একটা কথা এই মুহূর্তে না ভেবে পারা যাচ্ছে না। আমরা শকুনির কথা বলছি। শকুনি ধৃতরাষ্ট্রের শ্যালক, গান্ধারীর ভাই। এই মানুষটিকে আমরা প্রথম যখন দেখেছিলাম, তখন ইনি যুবক ছিলেন। চোখে পট্টবস্ত্র-বাঁধা গান্ধারীকে নিয়ে তিনি হস্তিনাপুরের রাজধানীতে এসেছিলেন কন্যাকর্তা হিসেবে। গান্ধারীর সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রের বিয়ে হবার পর ভীষ্মের দেওয়া দান-মান গ্রহণ করে ফিরে গিয়েছিলেন গান্ধারে। এর মধ্যে এত যে ঘটনা ঘটে গেল, মহাভারতের কবি একবারের তরেও নাম করেননি শকুনির। কবে যে তিনি কুরুবাড়িতে ফিরে এলেন আর কেনই বা এলেন–সে কথা মহাভারতের কবি একবারও বলেননি। সেই গান্ধারে ফিরে যাবার পর এই তাকে আবার দেখলাম দুষ্ট-চতুষ্টয়ের চক্রান্তে চক্রবর্তীর মতো।
তিনি কবে হস্তিনাপুরে ফিরে এসেছেন, সে কথা স্পষ্ট করে বলা না গেলেও আন্দাজ করা যায়। আমাদের মনে হয়–পাণ্ডু যখন মারা গেছেন এবং ধৃতরাষ্ট্র যখন পাকাপাকিভাবে রাজ্যের শাসনভার লাভ করেছেন, তখন শকুনিও গান্ধার ছেড়ে চলে এসেছেন হস্তিনাপুরে। গান্ধার একটি ক্ষুদ্র পার্বত্য রাজ্য, সেখানে থেকে রাজনীতি করার শখ মেটে না। বিশেষত যাঁরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী তাঁদের কাছে উত্তর-ভারত তখন স্বর্গরাজ্য। উত্তরভারতে তখন আর্যায়ণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। গান্ধারে আর্য রাজাদের আর সেই রমরমা নেই–এ কথা আগেই আমরা জানিয়েছি। হয়তো শকুনি আপন আশা–আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য হস্তিনাপুরে তার জামাইবাবু ধৃতরাষ্ট্রের বাড়িতে চলে আসেন তখনই, যখন তিনি দেখেছেন রাজ্য তার জামাইবাবুর হাতে এসে গেছে।
হয়তো দুর্যোধন-দুঃশাসনরাও তখন ছোট ছোট। শকুনি এই অবস্থায় তাদের সঙ্গে মিশে মিশে তাদের কাছের লোক হয়ে পড়েন খুব তাড়াতাড়ি। ধৃতরাষ্ট্র নিজে অন্ধ মানুষ, অন্ধত্বের কারণে রাজকার্যের নানান অসুবিধে হয় বলেই যে তাকে প্রথম রাজা করা হয়নি, সে কথাও তিনি ভালই মনে রেখেছেন। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের এই রাজা হবার মুহূর্তে শকুনি এসে পড়ায় তারও বোধহয় সুবিধেই হল। কিন্তু এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, শকুনি হলেন কণিক–বর্ণিত সেই শেয়াল, যিনি হস্তিনাপুরের রাজসভায় এসেছেন রাজনীতির ক্রুর খেলা খেলতে। রাজসভায় তিনি বসেন না। তিনি দুর্যোধনের মন্ত্রণাসভার শৃগাল-রাজনীতিক।
.
১১২.
