নীলকণ্ঠ ব্যাকরণজ্ঞানের সক্ষমতায় ব্যাসলিখিত সংস্কৃত শব্দগুলি নিয়েই প্রচুর ব্যায়াম করেছেন বটে, তবে আমাদের মনে হয় লুপ্তবর্ণ বা অধিকবর্ণ সংযোগে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়, তা থেকে বক্তার অভীষ্ট বুঝে নেওয়া যত কঠিন, অন্য যবনজাতি ব্যবহৃত ভাষা তার থেকে সহজ। আমাদের দুর্ভাগ্য, মহাভারতের কবি সেই ম্লেচ্ছ-যবনের ভাষার নমুনা কিছু দেননি। দিলে আমাদের জ্ঞানী ঐতিহাসিকেরা বলে দিতে পারতেন–মহাভারতের কালে কোন কোন বিদেশি মানুষ আমাদের অতিথি হয়েছিলেন এবং তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যাতে বিদুর-যুধিষ্ঠিরের মতো মহামতি ব্যক্তিরা সেই ভাষায় জ্ঞানলাভ করা প্রয়োজন মনে করেছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য মহাভারতের কবির মহাকাব্যের ইন্দ্রজালে ইতিহাসের এই পরম প্রিয় ভাবনাটুকু ধরা পড়ল না। অন্যদিকে এও ঠিক যে, ধরা যখন পড়লই না, তখন ব্যাকরণের ব্যায়ামে সহজবোধ্য সংস্কৃতের মধ্যে আর নতুন আবিষ্কার
করাই ভাল। কারণ মহাভারতের কবি যে ভাষায় এখানে তর্জমা করেছেন, বিদুর সে ভাষায় কথা বলেননি। নীলকণ্ঠ নিজেও তা স্বীকার করেছেন–যদ্যপি যুধিষ্ঠিরং প্রতি বিদুরেণ ম্লেচ্ছভাষায় উক্ত, তথাপি ব্যাসেন তৎ সংস্কৃতেনৈরোপনিবদ্ধমিতি।
অলৌহনির্মিত অস্ত্রশস্ত্রের বিপন্নতায় কীভাবে বাঁচতে হবে, তার উপায় বলবার সময়েই বিদুর আগুন-লাগার ইঙ্গিতটি করে দিয়েছেন। কাজেই সেই কারণেও আগের শ্লোকের অত ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজন নেই। বিদুর বলেছেন–দেখ বাপু! শুকনো গাছের ছোট্ট বনে যখন আগুন লাগে, তখন সেই আগুনই বড় বনের শুকনো গাছে গিয়ে লাগে। বারণাবতের নির্মাতব্য চকমিলানের বাড়ি আর ছোট্ট পুরোচনের ঘরটির ইঙ্গিত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিদুর বললেন–এমন দাবানলেও কিন্তু জীবজন্তু কিছু বেঁচেই যায়। আগুন লাগলেও যাতে না মরি, এমন ভাবনা পরিষ্কার না থাকলেও পশুজগতে এমন প্রাণী আছে, যারা সেই ভাবেই থাকে যাতে তাদের মরার ভয় থাকে না। তারা ঠিক বাঁচেন দহেদিতি চাত্মানং যো রক্ষতি স জীবতি।
এখানে ইঙ্গিতটা অবশ্য ইঁদুরের দিকে। বনের মধ্যে আগুন লাগলেও গর্তবাসী ইঁদুরের কোনও ভয় নেই। মাটির তলায় সুড়ঙ্গপথে তার রাজ্য। এধার দিয়ে ঢুকে অন্য জায়গা দিয়ে সে বেরবে, সেখানে আগুনের ভয় নেই। এখানে যুধিষ্ঠির যদি বুঝে নেন,–যে, বেশ তো তাহলে গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে থাকব, মাটির তলায়! কিন্তু বিদুর জানেন তাতে শেষরক্ষা হবে না। আগুন থেকে বাঁচলেও মাটির তলায় দম বন্ধ হয়ে মরতে হবে সবাইকে। বিদুর তাই আরও একটু উপদেশ দিয়ে বললেন–দেখ যুধিষ্ঠির! যার চোখ নেই সে পথ দেখতে পায় না, দিক্-নির্ণয়ও করতে পারে না। অর্থাৎ বিদুর বলতে চাইছেন–মাটির তলায় গর্তে লুকোলেও আর তিনটি বস্তুর প্রয়োজন আছে সেখানে। অর্থাৎ মাটির তলাতেও পথ দেখতে হবে, দিক্-নির্ণয় করতে হবে এবং সেই পথ বানানোর ধৈর্যও রাখতে হবে।
