যুধিষ্ঠিরের জন্য মাঠে-ময়দানে জনপদবাসীদের মধ্যে এই যে আবেগ-তুষ্ট কথাবার্তা চলছিল, তা দুর্যোধন শুনতে পেলেন বিনা কষ্টে। যুধিষ্ঠিরের এত প্রশংসা শুনে তার মন মাৎসর্য এবং ঈর্ষায় জ্বলে উঠল–যুধিষ্ঠিরানুরক্তানাং পতপত দুর্মতিঃ। সাধারণ লোকের সরল কথাবার্তাগুলি তিনি মোটেই সহ্য করতে পারলেন না। ক্ষোভে, দুঃখে, ঈর্ষায় তিনি উপস্থিত হলেন পিতা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে।
ধৃতরাষ্ট্র সেদিন একা-একাই বসেছিলেন। কিছুক্ষণ আগে কূটবুদ্ধি কণিক তাকে কঠিন মন্ত্রণা দিয়ে গেছেন। ধৃতরাষ্ট্র একা-একা বসে সেই সব কথাই ভাবছিলেন। এরই মধ্যে দুর্যোধন তার কাছে এসে উপস্থিত হলেন পাহাড়-প্রমাণ অভিমান নিয়ে। বললেন–বাবা! রাস্তাঘাটে সর্বত্র মানুষেরা কী বলছে জান? এই যে তুমি! ছোট-ভাইয়ের উচ্ছিষ্ট সিংহাসনে বসে আছ তোমাকে এবং পিতামহ ভীষ্মকে তারা গ্রাহ্য করে না। তারা পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে রাজা করতে চায় কামনাদৃত্য ভীষ্মঞ্চ পতিমিচ্ছন্তি পাণ্ডব। ওরা যে সব কথা বলছে আমি নিজের কানে শুনে এসেছি। ওরা বলছে–ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা আছে, তাঁর রাজ্য লাভ করার প্রশ্নই আসে না। আর পাণ্ডু নিজের গুণেই পৈতৃক রাজ্য পেয়েছেন, আর তুমি তো জন্মান্ধ! তুমি বড় ভাই বলে রাজ্য পেয়েও শুধু অন্ধ বলে রাজ্য পেলে না–ত্বমন্ধগুণসংযোগাৎ প্রাপ্তং রাজ্যং ন প্রাপ্তবান্। তাহলে রাজ্য পাবে কে? রাজ্য পাবে যুধিষ্ঠির।
দুর্যোধন পিতার মনের সেই দুর্বল জায়গাটিতে আঘাত করলেন, যেখানে তার ক্ষত আছে। দুর্যোধন জানেন–ধৃতরাষ্ট্র সব সহ্য করতে পারেন, কিন্তু বড় ভাই হওয়া সত্ত্বেও তিনি যে শুধু অন্ধত্বের মতো এক উপসৃষ্ট দুর্দৈবের জন্য রাজত্ব পাননি–এই ক্ষোভ সদা-সর্বদা তার অন্তর জুড়ে আছে। জনপদবাসীদের চির-পুরাতন বক্তব্য জানিয়ে দুর্যোধন যেমন একদিকে ধৃতরাষ্ট্রের ক্ষতে ক্ষার নিক্ষেপ করলেন, তেমনি নিজের জন্যও মায়া তৈরি করে দিলেন ধৃতরাষ্ট্রের অন্তরে। ধৃতরাষ্ট্রের মন তৈরি হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই দুর্যোধন বললেন–যদি পাণ্ডুর ছেলেই উত্তরাধিকারসূত্রে পিতার রাজ্য পায়, তবে নিশ্চয় তার পুত্রই আবার রাজ্য পাবে। আবার তারও পুত্র পিতার রাজ্য পাবে, তারও পুত্র আবার–তস্য পুত্রো ধ্রুবং প্রাপ্তস্তস্য তস্যাপি চাপরঃ। এই যদি চলতে থাকে তবে আমরা কী দোষটা করলাম? রাজার বংশে জন্মেও পুত্র-পৌত্রাদিক্রমে আমরা চিরকাল রাজ্যহারা হয়ে থাকব–তে বয়ং রাজবংশেন হীনা সহ সুতৈরপি।
