শেয়াল বলল–আমি অনুমতি দিইনি। কিন্তু সে আমার কথা শুনবে বলে মনে হয় না। ইঁদুর শেয়ালের কথা শুনে ভয়ে লাফ দিয়ে গর্তে ঢুকে পড়ল। এর পরে উপস্থিত হল সেই নেকড়ে বাঘ। আমরা একে নেকড়ে বাঘ বলেছি বটে, তবে এ ঠিক নেকড়ে কি না সন্দেহ আছে। সংস্কৃতে আছে বৃক! সিদ্ধান্তবাগীশ অর্থ করেছেন কেন্দুয়া বাঘ অর্থাৎ বাংলায় যাকে–এক ছিল মোটা কেঁদো বাঘ–ইত্যাদি বলি সেই কেঁদো বাঘ। বস্তুত কেঁদো বাঘও ঠিক বৃক নয়। বরঞ্চ সিদ্ধান্তবাগীশ সংস্কৃত টীকায় বলেছেন–কুকুরের মতো দেখতে এক রকমের বাঘ-কুকুরাকারো ব্যাঘ্রঃ। প্রাণিতত্ত্ববিদেরা বলেন–আমরা যে অ্যালসেশিয়ান ইত্যাদি কুকুর দেখতে পাই এরা এককালে বন্য প্রাণী ছিল। এদের ডোমেস্টিকেট করা হয়েছে মাত্র। আমাদের ধারণা–বৈদিক যুগ থেকে যে বৃক শব্দটি নেমে আসছে–সেই বৃক বলতে কুকুর–জাতীয় বন্য তথা হিংস্র প্রাণীকেই বোঝায়।
সেই বৃক বা কেঁদো বাঘ আসতেই শেয়াল বলল–দেখ ভাই। সামনে তোমার ভীষণ বিপদ। কী কারণে জানি না, বাঘ তোমার ওপর ভীষণ খেপে গেছেন। এর ফল খুব ভাল হবে বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এইমাত্র আমায় বলে গেলেন–এই কেঁদোটাকে আমি দেখে নেব। তিনি আবার সস্ত্রীক আসছেন তোমার ওপর রাগ মেটানোর জন্য। এ কথা শোনার পর তোমার যা কর্তব্য মনে হয় করো–সকলত্রস্তু-ইহায়াতি কুরুষ যদনন্তরম্। শেয়ালের কথা শুনে কেঁদো বাঘ আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকা ঠিক মনে করল না। সেও পালাল।
এইবার স্নান-পরিপাটি সেরে উপস্থিত হল বেজি। শেয়াল জানে–বড় বড় শত্রুরা তার রাজনৈতিক বুদ্ধির কাছে পরাজিত হয়েছে। বেজি হল শেষ শত্রু এবং সে তার চেয়ে অনেক দুর্বল। অতএব আর কাল বিলম্ব নয়। এবার সে নিজেই ভয় দেখাবে। বেজিকে সে বলল–দেখ! ওই সব বাঘ, কেঁদো বাঘ–এদের সবাইকে আমি যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছি। তারা এখন আমার ত্রিসীমানার মধ্যে নেই। সব পালিয়েছে–নির্জিতাস্তেন্যতো গতাঃ। তোমার যদি ইচ্ছে হয় তো আমার সঙ্গে যুদ্ধ করো এবং আমাকে জয় করে যত ইচ্ছে মাংস খাও–মম দত্ত্বা নিযুদ্ধং ত্বং ভুঙক্ষ মাংসং যথেল্পিতম্। অর্থাৎ সময় বুঝে শেয়াল এখন দণ্ড প্রয়োগ করছে।
বেজি বুঝল সে শেয়ালের সঙ্গে পারবে না। অতএব যুদ্ধ না করেই সে বলল–বাঘ হল পশুদের রাজার সমান, তাকে তুমি হারিয়েছ, তারপর কেঁদো বাঘ, এমনকি ওই মহা-বুদ্ধিমান ইঁদুরটাকেও তুমি জয় করেছ। এরপর আমি আর তোমার সঙ্গে কোন মুখে যুদ্ধ করব। তুমি সবার চাইতে বড় বীর–নির্জিতা যৎ ত্বয়া বীরা স্তস্মাদ্বীরতরো ভবান্–আমার ক্ষমতা নেই বাপু তোমার সঙ্গে লড়ব। এই কথা বলে বেজিও পালাল। রাজনৈতিক বুদ্ধিতে সাম-দান ইত্যাদি উপায়ের মাধ্যমে সামান্য শেয়াল সবাইকে ঠকিয়ে দিয়ে নিজে একা সেই মৃগমাংস ভক্ষণ করল।
