যুধিষ্ঠির কথা লুকোলেন না। তিনি ভাবলেন–বিদুর যা বলেছেন তা যদি সত্যি হয়, তবে সেই দুর্ঘটনা আকস্মিকভাবে তার মা-ভাইদের ওপরে না নেমে আসাই ভাল। বরঞ্চ এ ব্যাপারে যদি সকলের মানসিক প্রস্তুতি থাকে তো সেটা ভালই হবে। যুধিষ্ঠির বললেন–বারণাবতে আমাদের ঘরে আগুন লাগানো হবে, মা! সেটা যেন আমাদের জানা থাকে। বিদুর তাই সাবধান করে দিলেন–গৃহাদগ্নিশ্চ বোদ্ধব্য ইতি মাং বিদুরোব্রবীৎ। তিনি আরও বলে দিলেন– সেখানকার কোনও পথ যেন আমাদের না অজানা থাকে। আমরা যদি আমাদের বিপন্ন অবস্থাতেও কাম-ক্রোধ জয় করে ইন্দ্রিয়গুলি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, তবে আবারও আমরা রাজ্য লাভ করব। বিদুর সে কথাও বলে দিলেন।
জননী কুন্তী কিছু কচিকাঁচা খুকী নন যে, ঘরে আগুন লাগবে শুনে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়বেন। তিনি রাজবাড়ির মেয়ে, রাজার ঘরে তিনি মানুষ হয়েছেন এবং হস্তিনাপুরের রাজবধূ হয়ে আসা ইস্তক তাকে যে সব পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলতে হয়েছে, অপি চ স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে অসহায় পুত্রদের নিয়ে তিনি যেভাবে কাল যাপন করছেন, তাতে এই আগুন লাগানোর কথায় কোনও ভাবান্তর হল না তার। অন্তত মহাভারতের কবি সে কথা বলেননি একবারও। যুধিষ্ঠির বললেন এবং কুন্তী শুনলেন এই পর্যন্ত।
এতক্ষণ বিদুরকে যেমনটি দেখলাম সেটাও বেশ ভাবনা করার মতো। আমি দেখেছি মহাভারতের প্রখ্যাত চরিত্র অর্জুনের কথা বলুন, কি ভীমের কথা বলুন তো সবার চোখ চকচক করে উঠবে। এমনকি কর্ণের কথা বলুন, কি দুর্যোধনের কথা বলুন তাতেও বেশ আগ্রহ আছে। কিন্তু যেই বিদুরের কথা বলবেন–অমনই দেখবেন আর শুনতে চাইছেন না কেউ। তারা বলেন–ও মশাই এক মিনমিনে চরিত্র, খালি ধর্মকথা বলেন, কেমন যেন ব্যক্তিত্ব নেই কোনও।
আমি আমার কথা বলি–সারা মহাভারত জুড়ে বিদুরের মতো এমন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আর দ্বিতীয়টা চোখে পড়েনি আমার। রাজবাড়ির আয়-ব্যয়, সন্ধি-বিগ্রহ–ইত্যাদি রাজনৈতিক তাত্ত্বিকতায় যেমন তার কোনও জুড়ি নেই, তেমন প্রখর তার বাস্তববোধ। পাণ্ডু মারা যাবার পর হস্তিনাপুরের রাজবাড়িতে পাণ্ডবদের দুর্বল স্থিতি বুঝেই তিনি নিজে তাদের সুরক্ষার ভার নিয়েছেন। ভীমকে বিষ খাওয়ানোর পরেও তিনি দুর্যোধনের অন্যায় সেইভাবে প্রকাশ করতে দেননি পাণ্ডবদের এবং তিনি নিজেও কিছু বলেননি। কারণ তিনি জানতেন যে, দুর্যোধনের অন্যায় ধৃতরাষ্ট্র বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু এই ঘটনার পর থেকে দুর্যোধনকে চিনে নিয়েছেন তিনি। সদা-সর্বদা তার ওপরে নজর রেখে আজ তিনি এটাও বুঝেছেন যে, দুর্যোধন কী করতে চলেছেন। দুর্যোধনের এই দুর্মন্ত্রণাও তিনি ব্যক্ত করবেন না অথচ তার কাজগুলি একেবারে পাক্কা গোয়েন্দাদের মতো। বিদুর সময়ের অপেক্ষা করছেন যেদিন পাণ্ডবরা নিজের ক্ষমতা এবং নিজের গুণেই অধিষ্ঠিত হবেন হস্তিনাপুরের পিতৃরাজ্যে।
