দুর্যোধন এবার তাঁর আসল পরিকল্পনাটি খুলে বললেন–বারণাবতে পৌঁছে তুমি একটি চকমিলান বাড়ি তৈরি করবে। সে বাড়ির মধ্যে দান-ধ্যানের উপযুক্ত ধন–মণি-রত্ন রাখবে, আর ক্ষত্রিয়ের ব্যবহার করার মতো প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্রও রাখবে–আয়ুধাগারমাশ্ৰিত্য কারয়েথা মহাধন। মনে রেখো, সেখানেই পাণ্ডবরা থাকবেন, অতএব রাজবাড়ির আবরু যাতে বজায় থাকে সেইভাবে বাড়ির চারদিকে একটা প্রাচীরও তৈরি করে দিও। এইবারে আসল কথাটা বলি। বাড়িটা তৈরি করার সময়–শণ-গাছ, (বাংলাদেশে ব্যবহৃত ছোন) ধুনো এবং আর যত সব জিনিস আছে যাতে সহজে আগুন ধরে–শণ-সর্জরসাদীনি যানি দ্রব্যানি কানিচিৎ–সে সবই বাড়ি তৈরির মশলার সঙ্গে মিশিয়ে দেবে। বাড়ির ভিতরে বাইরে প্রলেপ দেবার সময় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে অনেকটা করে ঘি, তেল, চর্বি এবং গালা–সর্পিস্তৈলবসাভিশ্চ লাক্ষয়া চাপ্যনল্লয়া। এতে বাড়ির রঙও সুন্দর হবে, চকচকেও হবে। বাড়ির চারদিকে উঁচু উঁচু বেদি তৈরি করাবে বসবার জন্য। তার ভিতরেও থাকবে শণ, তেল ঘি, গালা এবং সে বেদি বানানোর কাঠ দেবে এমন যাতে সহজে আগুন ধরবে।
দুর্যোধন জানতেন যে, নতুন বাড়িতে ঢোকার সময় রাজরাজড়ারা সাধারণ বিশেষজ্ঞ দিয়ে বাড়ি পরীক্ষা করিয়ে নেন। এখানে হয়তো তেমন জোরদার কোনও পরীক্ষা করবেন না যুধিষ্ঠির। কিন্তু ওপর ওপর সামান্য পরীক্ষা করে যাতে বাড়ি তৈরির মশলাটি না বোঝা যায়, তার জন্য পুরোচনকে সাবধান হতে বললেন দুর্যোধন–যথা চ তন্ন পশ্যের পরীক্ষন্তোপি পাণ্ডবাঃ।
দুর্যোধনের কূট বুদ্ধি কিছু কম নয়। তিনি পুরোচনকে এমন একটা ভাবে থাকতে বলছেন, যেন তিনি বারণাবতে পাণ্ডবদের কেয়ারটেকার হিসেবে থাকবেন। দুর্যোধন বলেছেন–ওই বড় বাড়ির সঙ্গে তুমি নিজের জন্যও অমনই একটা ঘর বানাবে পাশেই এবং সে বাড়িটিও তৈরি করাবে ওই একই মশলা দিয়ে। তাতে পাণ্ডবদের কোনও সন্দেহ থাকবে না। তোমার বাড়ি এবং তাদের বাড়ির উপাদান এক হলে প্রাথমিকভাবে পাণ্ডবরা তাকে বিশ্বাস করার কারণ খুঁজে পাবেন অন্তত। দুর্যোধন বলেছেন–বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে তুমি পাণ্ডবদের তথা তাদের জননীকে অনেক আদর-যত্ন করে ওই বাড়িতে প্রবেশ করাবে। বাড়ির মধ্যে যেন ভাল বিছানা, ভাল বসার জায়গা এবং এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াবার ভাল যান প্রস্তুত থাকে। এতে ধৃতরাষ্ট্রও খুশি হবেন।
