প্রহ্লাদ ধাপে ধাপে উঠছেন। বিশ্বজননীর যুক্তি এবং নীতিবোধের কাছে তার প্রতিবেদন। প্রহ্লাদ দার্শনিকতার সঙ্গে পুত্রের অভিমান মিশিয়ে দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের সাধারণীকরণের যুক্তিতে কথা বলেছেন এতক্ষণ। এবার তিনি দেবতাদের অন্যায় এবং স্বার্থপরতাগুলি একে একে দৃষ্টান্তের মতো উপস্থিত করছেন বিশ্বেশ্বরী জগজ্জননীর সামনে। সত্যি কথা বলতে কি, এই অংশটুকুর জন্যই আমি এই পুরাণ কথার অবতারণা করেছি, কারণ সমুদ্রমন্থন নিয়ে অসুরদের মধ্যে, বিশেষত মহামতি প্রহ্লাদের মনেও কত বিরূপ সমালোচনা অবদমিত হয়ে ছিল, তা এই অংশে প্রকট হয়ে উঠবে।
প্রহ্লাদ দেবতা এবং অসুরদের বিষয়-লালসার সাজাত্য দেখিয়ে এবারে দেবতাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। বললেন, এই যে এত বড় সমুদ্র মন্থন হয়ে গেল, দেবতা-অসুর সমানভাবেই কত পরিশ্রম করল, কিন্তু তার ফল কী? অমৃত বন্টনের ছলে ভগবান বিষ্ণুই তো দেবতা আর অসুরদের মধ্যে ভেদ সৃষ্টি করলেন। আর বিষ্ণু! তিনি তো এই তিন ভুবন পালন-পোষণ করেন বলে জানি। তিনি নিজে কী করলেন? আপন লোভ চরিতার্থ করার জন্য তিনি নিজে স্বর্গসুন্দরী লক্ষ্মীকে আত্মসাৎ করলেন। তাও বুঝতাম–তিনি একটা বস্তু গ্রহণ করেছেন, ঠিক আছে। কিন্তু তার প্রত্যক্ষ মদত পেয়ে ইন্দ্র তো সবই হস্তগত করল–অশ্বরাজ উচ্চৈঃশ্রবা, গজরাজ ঐরাবত অথবা সুরভির মতো একটি কামধেনু সবই বিষ্ণুর ইচ্ছায় ইন্দ্রের ভাগে গেল–সুরৈঃ সর্বং গৃহীতং বৈষ্ণবেচ্ছয়া। এত বড় বড় সব অন্যায় করেও দেবতারা তবু সাধু বলে নাম কিনলেন-অনয়ং তাদৃশং কৃত্বা জাতা দেবাস্তু সাধবঃ। আর আমরা হলাম যত খারাপ।
প্রহ্লাদ এবার দেবতাদের সম্বন্ধে নিজের মত পরিষ্কার করে জানালেন। সমুদ্রমন্থনের সময় দেবতাদের নানান স্বার্থপরতা উল্লেখ করে প্রহ্লাদ বললেন, তুমি যাই ভাব–দেবতারাই যত অন্যায় অনীতির মূল, অন্তত ধর্মনীতির দিক দিয়ে দেখলে তাদের দুর্নীতি-পরায়ণ বলে স্বীকার করতেই হবে–অন্যায়িনঃ সুরা নং পশ্য ত্বং ধর্মলক্ষণ। নীতি-ধর্মের কথা যখন উঠলই, তখন বিষ্ণুর দিকেই তাকাও না। ভগবান বিষ্ণু দরকার পড়লেই দেবতাদের ঠিক নিজের নিজের জায়গায় বসিয়ে দেন, আর আমাদের তিনি দেন শুধু পরাজয়ের যন্ত্রণা। বিষ্ণুর দিক থেকে এটা কি অন্যায় নয়? অন্তত ধর্মনীতি তো তাই বলে যে, এটা অন্যায়।
প্রহ্লাদ ধর্মের প্রশ্ন তুলে পূর্ব মীমাংসা, যুক্তিবাদ, বেদ, ব্রাহ্মণ, ধর্ম মীমাংসা–সবই ছুঁয়ে গেলেন, তারপরেই অনবদ্য তার্কিক যুক্তি সাজিয়ে সমুদ্রমন্থনে দেবতাদের স্বার্থপরতার কথা শেষ করে তাদের কামবশতার কথাও তুললেন, কারণ কামনা-বাসনার ব্যাপারে লোকে শুধু এককভাবে অসুরদেরই দায়ী করে, দেবতাদের নয়।
