.
১১৩.
দুর্যোধন মুখে যা বলেছিলেন, কাজেও বেশ করে সেটা করলেন। সাধারণ প্রজারা, সে হস্তিনাপুরের প্রজাই হোক অথবা অবন্তী-কোশলের প্রজাই হোক, তারা সব সময়েই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অভাবগ্রস্তই হয়। দুর্যোধন সেই ব্যাপারটা বুঝে প্রজাদের প্রচুর অর্থ আর সম্মান দিয়ে হাতের মুঠোয় এনে ফেললেন তাদের। এ ব্যাপারে দুর্যোধন একা নন, তাঁর। অন্যান্য ভাইরাও প্রজাদের টাকা-পয়সা খাইয়ে তাদের দুর্যোধনের অনুকূলে নিয়ে এলেন। দুর্যোধন যে সব মন্ত্রীদের কথা বলেছিলেন, তাঁরাও দুর্যোধনের দানে-মানে বশীভূত হয়ে তার হয়ে কাজ করতে লাগলেন–অর্থৰ্মানপ্রদানাভ্যাং সঞ্জহার সহানুজঃ। এইসব মন্ত্রীদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন যারা খুব ভাল কথা বলতে পারতেন। বিষয়-বর্ণনার ক্ষেত্রেও তারা খুব নিপুণ। এবারে এইরকম কয়েকজন অনুকূল মন্ত্রীকে ধৃতরাষ্ট্র ডেকে পাঠালেন নিজের কাছে। তাদের তিনি নির্দেশ দিলেন যাতে তারা বারণাবত নামে জায়গাটির একটা কাব্যিক বর্ণনা দেন পাণ্ডবদের কাছে। বর্ণনার ভাব এবং ভাষা হবে এমন, যাতে পাণ্ডবভাইরা বারণাবতে যাবার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠবেন।
মন্ত্রীরা ধৃতরাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে পাণ্ডব-ভাইদের কাছে গিয়ে বলল–এমন সুন্দর জায়গা সচরাচর দেখা যায় না। তাছাড়া জায়গাটাও খুব অভিজাত রুচিসম্পন্ন। এখানকার মানুষজনও খুব ভাল–সর্বরত্ন-সমাকীর্ণ পুংসাং দেশে মনোরমে। আর জান তো–বারণাবত এখন উৎসবের জন্য তৈরি হচ্ছে। এখানে মহাদেবের পূজা উৎসব উপলক্ষে কত যে মানুষ চারদিক থেকে এসে উপস্থিত হয়েছে, তার শেষ নেই–অয়ং সমাজঃ সুমহান্ রমণীয়তমা ভূবি। এক-দুজন নয়, অনেক মন্ত্রীই তাদের সাধ্যমতো বারণাবতের গুণ আখ্যাপন করল পাণ্ডব-ভাইদের সামনে। পাণ্ডবদের যথেষ্ট কৌতূহল হল–জাতকৌতূহলা ইতি। মনে মনে তারা ভাবতে আরম্ভ করলেন–গেলেই হয়। এত সুন্দর জায়গা! একবার ঘুরে আসলেই হয়।
ঠিক এইরকম একটা উন্মুখ অবস্থা দেখে ধৃতরাষ্ট্র এবার পাণ্ডবদের ডেকে পাঠালেন নিজের ঘরে। কূটবুদ্ধি কণিকের কাছে ধৃতরাষ্ট্র যে উপদেশ পেয়েছিলেন, তার প্রয়োগ বোধহয় এখনই আরম্ভ হয়ে গেল। মুখে মিষ্টি হাসি আর অভ্যর্থনার সুর বজায় রেখে অন্তরের সমস্ত ক্রুরতা নিয়ে তিনি বললেন–এই দেখ না বাছারা! প্রতিদিনই কতগুলো লোক এসে আমাকে বারংবার বলছে–বারণাবতের মতো এমন সুন্দর জায়গা নাকি আর হয় না–রমণীয়তমং লোকে নজরং বারণাবতম। এই লোকগুলোকে বোঝাতে পারি না যে, এসব কথা শুনলে আমার দুঃখই হয়। আরে আমি অন্ধ মানুষ, বুড়ো হয়েছি, তো বারণাবতের সৌন্দর্য–কাহিনী শুনে আমি কী করব! সে যাই হোক বাছারা–তোমরা যদি ইচ্ছে করো–তে তাতা যদি মন্যধ্ব–তবে তোমরা কিন্তু সবাই মিলে একবার দেখে আসতে পার জায়গাটা। সেখানে আবার এখন মহাদেবের উৎসব পালিত হবে। সেটাও একটা বাড়তি পাওনা। তবে হ্যাঁ, তোমরা যদি যাও, তবে কিন্তু। টাকা-পয়সার জন্য কোনও চিন্তা করো না। যাদের যাদের পছন্দ, তাদের সবাইকে নিয়ে যাবে–সগণাঃ সানুযাত্রাশ্চ বিহরধ্বং যথামরাঃ–সেখানে থাকবে একেবারে দেবতাদের মতো মর্যাদা নিয়ে। টাকা-পয়সা নিয়ে যাও, বামুনদের দান–ধ্যান কর। ভাল ভাল গান শোনো খুশি লাগলে তাদেরও টাকা দাও, বকশিস্ দাও–ব্রাহ্মণেভ্যেশ্চ রত্নানি গায়নেভ্যশ্চ সর্বশঃ। বেশ কিছুদিন সেখানে থেকে জায়গাকে ভাল করে অনুভব করো, আনন্দ করো, তারপর সুখী মনে আবার ফিরে এসো হস্তিনাপুরে–ইদং বৈ হস্তিনপুরং সুখিনঃ পুনরেষ্যথ।
অন্যান্য মানুষেরা যখন বারণাবতের প্রশংসা করছিলেন, তখন যুধিষ্ঠির সেটাকে সহজ-সরলভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র যখন একইভাবে বারণাবতের প্রশংসা করে সেখানে গিয়ে থাকতে বললেন, তখন যুধিষ্ঠির খুব সহজভাবে নিলেন না কথাটা। তিনি বেশ বুঝলেন–এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে একটা চক্রান্ত আছে। বস্তুত বারণাবতে যাবার খুব ইচ্ছে হলে তারা নিজেরাই ধৃতরাষ্ট্রের কাছে অনুমতি চাইতেন। কিন্তু হস্তিনাপুরের মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যখন আগ বাড়িয়ে তাদের বারণাবতে যেতে বলছেন, সেখানে ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। বিশেষত রাজারা আদেশ করেন মিষ্টি অনুরোধ করে। তোমরা যদি ইচ্ছে করো অথবা জায়গাটা ভাল–এ সবই কথার কথা। কিছুদিন তোমরা ঘুরে এসো–কঞ্চিৎ কালং বিহৃত্যৈবমনুভূয় পরাং সুখ–তাতে সুখ কী ঘটবে জানা নেই, তবে এখানে ঘুরে আসতে পার মানে যেতে হবে।
যুধিষ্ঠিরকে আমাদের কালের লোকেরা বোকাসোকা সরল মানুষ ভাবেন। তিনি সত্যিই সেইরকমই, কিন্তু তার কোনও বুদ্ধি নেই, কিংবা রাজনৈতিক সূক্ষ্মতার কোনও বোধ নেই তাঁর–এটা ভাবাই মূর্খতা। পাণ্ডব-ভাইরা অন্য কেউ ধৃতরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য না বুঝলেও এমনকি ধৃতরাষ্ট্রের গভীর মনের কথাটা যুধিষ্ঠিরও না বুঝলেও তিনি এটা বুঝলেন যে, ধৃতরাষ্ট্রই চান যে, তারা বারণাবতে ঘুরে আসুন–ধৃতরাষ্ট্রস্য তং কামমনুবুধ্য যুধিষ্ঠিরঃ। অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রের মুখে একই কথা শুনে নিজেকে একটু অসহায়ও মনে করলেন যুধিষ্ঠির। সামনাসামনি তিনিও ধৃতরাষ্ট্রের মতোই শুষ্ক হাসি হেসে বললেন–নিশ্চয়ই। আপনি যখন বলছেন নিশ্চয়ই আমরা বারণাবতে যাব। কিন্তু মনে মনে যুধিষ্ঠির অসহায়ের মতো ভাবতে লাগলেন–কী করা যায়–আত্মনশ্চাসহায়ত্বং তথেতি প্রত্যুবাচ তম্।