পাণ্ডবদের ঘর-বাড়ি, বিছানা-বালিশের আরামদায়ক ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়ে দুর্যোধন বললেন–এই বাড়িটিতেই আগুন লাগাতে হবে বন্ধু! কিন্তু যে পর্যন্ত এই আগুন লাগানোর সময় না হয়, ততদিন যেন বারণাবতের লোকেরা একটুও বুঝতে না পারে, তুমি কী করতে চলেছ–যথা চ তন্ন জানন্তি নগরে বারণাবতে। তারপর একদিন যখন বুঝবে–পাণ্ডবরা তোমাকে যথেষ্ট বিশ্বাস করছেন এবং যখন দেখবে–তারাও বিশ্বস্তভাবে নিরুদ্বেগে বাড়ির মধ্যে ঘুমোচ্ছেন, সেইরকম একটা দিনে–তুমি তোমার নিজের ঘরের দরজাটাতে শুধু আগুন লাগিয়ে দেবে। সেই আগুন মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে ফেলবে পাণ্ডবদের সুদৃশ্য চকমিলানো বাড়ি। তোমার নিজের ঘরখানি পুড়ে গেছে দেখলেই–দহমানে স্বকে গেহে–বারণাবতের জনপদবাসীরা বুঝবে পাণ্ডবরাও মারা গেছেন। অন্তত তখন পাণ্ডবদের মৃত্যুর জন্য আমাদের কেউ দায়ী করতে পারবে না–ন গহঁয়েয়ুরস্মন্ বৈ পাণ্ডবার্থায় কহিঁচিৎ
পুরোচন দুর্যোধনের সমস্ত কথা শুনে তার এই কাজ মাথায় পেতে নিলেন। কতগুলি অশ্বতর যোগাড় করে বাড়ি তৈরির টাকা-পয়সা নিয়ে তিনি বারণাবতে চলে গেলেন। দুর্যোধন পুরোচনকে বলেছিলেন–আমার টাকার কোনও অভাব নেই। এ রাজ্য যেমন আমারও তেমনই তোমারও–যথেয়ং মম তত্তে…পুরোচন বসুন্ধরা। কাজেই এই সাংঘাতিক কাজে যে দুর্যোধনের টাকার অভাব হবে না এবং এই কাজটি হয়ে গেলে পুরোচনও যে ধনে–মানে-সম্পত্তিতে যথেষ্ট পুরস্কৃত হবেন–সেটা বুঝেই তিনি দুর্যোধনের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ আরম্ভ করলেন পাণ্ডবরা পৌঁছনোর অনেক আগে থেকেই।
এদিকে পাণ্ডবরাও বারণাবতে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে রাজবাড়ির ভাল ভাল আশুগামী রথের সঙ্গে কাম্বোজদেশজাত উত্তম অশ্ব যোজনা করা হয়েছে। কিন্তু বারণাবতে যেতে তাদের পা সরছে না মোটেই। কেমন করে যুধিষ্ঠির বুঝে গেছেন যে, আর বোধহয় হস্তিনাপুরে তাদের ফেরা হবে না। ভাল মনে বারণাবতে যেতে বললেও এর মধ্যে যেন নির্বাসনের চক্রান্ত আছে। যাবার বেলায় তারা আর্ত মানুষের মতো একবার ভীষ্মের পা জড়িয়ে ধরে বিদায় নিচ্ছেন–পাদৌ জগৃহুরাৰ্তবৎ–একবার দ্রোণ-কৃপের, একবার ধৃতরাষ্ট্রের, কখনও বা বিদুরের পা জড়িয়ে ধরে বিদায়-সম্ভাষণ জানাচ্ছেন।
এইভাবে বৃদ্ধরা যখন তাদের মঙ্গলাশংসা করছেন, সমবয়সীরা যখন বিদায়-আলিঙ্গন জানাচ্ছেন, অল্প বয়সীরা যখন পাণ্ডবদের প্রণাম জানাচ্ছেন, এবং সমস্ত জনপদবাসী যখন যুবরাজ যুধিষ্ঠিরের জয়কার ঘোষণা করছেন, তখন পাণ্ডবরা কুরুবৃদ্ধা জননীদের প্রদক্ষিণ করে বারণাবতের পথে রওনা হলেন। সমবেত জনপদবাসী প্রশস্ত পথ করে দিলেও রথ চলতে লাগল আস্তে। মহামতি ভীষ্ম অন্যান্য কৌরব কুলীনদের সঙ্গে পাণ্ডবদের পিছন পিছন চললেন কিছুকাল। পিছন পিছন চললেন বিদুর এবং অবশ্যই হস্তিনাপুরের দুঃখিত পৌর-জনপদবাসীরা–পৌরাশ্চ পুরুষব্যাঘ্রান্ অন্বীয়ু শোককর্ষিতাঃ।
