মঙ্গল। বাড়ির উদ্দেশ্য অতএব মঙ্গল-সাধন। এই মঙ্গল অবশ্যই পাণ্ডবদের নয়, দুর্যোধনের মঙ্গল। পাণ্ডবদের পক্ষে এই নবনির্মিত ভবন অমঙ্গলকর বলেই কবি লিখেছেন–নামটা শিব-ভবন বটে তবে বাস্তবে তা বড়ই অমঙ্গলকর—শিবাখ্যমশিবং তদা।
পাণ্ডবরা তাদের জিনিসপত্র নিয়ে মায়ের সঙ্গে উঠে এলেন তথাকথিত শিব-ভবনে। তাদের জন্যই এই বাড়ি তৈরি হয়েছে হস্তিনাপুরের নির্দেশে। অতএব না উঠে উপায় কী? কুমার যুধিষ্ঠির আগে থেকেই বিদুরের কথায় যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। অতএব নতুন বাড়িতে এসেই তিনি গৃহটিকে পরীক্ষা করে নেওয়ার তাড়না অনুভব করলেন। বাড়িতে ঢুকেই যুধিষ্ঠির একটা অতি অদ্ভুত গন্ধ পেলেন, যে গন্ধ সাধারণত নতুন বাড়িতে পাওয়া যায় না। ঘি, গালা আর চর্বি মিলিয়ে এমনই এক উগ্র গন্ধের সৃষ্টি করেছে যে, যুধিষ্ঠির শুঁকেই বুঝতে পারলেন–বাড়িটি সাধারণ নয়–জিন্ সোস্য বসাগন্ধং সর্পিজতুবিমিশ্রিত। তিনি ভীমকে বললেন–ভীম! এ বাড়ি এমনভাবেই তৈরি হয়েছে যাতে খুব সহজে আগুন লাগানো যায়। শণ, ধুলো, মুজা, কাঁচলা আর বাঁশ হল এই বাড়ি তৈরির উপকরণ। এই বস্তুগুলিকে ঘিয়ে চুবিয়ে এ বাড়ি তৈরি করেছে বিশ্বাসী শিল্পীদের দিয়ে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে পুরোচন আমাদের পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করেছে। আমরা যখনই পুরোচনকে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করব, পুরোচন তখনই তার দুর্বুদ্ধি ফলাবে–বিশ্বস্তং মাময়ং পাপো দখুকামঃ পুরোচনঃ।
যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের মন্দ উদ্দেশ্যের কথা বুঝিয়ে দিলেন ভীমকে। কারণ ভীম ভুক্তভোগী, তিনিই সবচেয়ে ভাল বোঝেন, দুর্যোধনের উদ্দেশ্য। যুধিষ্ঠির বললেন–পুরোচন নিজেই যথেষ্ট দুষ্ট লোক, তার মধ্যে সে এখন কাজ করছে দুর্যোধনের হয়ে–তথাহি বৰ্ততে মন্দো দুর্যোধন বশে স্থিতঃ। তবে হ্যাঁ সুখের কথা, আমাদের হিতৈষী বিদুর আগেভাগেই দুর্যোধন-পুরোনের এই উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছেন। বিদুর আমাদের পিতার ছোট ভাই। তিনি আমাদের যথেষ্ট স্নেহ করেন বলেই আমাকে সাবধান করে দিয়েছেন সম্ভাব্য বিপদের বিষয়ে–আপদং তেন মাং পার্থ স সংবোধিতবান্ পুরা। দুর্যোধনের কথা শুনে কতগুলি নীচ-ইতর লোক এ বাড়ি তৈরি করেছে।
ভীম সরল মানুষ। তার পক্ষে এইটাই স্বাভাবিক ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে পুরোচনকে ধরে, তুলে আছাড় মারেন মাটিতে। কিন্তু নতুন জায়গায় এসব করা উচিত কিনা, সে বিষয়ে ভীমের একটু সংশয় আছে। বিশেষত যুধিষ্ঠির খুব দুর্ভাবনার মধ্যে পড়ে গেছেন দেখে তিনি সরল মনে বললেন–এই বাড়িটাকে যদি তুমি খুব সহজ-দাহ্য মনে কর তবে ভালয় ভালয় আমরা আমাদের সেই পুরনো বাড়িটাতেই ফিরে যাই না কেন–তত্রৈব সাধু গচ্ছামো যত্ৰ পূৰ্বোষিতা বয়ম।
