যুধিষ্ঠির এটা বুঝলেন–মন্ত্রীরা ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে এককাট্টা হলেও কুরু বাড়ির কুলবৃদ্ধদের অন্তত জানাতে হবে যে, তারা নিজের ইচ্ছায় বারণাবতে বিলাস-ভ্রমণ করতে যাচ্ছেন না, তারা বারণাবতে যাচ্ছেন ধৃতরাষ্ট্রের ইচ্ছায়। যুধিষ্ঠির যাঁদের সঙ্গে দেখা করলেন, তার একটা লিস্টি দিয়েছেন মহাভারতের কবি। এঁরা হলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, অশ্বত্থামা, বাহ্বীক, সোমসও, ভূরিশ্রবা ইত্যাদি। এঁরা অনেকেই কুরুবাড়ির কুলপ্রধান এবং ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভার গণ্যমান্য মন্ত্রী। যুধিষ্ঠির এঁদের প্রত্যেকের কাছে গিয়ে আলাদা করে বললেন–আমরা পরিজনবর্গ সঙ্গে নিয়ে বারণাবতে যাচ্ছি ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে–সগণাস্তত্র যাস্যামো ধৃতরাষ্ট্রস্য শাসনাৎ।
যুধিষ্ঠির অতিশয় বুদ্ধিমান। তিনি বারণাবতের স্থানমাধুর্য, স্থানীয় মানুষের মর্যাদা নষ্ট করলেন না, কারণ সে কথা সকলে বলছে–রমণীয়ে জনাকীর্ণ নগরে বারণাবতে। কিন্তু সেই রমণীয় স্থানে যে তিনি নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছেন না, এটা তিনি দেশ-বর্ণনার সঙ্গেই টুক করে বলে দিচ্ছেন। বলছেন–তিনি যাচ্ছেন–ধৃতরাষ্ট্রস্য শাসনাৎ। যুধিষ্ঠির একই সঙ্গে কুলবৃদ্ধদের আশীর্বাদ ভিক্ষা করছেন। কোনও পাপ যেন তাদের স্পর্শ না করে, কোনও বিপদ যেন না ঘটে, সে জন্য যুধিষ্ঠির সকলের আশীর্বাদ চাইছেন। চাইছেন–তারা যেন যুধিষ্ঠিরের মঙ্গল প্রার্থনা করে পুণ্য শব্দ উচ্চারণ করেন–প্রসন্নমনসঃ সর্বে পুণ্যা বাচো বিমুঞ্চত। যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণ-সজ্জন, তপস্বী-পুরোহিত এবং প্রজাদের কাছেও আশীর্বাদ চাইলেন একই কথা বলে। জননী গান্ধারীর কাছেও তিনি জানিয়ে এলেন যে, ধৃতরাষ্ট্রের ইচ্ছাতে তিনি সকলকে নিয়ে বারণাবতে যাচ্ছেন।
যুধিষ্ঠিরের কথার মধ্যে বিশেষ অভিনিবেশের যে জায়গাটুকু ছিল, কুরুবাড়ির বৃদ্ধ–সজ্জনেরা সে কথা তেমন করে ধরতেই পারলেন না। বস্তুত ধৃতরাষ্ট্রের ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কুশল। যে সব মন্ত্রীদের তিনি বারণাবতের স্থান-সৌন্দর্য বর্ণনা করতে বলেছিলেন, তারা শুধু পাণ্ডবদের কাছেই নয়, তারা হয়তো নগরের সর্বত্রই ওই একই কথা বলে বেড়াচ্ছিল–কথয়াঞ্চক্রিয়ে রম্যং নগরং বারণাবত। কুরুবাড়ির অন্যান্যদের কাছেও বারণাবতের এই মহামহিম বৰ্ণনা পৌঁছেছে। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপরাও বারণাবতের এই বহু বহুশ্রুতি শুনে থাকবেন। ফলত ধৃতরাষ্ট্রের ইচ্ছাতে পাণ্ডবরা বারণাবতে বেড়াতে যাচ্ছেন–এই কথা তাদের মনে কোনও সন্দেহের উদ্রেক করল না। তারা সানন্দে যুধিষ্ঠিরকে আশীর্বাদ করে বললেন–তোমাদের মঙ্গল হোক বাছারা! পথে এবং অন্য কোথাও যেন তোমাদের কোনও অমঙ্গল না হয়–স্বস্ত্যস্তু বঃ পথি সদা ভূতেভ্যশ্চ সর্বশঃ।