প্রহ্লাদ তাই রীতিমতো হতাশার ভাব ফুটিয়ে বললেন, কোথায় ধর্ম, কেমন ধর্ম, সাধুতাই বা কোথায়–আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও। এই সংসারে স্পৃহাহীন বৈরাগী কে আছেন অথবা কোনওদিন সেই বৈরাগীকে আমরা দেখতে পাব কি–নিঃস্পৃহঃ কোপি সংসারে ন ভবেন্ন ভবিষ্যতি। এই যে চন্দ্র, দেবসমাজে তো তার যথেষ্ট বড় জায়গা। তিনি তার পূজনীয় আচার্য-পত্নীকে জেনে-শুনে জোর করে হরণ করে নিলেন। আর দেবরাজ ইন্দ্র? ধর্মের সিদ্ধান্ত কি তিনি জানেন না? তিনিও তো গৌতম-গুরুর প্রিয়া পত্নীকে ধর্ষণ করলেন। আবার যদি দেবগুরু বৃহস্পতির কথাই ধর, তিনি তার অনুজ-পত্নীকে গর্ভবতী অবস্থায় ধর্ষণ করলেন এবং গর্ভদ্রুত তার শিশু-পুত্রটিকে অভিশাপ দিয়ে অন্ধ করলেন।
প্রহ্লাদ যতগুলি ঘটনার উল্লেখ করলেন, এগুলি পুরাণ-কথায় প্রত্যেকটিই দেবতাদের মানসিক বিচ্যুতির ঘটনা। কিন্তু সব কথা বলে প্রহ্লাদ আবারও এলেন বিষ্ণুর কথায়। তিনি নিজে বিষ্ণুভক্ত, অতএব বিষ্ণুর দিক থেকে কোনও অন্যায় ঘটলে তার সবচেয়ে বেশি বুকে বাজে। সমুদ্র-মন্থনে অমৃত লাভ করার পর তিনি যে বঞ্চনা করেছেন এবং আপন পৌত্র বলি-রাজার সঙ্গেও যে অন্যায় করেছেন বিষ্ণু, তাতে তার ক্ষোভ আছে যথেষ্টই। প্রহ্লাদ বললেন–সমুদ্র মন্থনের পর আমাদের রাহু যে লুকিয়ে একটু অমৃত পান করেছিল, তাতে কী এমন অপরাধ ঘটেছিল? ভগবান বিষ্ণু এত বড় সত্ত্বগুণের আধার হয়ে তিনি কিনা রাহুল মাথাটাই কেটে নিলেন–অপরাধং বিনা কামং তদা সত্ত্ববম্বিকে?
সবার শেষে প্রহ্লাদের নিজের বাড়ির ঘটনা এল। প্রহ্লাদ একেবারে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। জগজ্জননী চণ্ডিকার কাছে নালিশ জানিয়ে বললেন, অমন যে আমার ধার্মিক নাতিটি, তার কী হল? ধার্মিক, সত্যনিষ্ঠ বলে জগতে যাঁদের সুনাম আছে, আমার নাতি বলিরাজ তাদের মধ্যে অন্যতম। তার দান-ধ্যানের সীমা নেই। শান্ত, বিনয়ী, বেদবিহিত যজ্ঞ-কর্মে তিনি সর্বদাই ব্যস্ত-যজ্বা দানপতিঃ শান্তঃ সত্ত্বজ্ঞঃ সর্বপূজক। এমন যে ধর্মপরায়ণ আমার নাতিটি, ভগবান শ্রীবিষ্ণু বামন রূপ ধারণ করে ছলনা করলেন। শুধু কি তাই? তার রাজ্য হরণ করে তাকে নিঃশেষ করে দিলেন একেবারে! অথচ দেখ মা, তবু মনীষী সজ্জনেরা দেবতাদেরই শুধু ধার্মিক বলে। আসলে কী জান, ধর্ম-টর্ম জগতে এখন কিছু নেই, এ জগতে যারা চাটুকার তারাই জেতে, ধর্ম এখন চুলোয় গেছে–জয়ন্তি চাটুবাদাশ্চ ধর্মবাদাঃ ক্ষয়ং গতাঃ।