ধৃতরাষ্ট্র নিজে রাজ্য পাননি এবং কোনওদিন তার পুত্র-পৌত্রেরাও রাজ্য পাবে না–সম্পূর্ণ একটা বংশের প্রতি এই বঞ্চনা তাকে অধীর করে তুলছে। দুর্যোধন আরও বললেন–লোকেরা চিরকাল আমাদের করুণা করবে, বাবা! শুধু রাজবংশে জন্মেছি বলে, শুধু আমাদের ফেলে দেওয়া যায় না বলে চিরকাল আমরা এই জ্ঞাতিগুষ্টির দেওয়া করুণার ভাত খেয়ে বেঁচে থাকব। এ দুঃখ যে নরক-ভোগ করার দুঃখ, বাবা–সততং নিরয়ং প্রাপ্তাঃ পরপিণ্ডোপজীবিনঃ! আপনি সত্যিই কি কোনও ব্যবস্থা করবেন না, যাতে এমন কষ্ট আমাদের না হয়। আমার শুধু একটাই কথা, বাবা–দুর্যোধন যুক্তি দিয়ে বললেন–বাবা! তুমি যদি আগেই রাজ্য পেতে–যদি ত্বং হি পুরা রাজন্ ইদং রাজ্যমবাপ্তবান্–তাহলে শুধু পিতার রাজ্য বলেই আমরা আজ সেই রাজ্য ভোগ করতাম। এমনকি পৌর-জনপদবাসীরা যদি আমাদের একটুও পছন্দ না করত, তবু আমরা রাজ্য পেতাম, কেন না সে রাজ্য হত আমাদের পিতৃ-পিতামহক্রমে আসা যুক্তিযুক্ত উত্তরাধিকার–ধ্রুবং প্রান্স্যাম চ বয়ং রাজ্যমপ্যবশে জনে।
দুর্যোধন এমন করুণভাবেই ধৃতরাষ্ট্রকে বোঝাতে পেরেছেন যে, পুত্রদের প্রতি এই বঞ্চনার জন্য ধৃতরাষ্ট্র নিজেকেই এখন দায়ী ভাবছেন। পুত্রের প্রতি মায়ায় তিনি এখন কণিকের পরামর্শ ঠিক বলে ভাবতে লাগলেন। ওদিকে নিজেরই ভ্রাতুস্পুত্রদের প্রতি তিনি কেমন করে অকরুণ হবেন এই দুশ্চিন্তায় তার মনে যেমন কষ্টও হল, তেমনি তার মনে জেগে উঠল দ্বৈধভাব–ধৃতরাষ্ট্রে দ্বিধাচিত্তঃ শোকার্তঃ সমপদ্যত। কাকে রাখবেন তিনি–দুর্যোধনকে না যুধিষ্ঠিরকে।
ওদিকে দুর্যোধন-শকুনি, কর্ণ-দুঃশাসনের কূট আলোচনা চলছেই–কীভাবে পাণ্ডবদের রাজ্যহীন, হতশ্রী করে দেওয়া যায়। তারা আজ ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভার একান্তে দাঁড়িয়েই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। দুর্যোধন তারপর ধৃতরাষ্ট্রের কাছে গিয়ে বললেন–তুমি একটা সুন্দর উপায় বার করো, বাবা! যাতে আমাদের পাণ্ডবদের দিক থেকে কোনও ভয় না থাকে। তুমি উপায় বার করে, এঁদের বারণাবত নগরে নির্বাসন দাও।
ধৃতরাষ্ট্রের মনে সেই দ্বৈধভাব আরও প্রবল হল। দুর্যোধনের ভাব পরীক্ষা করার জন্য সামান্যভাবে পাণ্ডবদের সম্বন্ধে বললেন–দেখ বাছা! আমার ছোট-ভাই পাণ্ডু সব সময় নীতি-নিয়ম, ধর্ম মেনে চলতেন। আবার আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতি-গুষ্টির ওপর তার সঠিক নজর ছিল সব সময়। তাদের যোগ্য মান-সম্মান দেওয়ার কথাটাও তিনি কখনও ভুলতেন না। বিশেষত আমার কথা যদি বল, তবে আমাকে যে তিনি কী চোখে দেখতেন তা ভাবা যায় না। নিজের খাওয়া-নাওয়া ভুলে যখন যে সমস্যা হয়েছে, সব কিছু তিনি আমাকে জানাতেন আগে। নিজে রাজা হলেও সম্পূর্ণ রাজ্যটাকেই তিনি আমার কাছেই নিবেদন করে রেখেছিলেন–নিবেদয়তি নিত্যং হি মম রাজ্যং ধৃতব্রতঃ।