এ হল মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কিচেন-ক্যাবিনেট। ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রণা-সভায় ভীষ্ম-বিদুরের মতো মন্ত্রীরা রাজনীতিশাস্ত্রের প্রজ্ঞা দিয়ে বিষয় বিবেচনা করেন, আর তলায় তলায় এই যে মন্ত্রণা-সভা বসেছে, এর সদস্য মাত্র চারজন–শকুনি, দুর্যোধন, কর্ণ, দুঃশাসন। সর্বহিতৈষিণী বুদ্ধি দিয়ে এঁরা বিষয় বিচার করেন না। দুর্যোধনের স্বার্থলাভ কীভাবে হয় এবং সেই সঙ্গে অন্যেরাও সেই স্বার্থের ওপর কীভাবে নিজের স্বার্থ লাভ করতে পারেন–সেই ভাবনা সুদৃঢ় হয় এই ছোট্ট সভায়। ধৃতরাষ্ট্র নিজের প্রজ্ঞায় এঁদের মত অন্তর থেকে মানতে পারেন না, কিন্তু পুত্রস্নেহে অন্ধ হয়ে তিনি এই মন্ত্রিসভার আপাতরম্য সিদ্ধান্তগুলি মেনে নেন। সাধারণভাবে প্রজাহিত তার আকাঙ্ক্ষিত বস্তু হলেও সেই হিত পাণ্ডবদের মাধ্যমে সম্পন্ন হোক এ তিনি চান না।
ধৃতরাষ্ট্রের পিছনে সমান্তরাল যে মন্ত্রিসভাটি চলে, তার চার সদস্য–যাঁদের আমরা নিঃসন্দেহে দুষ্ট-চতুষ্টয় বা Gang of four বলতে পারি, তারা কিন্তু এমনি-এমনিই আজ মন্ত্রণায় বসেননি। এর পিছনে সামান্য একটু ইতিহাস আছে। প্রথমত, ভীমের অনন্যসাধারণ শক্তি এবং অর্জুনের অসামান্য অস্ত্রজ্ঞান হস্তিনাপুরের জনপদ-পুরবাসী সকলকে গর্বিত করে তুললেও দুর্যোধন নিজে তাতে অত্যন্ত কষ্ট পাচ্ছিলেন। ঈর্ষা এবং অসূয়া তার অন্তর দগ্ধ করছিল নিরন্তর–দুর্যোধনো লক্ষয়িত্ব পৰ্য্যতপ্যত দুর্মনাঃ। পাণ্ডবরা এমনকি যুবরাজ যুধিষ্ঠিরও দুর্যোধনের এই অন্তর্বেদনা একটুও বুঝতে পারেননি। তারা প্রধানত মহামতি বিদুরের উপদেশ অনুসারে রাজ্য শাসন করতেন। আর কে না জানে, রাজনীতির প্রয়োগ–বিজ্ঞানে বিদুর এতটুকুও মেকিয়াভেলিয়ান নন। গাঢ় ধর্মবোধ, নীতি-নিয়ম এবং হিতৈষণা বিদুরের রাজনীতিকে প্রজারঞ্জনের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করে। যুবরাজ যুধিষ্ঠির এই প্রজ্ঞাশালিনী বিদুর-নীতির বাহকমাত্র।
প্রজাদের জন্য এত ভাবনা আর ভালবাসাই শেষ পর্যন্ত কাল হল যুধিষ্ঠিরের। রাজা ভালবাসলে প্রজাও রাজাকে তেমনি ভালবাসে। যুবরাজ যুধিষ্ঠিরের গুণপনায় তারা এতই মুগ্ধ যে, তারা মাঠে–ঘাটে সর্বত্র যুধিষ্ঠিরের গুণ গাইতে লাগল–কথয়ন্তি স্ম স্যুয় চত্বরেষু সভাসুচ। তারা যুবরাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজা হিসেবে দেখতে চাইল। এ বিষয়ে তাদের সরল যুক্তি-তর্কের কোনও অভাব হল না। তারা একেক জায়গায় মিলিত হয়ে বলতে লাগল–আরে আমাদের ধৃতরাষ্ট্র তো জন্মান্ধ বলে আগেই রাজ্য পাননি। তো এখন আর তিনি রাজা হবেন কী করে–রাজ্যং ন প্রাপ্তবান পূর্বংস কথং নৃপতি–ভবেৎ? আর ওই যে চিরকুমার ভীষ্ম! তিনি তো সেই কবে প্রতিজ্ঞা করে রাজ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি অন্তত কোনও দিনই আর রাজ্য গ্রহণ করবেন না–প্রত্যাখ্যায় পুরা রাজ্যং ন স জাতু গহীষ্যতি। তার থেকে এই আমাদের যুবরাজ যুধিষ্ঠিরই সবচেয়ে ভাল। বয়সটাও কম, আর এই বয়সেও যেমন তিনি সত্যবাদী, তেমনি তার দয়া। আমরা তাই যুধিষ্ঠিরকেই রাজা হিসেবে বরণ করব–অভিষিঞ্চামঃ সাধ্বদ্য… তরুণং বৃদ্ধশীলিন। যুধিষ্ঠির রাজা হলে আমাদের ভীষ্ম-ধৃতরাষ্ট্রেরও কোনও কষ্ট থাকবে না। আমাদের যুধিষ্ঠির বুড়ো মানুষদের দুঃখ খুব বোঝেন। সমস্ত রাজকীয় উপচারে সেবা করেই তিনি এঁদের সুখে রাখবেন।