পাণ্ডবরা আর দেরি করলেন না। বারণাবত থেকে ফিরে এসে আবার যাতে তারা রাজ্যলাভ করেন, সে জন্য শান্তি–স্বস্ত্যয়ন করে তারা মাকে নিয়ে বারণাবতের পথে যাত্রা করলেন।
দুর্যোধন আগেই বুঝে গিয়েছিলেন যে, এ যাত্রায় তার পরিকল্পনা সার্থক হবে। কারণ স্বয়ং ধৃতরাষ্ট্র যেহেতু এই পরিকল্পনার সমর্থক এবং তার কথা যেহেতু পাণ্ডবরা অমান্য করবেন না, অতএব তিনি আগে থাকতেই নিজের বুদ্ধিমতো ব্যবস্থা নিলেন। যে মুহূর্তে ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের বারণাবত যাত্রার কথা বলেছেন–ধৃতরাষ্ট্র-প্ৰযুক্তেযু পাণ্ডুপুত্রে ভারত–সেই মুহূর্তেই দুর্যোধন পুরোচন নামে এক বিশ্বস্ত মন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। বলা বাহুল্য দুর্যোধনের অন্তর্মূঢ় ভবিষ্যৎ–পরিকল্পনার কথা ধৃতরাষ্ট্র জানতেন না, পাণ্ডবদের জীবন নিয়ে দুর্যোধন যে খেলা খেলবেন তাও তিনি জানতেন না। তিনি পাণ্ডবদের নির্বাসনেই সন্তুষ্ট ছিলেন এবং ভেবেছিলেন–দুর্যোধন এর মধ্যে রাজা হয়ে গেলে পাণ্ডবরা ফিরে আসলেও আর কিছু করার থাকবে না। কিন্তু পাণ্ডবদের এই সুযোগে মেরে ফেলার কথাটা তিনি সত্যিই ভাবেননি।
পুরোচনকে মহাভারতের কবি সচিব পর্যায়ের ব্যক্তি বলে বর্ণনা করেছেন বলেই জোর দিয়ে বলতে পারি–পুরোচন কুরু-রাজসভার কোনও মন্ত্রী ছিলেন না। বাস্তবে তিনি কুরু রাজ্যের শাসন -কর্মে কোনও বিভাগীয় প্রধান ছিলেন বলে মনে হয় এবং তিনি দুর্যোধনের ব্যক্তিগত সচিবতাও করতেন। দুর্যোধন গোপনে তাকে ডেকে আনলেন নিজের কাছে। আমাদের ধারণা পাণ্ডবরা তখনও রাজ্য ছেড়ে যাননি, কিন্তু দুর্যোধনের পরিকল্পনা পাণ্ডবদের বারণাবতে পৌঁছনোর আগেই সার্থক করতে হবে বলে, পুরোচনকে ডেকে দুর্যোধন তার ডান হাতখানি ধরে অত্যন্ত সৌহার্দের সঙ্গে তাঁর কাছে নিজের প্রস্তাব পেশ করলেন–গৃহীত্বা দক্ষিণে পাণৌ সচিবং বাক্যমব্রবীৎ।
অধস্তনকে দিয়ে গর্হিত কাজ করানোর সময় উচ্চতর আধিকারিক এইভাবেই তার উচ্চাসন মঞ্চ থেকে নেমে আসেন। দুর্যোধন বললেন–পুরোচন-ভাই! তোমার থেকে বেশি বিশ্বাসী এবং পরম সহায় এমন আর কেউ নেই যার সঙ্গে বসে একটু নিজের মনের কথা বলতে পারি–সহায়ো যেন সন্ধায় মন্ত্রয়েয়ং যথা ত্বয়া। দেখো বন্ধু! যা তোমাকে বলতে যাচ্ছি, তার সবটুকুই গোপন রাখবে। বাইরে যেন ফাস না হয়ে যায়। আর এইভাবেই তুমি আমার ব্যক্তিগত শত্রুদের উচ্ছেদ করে দিতে পার।
অধস্তন ব্যক্তি, যার সঙ্গে এমন আদর করে কোনও রাজা-মহারাজা কথা বলেননি, সে এমন কথা শুনলে স্ফীত বোধ করবে এবং নিজের ক্ষমতার একশো ভাগ উজাড় করে দেবে। পুরোচন দুর্যোধনের প্রস্তাব শোনার জন্য উন্মুখ হতেই দুর্যোধন বললেন–মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের বারণাবতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তার আদেশে পাণ্ডবরা বারণাবতে মহাদেবের উৎসবে যোগ দেবে। তোমার কাজ হল–তুমি খুব তাড়াতাড়ি রথে করে বারণাবতে চলে যাবে। রথে খুব উত্তম অশ্ব যোজনা কোরো না, লোকের সন্দেহ হবে। বড় বড় অশ্বতরচালিত রথে করেই যাবে তুমি–স ত্বং রাসভযুক্তেন স্যন্দনেনাশুগামিনা। এবং সেটা আজকেই।