ফাল্গুন মাসের আট দিনের দিন পাণ্ডবরা পৌঁছলেন বারণাবতে। এখনকার দৃষ্টিতে বারণাবত জায়গাটা যে হস্তিনাপুর থেকে খুব দূরে তা নয়, বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাসুতসোম জাতকে হথিনীপুর বলে যে জায়গাটির নাম পাওয়া যায় তা অবশ্যই আমাদের মহাভারতের হস্তিনাপুর। কিন্তু এখানেই বলা আছে হখিনীপুর বা হস্তিনাপুরের চারপাশে কতগুলি ছোট্ট ছোট্ট টাউনশিপ এবং গ্রাম ছিল যেগুলিকে বলা হয়েছে নিগম! এই ছোট শহর বা গ্রাম-নামের মধ্যে আছে থুল্লকোটুঠিত, কস্মাসদম্ম, কুণ্ডি এবং অবশ্যই বারণাবত। আধুনিক পণ্ডিতেরা বর্তমান ভারতবর্ষের মিরাট জেলার অন্তর্গত বরনব নামের একটি জায়গার সঙ্গে বারণাবতকে একাত্মক করে দেখিয়েছেন। তারা বলেন, হিন্দোন আর কৃষ্ণা নদীর মিলন হয়েছে। যেখানে তার ওপরেই গড়ে উঠেছে বারণাবর্ত বা এখনকার বরনব জনপদ।
আমরা একথা মানি, কেন না হস্তিনাপুর অঞ্চলটি মিরাটের মধ্যেই পড়ে। হয়তো তার কাছাকাছি ছিল এই ছোট্ট জনপদ। আমরা পূর্বে হস্তিনাপুরের নামসাম্যে বলার চেষ্টা করেছি যে, এখানে পূর্বে নাগ জনজাতির বাস ছিল। বারণাবত শব্দের আগেও ওই হস্তীর পর্যায়বাচক বারণ শব্দটি থাকায় বারণাবত নামের জায়গাটিকে আমরা বারণসাহয়, নাগসাহুয় বা হস্তিনাপুরের স্যাটেলাইট টাউন বলে মনে করি।
যাই হোক বারণসায়ের যুবরাজ এসেছেন বারণাবতে। এসেছেন তার চার ভাই এবং জননীকে সঙ্গে নিয়ে। ছোট্ট জনপদের মধ্যে আনন্দের ধুম পড়ে গেল। দূর দূর জায়গা থেকে নানা শ্রেণীর লোকেরা কেউ রথে চড়ে, কেউ ঘোড়ায়, কেউ বা অশ্বতরের পিঠে চেপে, আবার কেউ বা হেঁটে চলে এল সমাতৃক পাণ্ডবদের অভ্যর্থনা জানাতে–শ্রুত্বাগতা পাণ্ডুপুত্ৰান্ নানাযানৈ সহস্রশঃ। জনপদবাসীদের হাতে মাঙ্গলিক দ্রব্য-দুই-দুব্বে-ধান। সমস্ত লোকের মুখে তাদের মনের যুবরাজ যুধিষ্ঠিরের জয়কার শব্দ শোনা গেল। কেউ আশীর্বাদ করছেন যুধিষ্ঠিরকে, কেউ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, কেউ বা শুধু কাছে যাবার চেষ্টা করছেন যুবরাজের। সমস্ত মানুষ যুধিষ্ঠিরকে ঘিরে ধরে অভ্যর্থনা জানাল–কৃত্বা জয়াশিষঃ সর্বে পরিবাৰ্য্যাবতস্থিরে।
হায়! যুধিষ্ঠির তখন জানেনও না, অথবা খুব ভালভাবেই জানেন যে, তাঁর যুবরাজ পদ চলে গেছে। তবু বারণাবতের জনপদবাসীদের এই উদ্বেলিত আনন্দস্রোত তিনি স্তব্ধ করে দিলেন না। প্রকাশ করলেন না কুরুবাড়ির অন্তর-মন্ত্রণা। যুধিষ্ঠিরকে ভারি সুন্দর লাগছিল। জনগণের মধ্যে যুধিষ্ঠিরকে দেখতে লাগছিল দেবতাদের মধ্যে দাঁড়ানো ইন্দ্রের মতো। পুরবাসীদের আপ্যায়ন-অভ্যর্থনা শেষ হলে যুধিষ্ঠির তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বারণাবতের মূল কেন্দ্রভূমিতে প্রবেশ করলেন।
