কথাটা ধৃতরাষ্ট্রের মনে ধরল শুধু নয়। জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজা না হওয়ার যে কমপ্লেক্স তার অন্তর জুড়ে আছে, সেই কমপ্লেক্স যেন শান্ত হল এই পরিকল্পনায়। সত্যিই তো, কপালগুণে পাণ্ডু রাজা হয়েছিলেন বলেই তো তাকে বংশপরম্পরায় পরপিণ্ডোপজীবী হয়ে থাকতে হচ্ছে। তা এবার দুর্যোধনের রাজত্বে পাণ্ডবরা তার ছেলেদের মতোই থাকুক না কেন। তাঁদরে তো আর মারা-ধরা কিছু করা হচ্ছে না। ধৃতরাষ্ট্রের বেশ লাগল। বেশ লাগল এই মধুর পরিকল্পনাটি। ভাবলেন–ছেলের আমার বেশ বুদ্ধি হয়েছে। ধৃতরাষ্ট্রের প্রজ্ঞাচক্ষু পুত্রের স্বার্থান্বেষিতায় এই প্রথম ভালভাবে অন্ধ হয়ে গেল। তিনি বললেন– তুমি যেমনটা বললে, আমার মনেও ঠিক তেমনটিই ছিল–দুর্যোধন! মোপ্যেত হৃদি সম্পরিবর্ততে। কিন্তু পাণ্ডবদের তাড়ানোর এই ভাবনাটার মধ্যে কিছু পাপবুদ্ধি আছে বলেই আমি প্রকাশ করে বলিনি।
দুর্যোধনের সঙ্গে সহমত হয়ে যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই ধৃতরাষ্ট্র তার আরও একটি দুর্ভাবনার কথা জানালেন। ধৃতরাষ্ট্র রাজার ভূমিকায় তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বটে, কিন্তু পাণ্ডুর মৃত্যুর পর হস্তিনাপুরের রাজপরিবারের কুলজ্যেষ্ঠরা রাজ্যশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মত প্রকাশ করতেন। এমনকি দ্রোণাচার্য-কৃপাচার্যরা বহিরাগত হলেও বহুকাল এই রাজপরিবারের সঙ্গে থেকে থেকে নিজেদের এমন ভূমিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে, তারাও হস্তিনাপুরের রাজনীতির অংশীভূত হয়ে গিয়েছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের সামান্য দুর্ভাবনা যেটুকু আছে। তা এঁদের নিয়েই।
ধৃতরাষ্ট্র বললেন–আমরা পিতা-পুত্রে পাণ্ডবদের নির্বাসন দেবার ব্যাপারে একমত হলাম বটে, কিন্তু ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর, কৃপ–এঁরা মোটেই পাণ্ডবদের নির্বাসন ব্যাপারটা মেনে নেবেন না। ভীষ্ম তথা কুরুবংশের অন্যান্য কুজ্যেষ্ঠরা পাণ্ডব এবং কৌরবদের এক চোখেই দেখেন। কাজেই তারা পাণ্ডবদের এই দুর্গতি সহ্য করবেন না; কৌরব-পাণ্ডবদের মধ্যে একতমের প্রতি এই বিষম আচরণ তাঁরা মোটেই অনুমোদন করবেন না–নৈতে বিষমমিচ্ছেয়ু-ধর্মযুক্তা মনস্বিনঃ। তো আমাদের এই কাজে কৌরবকুলের জ্যেষ্ঠ পুরুষেরা যদি আমাদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, তবে আমাদের বধ করার কথাও তারা ভাবতে পারেন।
অন্ধ বলেই হোক অথবা খানিকটা ভীতু প্রকৃতির মানুষ বলেই হোক ধৃতরাষ্ট্র তার মনের দুর্ভাবনা প্রকাশ করে ফেললেন। দুর্যোধন বললেন–অত ভাবনার কিছু নেই, পিতা! ভীষ্ম দাঁড়িয়ে আছেন পাণ্ডব-কৌরবদের মাঝখানে। তিনি এ পক্ষেও যাবেন না, ও পক্ষেও যাবেন না–মধ্যস্থঃ সততং ভীষ্মঃ। কিন্তু এটা মাথায় রাখো–অশ্বত্থামা তো আছেন আমাদের সঙ্গে। দ্রোণ নন, বিদুর নন, কৃপ নন। অশ্বত্থামা। এমন অপ্রাসঙ্গিক কথা কেন আসল তা ভাববার আগেই দুর্যোধন বললেন–অশ্বত্থামা যেখানে আছেন, দ্রোণ তাঁরই পক্ষে থাকবেন। আর ভগিনীপতি আর