শেয়াল-বাঘের গল্প বলে এবার কণিক ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন–রাজনীতি করতে হলে এই শেয়ালের মতো ব্যবহার করতে হবে, মহারাজ! ভীরু লোকটাকে সরিয়ে দেবেন ভয় দেখিয়ে আর প্রবলতর শত্রুর কাছে হাত জোড় করবেন–ভয়েন ভেদয়ে ভীরুং শূরমঞ্জলিকর্মণা। লুব্ধ-লোভী শত্রুকে ধন-সম্পত্তি কিছু ছেড়ে দেবেন। আর দুর্বলের ওপর বলপ্রকাশ করবেন। আরও একটা কথা–এই রাজনীতির ব্যাপারে ভাই-বন্ধু, বাপ-ছেলে, গুরু-গুরুবৎ কিছু নেই। এঁরা শত্রু হয়ে দাঁড়ালে এঁদের ছাড়া নেই। মারতে হবে। উন্নতি করতে হলে এই নিয়ম জানবেন–রিপুস্থানেষু বর্তন্তো হন্তব্যা ভূতিমিচ্ছতা।
এত ক্রুর নৃশংস রাজনীতির প্রয়োগ করতে গিয়ে মানুষের মধ্যে যদি ভাবের এবং আচরণের বিকার ঘটে, অতএব সে ব্যাপারেও সাবধান করে দিলেন কণিক। বললেন–দেখুন মহারাজ! অন্তরে আপনার হাজার রাগ থাকুক, বাইরে সেটা প্রকাশ করবেন না। সব সময় কথা বলবেন হেসে। একজনের ওপর রাগ থাকলেও এমনভাবে তাকে গালাগালি দেবেন না যাতে তার গৌরব নষ্ট হয়–ক্রুদ্ধোপ্যক্রুদ্ধরূপঃ স্যাৎ স্মিত পূৰ্বাভিভাষিতা। মনে রাখবেন–প্রহার করার সময়েও হাসতে হবে।
কণিক আরও অনেক উপদেশ দিয়েছেন ধৃতরাষ্ট্রকে এবং এই সমস্ত উপদেশকেই ম্যাকিয়াভেলিয়ান তো বলা যায়ই, বরং আরও বলা যায়, সেগুলি নির্মম, নৃশংস এবং কূর। ধৃতরাষ্ট্র সব শুনলেন এবং শোনার পরে সে খুব খুশি হয়ে উঠলেন, তা নয়। কণিক বলেছিলেন–পাণ্ডবরা আপনার পরম আত্মীয় হলেও তারা আপনার ছেলেদের থেকে বেশি বলবান। কাজেই ছেলেদের সঙ্গে মিলে আপনি এমন উপায় বার করুন, যাতে পাণ্ডবদের কাছ থেকে আপনার কোনও ভয় না থাকে–যথা ভয়ং ন পাণ্ডভ্যস্তথা কুরু নরাধিপ।
অন্তত শেষ কথাটা ধৃতরাষ্ট্রের মনে ধরল বটে, কিন্তু পরম প্রিয় ভ্রাতুস্পুত্রেরা, যারা আপাতত কোনও দোষই করেনি, তাদেরকে নৃশংসভাবে মেরে ফেলতেও তার মন চাইল না। তিনি মনে মনে কষ্ট পেতে লাগলেন–শোকার্তঃ সমপদ্যত। কিন্তু যত দুঃখই তিনি পান, ধৃতরাষ্ট্রের কাছে ছেলের স্বার্থ সবার আগে। যুবরাজের আসনে বসে যুধিষ্ঠির নাম কিনছেন, অন্যান্য পাণ্ডব-ভাইরা যুদ্ধ করে বিখ্যাত হচ্ছেন, আর নিজের ছেলেরা গৌণ হয়ে আছে–এই গৌণতা ধৃতরাষ্ট্রকে পীড়িত করে। এরই মধ্যে তার কাছে ঘটনা অনেক সহজ হয়ে গেল।
শকুনি, দুর্যোধন, দুঃশাসন, কর্ণ–এই চারজনের সভা বসল। তারা সমস্ত পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার বুদ্ধি করলেন। জননী কুন্তীও এই মারণ–পরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলেন– দহনে তু সপুত্ৰায়া কুত্যা বুদ্ধিমকারয়।
