মহাভারতের কবি লিখেছেন–দুষ্টবুদ্ধি মানুষগুলোর মুখচোখের ভঙ্গি, তাদের ক্রিয়া-কর্ম এবং নানান ব্যবহার প্রক্রিয়া দেখেই বিদুর বুঝে ফেললেন যে দুর্যোধন-পুরোচনরা কী করতে চাইছেন–
তেষামিঙ্গিত–ভাবজ্ঞো বিদুরস্তত্ত্বদর্শিবান্।
আকারেণৈব তং মন্ত্রং বুবুধে দুষ্টচেতসাম্।
বস্তুত ইঙ্গিত, ভাব আকার এবং চেষ্টা–এই কয়টি শব্দ মোটামুটি তৎকালীন গুপ্তচরবৃত্তির পারিভাষিক শব্দ। মুখের ভাব, চোখের ভাব তো সাধারণ কথা, শত্রুর কথা-বার্তা, ব্যবহার এবং ক্রিয়াকর্ম লক্ষ্য করাটাই গুপ্তচরবৃত্তির প্রধান উপাদান। বিদুর যে লোকটিকে ঘোড়ায় চড়ে আসতে দেখলেন, সে খচ্চরে-টানা রথে করে চলে গেল কেন–প্রায়াদ্রাসভযুক্তেন স্যন্দনেন–যে লোকটি খচ্চরে-টানা রথে করে রওনা হল, সে হস্তিনাপুরের বর্ধমান-পুরদ্বার থেকে বেরিয়ে গিয়ে রথে শীঘ্রগামী ঘোড়া যুতল কিনা–এইসব খুঁটিনাটি খবর যোগাড় করতে বিদুরের দেরি হল না।
আরও একটা জিনিস বিদুর নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন। বারণাবত হস্তিনাপুরের মতো কোনও বড়ো শহর নয়; একটি গ্রাম মাত্র। সেখানে শীঘ্রদাহ্য শন-তৃণ পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই কিন্তু একটি অতিদাহ্য চকমিলানো বাড়ি তৈরি করতে যে পরিমাণ ঘি, লাক্ষা, চর্বি, ধুনো দরকার তা বারণাবতের সাধারণ বাজারে মিলবে না। বিদুর পুরোচনকে নিশ্চয়ই হস্তিনাপুরের বড় বাজারে যেতে দেখেছেন। গুপ্তচরের মুখে তিনি নিশ্চয়ই খবর পেয়েছেন যে প্রচুর ঘৃত-তৈলের বরাত মিলেছে দোকানদারদের, জতু–ধুনোর কণামাত্রও আর পাওয়া যাচ্ছে না হস্তিনাপুরের বিপণীগুলিতে।
সন্ধিগ্ন ব্যক্তির আকার, ইঙ্গিত চেষ্টা তথা ব্যবহার-ক্রিয়া থেকেই তার ভাব বা অভিপ্রায় বোঝা যায়। বিদুর তাই পরিষ্কার বুঝতে পারলেন যে, কুন্তী এবং পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারবার পরিকল্পনা পাকা হয়ে গেছে দুর্যোধনের। বিদুর যদি তার সন্দেহ প্রকাশ করে সোরগোল তুলতেন, তাহলে দুর্যোধন–ধৃতরাষ্ট্ররা সর্বতোভাবে বিদুরের কথা অস্বীকার করতেন এবং তাতে পাণ্ডবদের ওপর তাদের আক্রোশ আরও বাড়ত। অতএব সামনাসামনি কোনওরকম মাথাগরম না করে যে কূটবুদ্ধিতে ধৃতরাষ্ট্র-দুর্যোধনেরা চলছেন সেই কূটবুদ্ধি দিয়েই তিনি উপস্থিত ঘটনার মোকাবিলা করবেন বলে ঠিক করলেন।
যুধিষ্ঠিরের আশেপাশে তখনও যদি দু-একটি লোক ঘোরাফেরা করছিল, কিন্তু তাতে বিদুরের কোনও অসুবিধে হল না। তিনি ম্লেচ্ছ জনজাতির ভাষা জানতেন। ম্লেচ্ছরা সংস্কৃত ভাষায় কথা বলতেন না, যদি বা বলতেন তাদের উচ্চারণ ছিল একেবারেই অন্যরকম। যেমন কেউ সংস্কৃতে আদাস্যে বলতে আহি বলেন। কেউ বা গৌঃ (গোরু) বলতে গাবী, গোণী, গোতা ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন। ম্লেচ্ছ ধাতুর অর্থ-ভাবনায় মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি এই উচ্চারণ-অশুদ্ধির কথাই বলেছেন, কিন্তু অন্যত্র শ্লেচ্ছ বলতে ভারতবর্ষ বহির্ভূত জনজাতি–শক, হুন, পারদ ইত্যাদি জনজাতিকেও বোঝানো হয়েছে। বিদুরকে এখানে বলা হয়েছে প্রলাপজ্ঞ অর্থাৎ যে সব কথা শুনলে অন্যদের কাছে প্রলাপ–বক্য বলে মনে হবে, বিদুর সেই ভাষা জানেন। সত্যি কথা বলতে কি, উচ্চারণের অশুদ্ধিতে যে ভাষা উচ্চারিত হত, সে ভাষা হস্তিনাপুরের জনপদবাসীদের একটু-আধটু বোঝবারই কথা। কিন্তু ভারতবর্ষের বেদাচারহীন অন্যান্য যবন-ম্লেচ্ছদের ভাষা যদি বিদুর ব্যবহার করে থাকেন, তবে সে ভাষা অন্যদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব।
সুখের বিষয়, বিদুর যে ভাষা জানেন, যুধিষ্ঠিরও সেই ম্লেচ্ছ ভাষা জানেন, অতএব এক প্রাজ্ঞ এবং প্রলাপজ্ঞ হলেন বিদুর। অন্য প্রাজ্ঞ এবং প্রলাপজ্ঞ হলেন যুধিষ্ঠির। একজন আরেকজনকে বললেন অন্য ভাষায়, যা বুঝতে এবং বোঝতে কারুরই অসুবিধে হল না–প্রাজ্ঞঃ প্রাজ্ঞং প্রলাপজ্ঞঃ প্রলাপজ্ঞং বচোব্রবীৎ। বিদুর বললেন–কিন্তু ম্লেচ্ছ ভাষায় বললেও তিনি বেশ রেখেঢেকে বললেন, যদি ম্লেচ্ছ ভাষাও কেউ বুঝে নেয়। অতএব প্রলাপ-বকার মতোই বিদুর যুধিষ্ঠিরকে বললেন–এতদিন তো রাজনীতির বিষয় ভরদ্বাজ-নীতি, কণিক-নীতি অনেক পড়েছ। সেই নীতিশাস্ত্রের বুদ্ধিগুণে এবং অভিজ্ঞতায় শত্রুর উদ্ভাবিত কূটকৌশল যাঁরা বোঝেন, তারা কিন্তু বিপদ থেকে বেরিয়ে আসার উপায়ও বার করে ফেলেন–বিজ্ঞায়েহ তথা কুর্যাদাপদং নিস্তরে যথা।
বিদুর এবার একটু ইঙ্গিত করে বোঝাতে চাইলেন যে, কী ধরনের বিপদ যুধিষ্ঠির এবং তার ভাই তথা জননীর জন্য অপেক্ষা করছে। বিদুর বললেন–দেখ বাপু! এমন অস্ত্রশস্ত্রও কিন্তু অনেক আছে, যা লোহা দিয়ে তৈরি করতে হয় না, অথচ সেসব শস্ত্র মানব-শরীর শেষ করে দিতে পারে–অলোহং নিশিতং শস্ত্রং শরীর-পরিকর্তন। যে মানুষ বিপদ প্রতিকারের জন্য ভাবনা করে, সে কিন্তু লোহার তৈরি নয়, এমন ধারালো অস্ত্রের কথাটাও মাথায় রাখবেন।
বিদুর ম্লেচ্ছ ভাষায় কথা বললেও, তিনি যা বলেছেন, মহাভারতের কবি তা আমাদের বোঝানোর জন্য সংস্কৃতে অনুবাদ করে দিয়েছেন। টীকাকার নীলকণ্ঠ বা আরও অন্য বিখ্যাত টীকাকারেরাও এই সংস্কৃত শ্লোকের মধ্যেও প্রকৃতি-প্রত্যয় এবং ব্যাকরণ জ্ঞানের মুন্সিয়ানা করে তার মধ্যে ভবিষ্যৎ অগ্নিকাণ্ডের ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করেছেন। যেমন অলোহং বলতে নীলকণ্ঠ বলেছেন–এটা আসলে অনল শব্দের মধ্য-বর্ণ লোপ করে অল বলা হল বটে কিন্তু তিনি বোঝাতে চাইলেন অনল। অল শব্দের সঙ্গে সন্ধি হয়েছে উহ শব্দের। উহ মানে সমূহ। তার মানে অলোহ মানে দাঁড়াল অনল-সমুহ।