ভাগনে যে দলে আছেন কৃপাচার্যও থাকবেন সেই দলে–কৃপঃ শারদ্বতশ্চৈব যত এতৌ ততো ভবেৎ। সোজা হিসেব। আর বাকি রইলেন বিদুর। দুর্যোধন বললেন–আমি জানি–তিনি আমাদেরই অন্নে প্রতিপালিত, তবু গোপনে তিনি আমাদের শত্রু পাণ্ডবদের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখেন–ক্ষার্থবদ্ধস্মাকং প্রচ্ছন্নং সঙ্গতঃ পরৈঃ। কিন্তু যতই তিনি পাণ্ডবদের সঙ্গে জোট বেঁধে চলুন না কেন, মনে রাখবেন–তিনি একা। পাণ্ডবদের ওপর সদয় হয়ে আমাদের ওপর কোনও নির্যাতন চালানো অন্তত একাকী বিদুরের পক্ষে সম্ভব হবে না–ন চৈকঃ স সমর্থোস্মন্ পাণ্ডবার্থে প্রবাধিতুম।
দুর্যোধন এবার সযৌক্তিকভাবে শেষ প্রস্তাব করলেন–অতএব পিতা! কুরু-কুলীনদের নিয়ে দুর্ভাবনার আর কোনও কারণ নেই। কেউ কিছু করতে পারবেন না। তুমি নিশ্চিন্ত মনে একেবারে তাদের মায়ের সঙ্গে পাণ্ডবদের নির্বাসনে পাঠাও বারণাবতে এবং সেটা যাতে আজই হয় সেই চেষ্টা করো–সুবিশ্রদ্ধঃ পাণ্ডুপুত্রা সহ মাত্রা প্রবাসয়। আমি জানি–পাণ্ডবদের কারণে তোমার রাত্রে ঘুম আসে না। তোমার নিজের ছেলেরা এইভাবে রাজ্যহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর পাণ্ডুর ছেলেরা রাজ্যভোগ করছে। যুধিষ্ঠির যুবরাজ হয়েছে–আমি জানি এ সব ঘটনা তোমার বুকে কাটার মতো বেঁধে–-বিনিদ্রকরণং ঘোরং হৃদি শল্যমিবার্পিতম্। অতএব কুন্তীর সঙ্গে পাণ্ডবদের বারণাবতে পাঠিয়ে মনের সকল জ্বালা দূর করো তুমি।
সেই তখন থেকে শুনছি–শুধু পাণ্ডবদের নয়, কুন্তীর সঙ্গে তাদের বারণাবতে পাঠান। দুর্যোধন হঠাৎ কুন্তীকে ধরলেন কেন? তিনি তো রাজনীতির কোনও সাতে-পাঁচে নেই। তিনি পাণ্ডবজননী–এই তো তার পরিচয়। আর দুর্যোধনের রাজপদে তিনি আর কোনও বাধা সৃষ্টি করছেন না। তবুও তিনি কেন কুন্তীকে পাঠানোর জন্য প্রস্তাব করছেন, তার একটা যুক্তি অবশ্যই আছে। দুর্যোধন এই মনস্বিনী রমণীর অত্যদ্ভুত ক্ষমতা লক্ষ্য করেছেন। পাণ্ডু এবং মাদ্রীর মৃত্যুর পরে সেই শতশৃঙ্গ পর্বত থেকে তিনি তার ছোট ছোট ছেলেপিলেকে হস্তিনাপুরের রাজবাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন কতগুলি আরণ্যক মুনি-মাত্র সহায়ে। আসার পরে তাকে বেশি কথাও খরচা করতে হয়নি। মুনি–ঋযিদের ওকালতি এবং নিজের ব্যক্তিত্বে তিনি তার শ্বশুরবাড়িতে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। তাঁর পুত্রগুলি মহারাজ পাণ্ডুর ঔরসজন্মা না হলেও কুন্তী তাদের পাণ্ডব হিসেবে প্রতিষ্ঠাও করতে পেরেছেন। এবং এতদিনে বিদুরের মতো এক মহাপ্রাজ্ঞ ব্যক্তিকে তিনি ব্যক্তিগত সহায় হিসেবে পেয়েছেন। কিন্তু এই মনস্বিতা বা ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে দুর্যোধনের ভয় নেই। তাঁর ভয়–যে কুন্তী পাণ্ডুর বীর্য গর্ভে ধারণ না করেও পাণ্ডব-জননী বলে খ্যাত, তিনি সব পারেন। পাণ্ডুপুত্রদের বারণাবতে ধ্বংস করে ফেললেও এই কুন্তী যদি আবারও তাঁর অলৌকিক মন্ত্রের সাধনে পুত্রোৎপত্তি ঘটিয়ে বলেন–এই পুত্রও পাণ্ডব, এই পাণ্ডুর উত্তরাধিকারী–দুর্যোধন হয়তো সেই ভয়েই পাণ্ডবদের সঙ্গে কুন্তীকেও শেষ করতে চান।
