ধৃতরাষ্ট্র যে জন্মান্ধতার জন্য রাজা হতে পারেননি এবং এজন্য যে তার মনে গভীর দুঃখ আছে–এ কথা পাণ্ডু জানতেন বলেই তাকে এমন রাজসম্মান দিতেন যে, ধৃতরাষ্ট্রের পক্ষে তা ভোলা সম্ভব হয়নি। অপিচ যুধিষ্ঠির যুবরাজ হয়ে ধৃতরাষ্ট্রের সম্মান যতখানি রেখে চলেন, তাতে ধৃতরাষ্ট্র ভাবতেও পারেন না যে, তাকে ঠান্ডা মাথায় রাজ্য থেকে নির্বাসন দেওয়া যেতে পারে। তিনি বললেন–পাণ্ডু যেমন ছিলেন, যুধিষ্ঠিরও তেমনি ধর্মপরায়ণ, তেমনি গুণবান। পৌর-জনপদবাসীরাও তাকে খুব ভালবাসে। এই অবস্থায় তাকে জোর করে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নাকি–স কথং শক্যতে স্মাভিরপার্তুং বলাদিতঃ।
মনে রাখা দরকার, ধৃতরাষ্ট্র পুত্রস্নেহে অন্ধ হলেও মহাভারতের কবি তাকে হাজার-একবার প্রজ্ঞাচক্ষু বলে বর্ণনা করেছেন। রাজনীতি বিষয়ক পড়াশুনো থেকে আরম্ভ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে এই প্রজ্ঞাচক্ষু দান করেছিল। সময়কালে ঠিক জিনিসটা তিনি ঠিকভাবেই বোঝেন কিন্তু মানুষের অন্তর্গঢ় যে জটিলতা যাকে আধুনিক ভাষায় কমপ্লেক্স বলা যায়, সেই কমপ্লেক্সের সঙ্গে স্বার্থে আচ্ছন্ন স্নেহাতুরতা জুড়ে যাওয়ায় ধৃতরাষ্ট্র প্রজ্ঞাচক্ষু হারিয়ে জন্মান্ধ হয়ে পড়েন। এখানেও তাই হবে। ধৃতরাষ্ট্র আপন প্রজ্ঞাচক্ষুতে যা দেখেছেন, তা আবারও বললেন দুর্যোধনকে। বললেন–মনে রেখ দুর্যোধন! যুধিষ্ঠির এখন একা নন। তিনি শুধু পিতৃ-পিতামহক্রমে রাজ্যই পাননি, তার সঙ্গে পেয়েছেন পিতৃ-পিতামহের পরম্পরায় নেমে আসা কতগুলি মন্ত্রী এবং এক বিশাল সৈন্যবাহিনী। এই মন্ত্রীবর্গ এবং সৈন্য-সামন্তদের মহারাজ পাণ্ডু যেহেতু দানে-মানে সন্তুষ্ট রেখেছিলেন, অতএব তারাও বংশ-পরম্পরায় যুধিষ্ঠিরের সহায় হবেন। পৌর-জনপদবাসীরাও কম কিছু আপ্যায়মপাননি পাণ্ডুর কাছে। অতএব সেই সব মন্ত্রী অমাত্য-সৈন্যরা, সেই সব পূর্ব-পুরস্কৃত বেহ্মরবাসী জনতারা কেন তাদের অভিমত যুবরাজের বিদায়-যাত্রা মেনে নেবে? তারা বরং এই অন্যায় সইতে না পেরে আমাদের সপরিবারে হত্যা করবে না, তাই বা কী করে জানছ–কথং যুধিষ্ঠিরস্যার্থে ন নো হনঃ সবান্ধবান্।
দুর্যোধন ধীরতার রাজনীতি করেন না, তার এমন কোনও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ নেই, যে রাজনীতি তার প্রযোক্তাকে স্ববিষয়ে টিকিয়ে রেখে তাকে স্থায়ী আসন দেয়। দুর্যোধনের রাজনীতি হল–এই এক্ষুনি চাই রাজনীতি। তিনি যেন-তেন উপায়ে আপাতরম্য বিষয়কে আঁকড়ে ধরেন। হয়তো সেই জন্যই তিনি ধৃতরাষ্ট্রের প্রজ্ঞাগর্ভ উপদেশ অথবা করণীয় বিষয়ের রাজনৈতিক ব্যাপ্তি গ্রাহ্যের মধ্যেই আনলেন না। তিনি বললেন–এসব কথা কি আমি আগে থাকতে ভাবিনি ভেবেছো? সব ভেবেই আমি যুধিষ্ঠির-সহায় পৌর-জনপদবাসীদের আগে থাকতেই টাকা-পয়সা খাইয়ে তুষ্ট রেখেছি–দৃষ্ট্ৰা প্রকৃতয়ঃ সর্বা অর্থমানেন পূজিতাঃ। প্রজারা তাই এখন আমারই সহায়তা করবে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।
