পাণ্ডবরা বারণাবতে যাচ্ছেন বটে, তবে তারা যে বারণাবতের স্থান–মাহাত্মে বা দেব–মহোৎসবের মহিমায় বারণাবতে বেড়াতে যাচ্ছেন না, সেটা তাদের মুখ-চোখ দেখেই বোঝা গেল। পুরবাসী-জনপদবাসীদের অনেকাংশকেই দুর্যোধন টাকা খাইয়ে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করলেও পাবলিকের স্বভাবই এইরকম। তারা পাণ্ডবদের দুঃখক্লিষ্ট মুখ দেখে মোটেই আর খুশি রইল না–দীনা দৃষবা পাণ্ডুসুতা অতীব ভূশদুঃখিতা। স্বভাব সরল বলেই তারা তাদের অন্তর্গত ভাবও গোপন করল না মোটেই।
পাণ্ডবদের রথের পিছন-পিছন চলতে চলতে পুরবাসীদের একজন বলেই ফেলল–এই ধৃতরাষ্ট্রটা এক নম্বরের বদমাশ–সর্বথা স সুমন্দধীঃ. এ ব্যাটা নিজের ছেলেদের আর ভাইয়ের ছেলেদের মোটেই এক চোখে দেখে না–বিষমং পশ্যতে রাজা সর্বগ্ন চ সুমন্দধীঃ– নীতি-নিয়ম ধর্মের কোনও বালাই নেই বলেই ধার্মিক যুধিষ্ঠিরকে কেমন করে সে সহ্য করবে। তার মধ্যে ভীম আর অর্জুন যেহেতু শক্তিতেও সবাইকে টেক্কা দিয়েছে, তাই তারাও আর রুচছে না ধৃতরাষ্ট্রের কাছে–ন হি পাপমপাপাত্মা রোচয়িষ্যতি পাণ্ডবঃ। আর ওই নকুল-সহদেবকে তো দেখতেই পারে না পাপী ধৃতরাষ্ট্র।
পুরবাসীরা আইনের প্রশ্নও তুলল। চেঁচিয়ে বলল–কেন বাপু! পাণ্ডবরা তো তাদের বাপের রাজ্যই পেয়েছিল, তারা তো কারও দয়ায় রাজ্য পায়নি রে বাবা। তো ধৃতরাষ্ট্র এদের সহ্য করতে পারল না কেন–তা রাজ্যং পিতৃতঃ প্রাপ্তা ধৃতরাষ্ট্রে ন মৃষ্যতে। পুরবাসীদের মধ্যে অন্য একজন বলল–বেশ তো, ধৃতরাষ্ট্র না হয় এই পাঁচ পাণ্ডব ভাইকে তাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু অন্য সব কুরু-কুলীনরা কী করছিলেন তখন? তারা কি ঘুমোচ্ছিলেন তখন? না ভাই, শুধু ধৃতরাষ্ট্র নয়, আমি ভাই কুরু বৃদ্ধ ভীষ্মকেও ভাল বলতে পারছি না। কেন, তিনি কেন বাধা দিলেন না? এমন একটা গভীরপাপ কম্মো হয়ে গেল আর ভীষ্ম সেটা বসে বসে সহ্য করলেন–অধৰ্ম্যম্ ইদমত্যন্তং কথং ভীমোনুমন্যতে। ধৃতরাষ্ট্র না হয় নিজের স্বার্থে ভাইয়ের ছেলেগুলোকে তাড়িয়েই দিলেন। কিন্তু ভীষ্ম! পাণ্ডবদের এই নির্বাসনে তিনি চুপ করে থাকলেন কী করে–বিবাস্যমানা অস্থানে নগরে যোভিমন্যতে।
পুরবাসীরা ভীষ্মকে খুব গালাগালি দিতে পারছে না। কারণ রাজ্যের ব্যাপারে তার কোনও স্বার্থ নেই। কিন্তু সত্যবাদী স্পষ্ট বক্তা বলে তাঁর যে ভূমিকাটা ছিল, সেটাই যেন বিপর্যস্ত হয়ে গেছে পুরবাসীদের চোখে। একজন তাই বলেই ফেলল–আমরা ভাই সবচেয়ে ভাল ছিলাম ওই মৃত রাজা বিচিত্রবীর্যের সময়ে। বাপের মতন তিনি আমাদের সুখ-দুঃখ দেখেছেন–পিতেব হি নৃপোস্মাক অভূচ্ছান্তনবঃ পুরা। অন্য একজন চেঁচিয়ে বলল–সে কথা যদি বল দাদা, তাহলে বলব–মহারাজ পাণ্ডুর সময়েও আমরা বেশ ছিলাম। আমরা দুর্ভাগা, তিনি অকালে স্বর্গে চলে গেলেন–দেবভাবং গতে সতি–আর সেইজন্যেই তো আজকে এই সোনার পিতিমে ছোট ছোট রাজপুত্রদের ধৃতরাষ্ট্র সহ্যই করতে পারছে না–রাজপুত্ৰান্ ইমান্ বালান্ ধৃতরাষ্ট্রে ন মৃষ্যতে। তা আমরা বাপু এই যুবরাজ যুধিষ্ঠিরকে ছাড়ছি না। এমন বড় শহরে থাকব না সেও ভাল। ঘরবাড়ি ছেড়ে আমরাও বাপু সেইখেনেই চললাম, যেখানে আমাদের যুধিষ্ঠির–গৃহান বিহায় গচ্ছামো যত্র গন্তা যুধিষ্ঠিরঃ।