বিদুর আরও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন বন্য প্রাণীর সাজাত্যে। বললেন–গর্তের ভিতরে আশ্রয় নেওয়া সত্ত্বেও মানুষ যদি শত্রুর দেওয়া আগুনের উত্তাপে কষ্ট পায়, তবে শজারুর মতো গর্তের অপর প্রান্তে গিয়ে সেই উত্তাপ থেকে মুক্তি পেতে হবে–শ্ববিচ্ছুরণমাসাদ প্রমুচ্যেত হুতাশনাৎ। অর্থাৎ ইঁদুরের মতো থাকলে চলবে না, থাকতে হবে শজারুর মতো। ইঁদুর গর্তে লুকোয় বটে কিন্তু তার গর্তের মুখ একটাই। কিন্তু যে গর্তে শজারু থাকে তার প্রবেশদ্বার এবং নির্গমনদ্বার একটাই হয় না। দুটো তো বটেই এমনকি তার বেশিও হতে পারে। বস্তুত নিজের গায়ের কাঁটা এমনভাবেই শজারুর দেহে সাজানো থাকে যে, প্রতিলোম পথ চলতে তার অসুবিধে হয়। সেইজন্যই সে মাটির তলায় সুড়ঙ্গ খুঁড়ে অন্য জায়গায় বেরনোর পথ করে নেয়। বিদুর যুধিষ্ঠিরকে তাই করতে বলছেন। তাতে অন্তত গর্তের মধ্যে উত্তাপে দম বন্ধ হয়ে মরতে হবে না।
যদি এমন প্রশ্ন হয়। ঢোকার পথ, বেরনোর পথ, এসব খুঁজতে হবে কীভাবে? বিদুর বললেন–মানুষ আগে থেকেই ঘুরে-ফিরে দিনের বেলায় সব জায়গাগুলো দেখে রাখে। ক্ষত্রিয়ের মৃগয়ার ছলেই হোক, একাকী ভ্রমণের ছলেই হোক, জায়গাগুলো চিনে রাখতে হবে আগে থেকে এবং দিনের বেলায়। সুড়ঙ্গ কেটে যেখানে বেরনো গেল, সেখান থেকে পথ চিনে পালাতে হবে। দিনের বেলায় যদি জায়গা চিনে রাখা যায় তবে রাত্রিতে আকাশের তারা দেখেই বোঝা যাবে কোন দিকে গেলে সুরক্ষিত রাখা যাবে নিজেদের–চরন্ মার্গা বিজানাতি নক্ষত্রৈ-বিন্দতে দিশঃ। বিদুর বলে দিলেন–তোমরা সবাই মিলে ছজন, যেভাবে পালাতে হবে তার কষ্ট কম নয় কিছু; সবাইকেই কষ্ট সইতে হবে বটে, তবে এই উপায়ে মৃত্যুর কষ্ট থেকে অন্তত রেহাই পাওয়া যাবে।
অন্যান্যদের সামনেই বিদুর এত সব কথা বললেন, তারা এই প্রলাপের বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারল না। কিন্তু যুধিষ্ঠির সব বুঝলেন–এবমুক্তঃ প্রত্যুবাচ তমিত্যেব পাণ্ডবঃ। তিনি বিদুরকে সন্দেহমুক্ত করে বলে দিলেন যে, আমি সব বুঝেছি। আশ্চর্য–বক্তা কুশলোস্য লব্ধা। দবিদুর আরও কিছুদূর পাণ্ডবদের পিছন পিছন গেলেন এবং শেষে সাদর-আশীর্বাদ করে বাড়ি ফিরে গেলেন। সবাই যখন চলে গেছেন, রথের গতি যখন কিঞ্চিৎ দ্রুততর হয়েছে, তখন জননী কুন্তী তার জ্যেষ্ঠ পুত্রের সামনে এসে বললেন–বিদুর যে সবার সামনে কী আবোল-তাবোল বলে গেলেন, যা না বললেই বোধহয় ভাল ছিল, তিনি যেন পরিষ্কার করে কিছু বলতেই চাইলেন না।–ক্ষত্তা যদবী বাক্যং জনমধ্যে ব্রুবন্নিব। আবার তুমিও বাছা! সেই অদ্ভুত কথা শুনে বললে–সব বুঝেছি। কিন্তু বাছা! আমরা তো এসব কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না–ত্বয়া চ স তথেত্যুক্তো জানীমো ন চ তদ্বয়ম্। তা বাছা! যদি মনে করো সে সব কথা আমরাও বুঝব অথবা যদি মনে করো যে, সে সব কথা খুলে বললে অন্য কোনও দোষের সম্ভাবনা নেই, তবে–যদীদং শক্যমপ্যাভি–তুং ন চ সদোষবৎ–তাহলে বলো না বাছা তোমাদের মধ্যে কী কথা হল?