যুধিষ্ঠির যুবরাজ হয়েছেন বটে, তবে রাজ্যর শাসন-সংক্রান্ত সব বিষয় তিনি নিজের হাতে রাখেননি। রাজকোষ এবং মন্ত্রীবর্গের ভরণ-পোষণের জন্য যা বিলি-ব্যবস্থা করতে হবে–এই সম্পূর্ণ বিষয়টা তিনি দুর্যোধনের হাতে ছেড়ে রেখেছিলেন। হয়তো এই ব্যবস্থাই ধৃতরাষ্ট্রের সম্মত ছিল। যুবরাজ না হতে পেরে যাতে ক্ষোভ না জন্মায় সেই জন্যই অর্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুর্যোধনের হাতেই ন্যস্ত ছিল। ভাবুন একবার–ভীম-অর্জুন বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ-যাত্রা করে যে বিশাল অর্থ এনে ফেলেছিলেন হস্তিনাপুরের রাজকোষে, সেই অর্থের অধিকার যুধিষ্ঠির নিজের হাতে রাখেননি। হয়তো অর্থের প্রকৃতিগত মালিন্য এবং অর্থের দানাদান সংক্রান্ত স্বাভাবিক দূষণের গ্রাস থেকে বাঁচতে চেয়েই যুধিষ্ঠির নিজে এই অর্থের ভার নেননি। কিন্তু দুর্যোধন যে এই অর্থ-সম্পত্তি তাঁদেরই বিরুদ্ধে কাজে লাগাবেন, এটা যুধিষ্ঠিরের সর্বহিতৈষিণী রাজনৈতিক বুদ্ধিতে কুলোয় না।
কিন্তু দুর্যোধন এই ব্যাপারে নিজের কাজটি ঠিক গুছিয়ে নিচ্ছেন। তিনি বলেছেন–তুমি ভেবো না, বাবা! মন্ত্রীবর্গ এবং অর্থভাণ্ডার এখন আমার অধীনে–অর্থবর্গঃ সহামাতো মৎসংস্থা দ্য মহীপতে। অতএব মন্ত্রীদের সহায়তা অথবা প্রকৃতি-সংক্ষোভের বিষয়ে তুমি কোনও চিন্তা করবে না। তুমি শুধু মিষ্টি করে মৃদুনৈব অভপায়েন–কোমলভাবে পাণ্ডবদের বারণাবতে নির্বাসিত করো–স ভবা পাণ্ডবানাশু বিবাসয়িতুমহসি। তার পরের সমস্ত ভাবনা আমার ওপর ছেড়ে দিন।
বস্তুত দুর্যোধন পরে কী করবেন, তার আভাসও বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে দিলেন না। বরঞ্চ আপাতত এমনভাবেই তিনি ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পাণ্ডবদের ভবিষ্যৎ নিরূপণ করেছেন, যাতে স্নেহাতুর পিতার পুত্রস্বার্থ পুরোমাত্রায় বজায় থাকবে অন্যদিকে পাণ্ডবদেরও বধ-বন্ধনাদির মতো কঠিন বিপদ কিছু ঘটছে না। শুধুই যেন এক নির্বাসন। দুর্যোধন বলেছেন–দ্যাখো, আমি যখন হস্তিনাপুরে পুরোদস্তুর রাজা হয়ে যাব, তখন পাণ্ডবরা আবার তাদের মায়ের সঙ্গে হস্তিনাপুরে ফিরে আসুন, তাতে কোনও ক্ষতি নেই–তদা কুন্তী সহাপত্যা পুনরেষ্যতি ভারত।
এমনভাবেই ধৃতরাষ্ট্রের কাছে এই উপস্থাপনা হল যাতে মনে হবে যেন দুর্যোধন জ্ঞাতি-ভাইদের রাজনৈতিক স্থিতিটা শুধু উলটে দিতে চাইছেন। একটু আগেই তিনি দুঃখ করে বলেছেন–এই প্রখ্যাত রাজবংশে জন্মেও, জ্যেষ্ঠ রাজাধিকারীর পুত্র হয়েও আমরা বংশ-বংশ ধরে পাণ্ডবদের ভাত খেয়ে যাব চিরকাল। দুর্যোধন যেন বলতে চাইলেন–রাজা থাকব আমি, আর পাণ্ডবরা আমার দেওয়া অন্ন খেয়ে বাঁচুক। আমার দুঃখটা কী সেটা তারা বুঝুক।