যুধিষ্ঠির মনে মনে খুশি হলেন নিশ্চয়ই। প্রজাদের আর্তি তাঁকে আবিষ্ট করল। কিন্তু তিনি এমন কিছু করতে পারেন না, বা করতে প্ররোচিত করতে পারেন না, যা রাজকীয় নীতিতে এবং রুচিতে অস্বস্তিকর। ক্ষিপ্ত প্রজাদের পিছন পিছন চলে আসতে দেখে তিনি তাদের সানুনয়ে বললেন–ধৃতরাষ্ট্র আমাদের পিতৃস্থানীয়, আমাদের মাননীয় গুরু। তিনি যা বলেছেন, তার মধ্যে আমরা সন্দেহ প্রকাশ করব না–এই আমাদের ব্রত–অশঙ্কমানৈস্তৎ কার্যমপ্যাভিরিতি নো ব্রত। আপনারা আমাদের পরম বন্ধু। অতএব এখন, যখন আমরা ধৃতরাষ্ট্রের আদেশ মেনে বেরিয়েই পড়েছি, তখন আপনারা আমাদের প্রদক্ষিণ-আশীর্বাদ করে ঘরে ফিরে যান।
হস্তিনাপুরের প্রজাবৰ্গ যুধিষ্ঠিরের কথা অমান্য করলেন না। যুধিষ্ঠির অন্তত এটা বুঝে গেলেন যে, দুর্যোধন হাজার টাকা-পয়সা খরচা করেও তার প্রিয় প্রজাদের হৃদয় কিনতে পারেননি।
.
১১৪.
পৌর-জনপদবাসীরা যুধিষ্ঠিরের আদেশ মান্য করে হস্তিনাপুরের দিকে এগোতে লাগলেন। তাদের সঙ্গে ভীষ্ম রওনা হলেন পাণ্ডবদের আশীর্বাদ করে। দু-চারজন লোক তখনও পাণ্ডবদের আশেপাশে চলছে। এই অবস্থায় পাণ্ডবদের পরম শুভার্থী বিদুর যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে খানিক কথা বলবার জন্য এগিয়ে এলেন। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার একজন প্রাজ্ঞ মন্ত্রী বটে, কিন্তু মহারাজ পাণ্ডুর এই অসহায় পুত্রগুলির ওপর তার অসম্ভব মায়া। কুরুবাড়ির জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্র এবং তার পুত্রদের ভাবসাব যে পাণ্ডবদের প্রতি মোটেই অনুকূল নয়, সেটা তিনি প্রথম থেকে বুঝতে পেরেছিলেন বলেই এই অসহায় পিতৃহীন বালকদের প্রতি তিনি পিতৃতুল্য আচরণ করতেন।
দুর্যোধনের কাছে কয়েকদিন ধরেই একটি প্রায় অচেনা লোককে তিনি আসতে দেখেছেন। হঠাৎ এই লোকটির সঙ্গে দুর্যোধনকে একান্তে গভীর আলোচনা করতে দেখে, অপিচ তাকে অশ্বের বদলে অশ্বতরের পিঠে চেপে বারণাবতের পথ ধরতে দেখেই বিদুর সন্দেহ করেছেন কী ঘটতে যাচ্ছে, অন্তত এটা যে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্র, সেটা বুঝতে তার দেরি হয়নি। মহাভারতের সময়কালীন একজন রাজমন্ত্রী বিদুর। সন্দেহ ঘটার পরেও তিনি চুপচাপ বসে থাকেননি। বিশ্বস্ত লোক দিয়ে তিনি দুর্যোধনের কাছে আসা আগন্তুকের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে বলেছিলেন নিশ্চয়।
