মহাভারতের কবি স্বকণ্ঠে বলেননি বটে, তবে বেশ বোঝা যায়–এ পর্যন্ত গল্প যতটুকু এগিয়েছে, তা হল সাম এবং দানের পরিসর। অর্থাৎ শেয়াল প্রথম দিকে যে মন্ত্রণা দিয়েছে, যেভাবে দুর্বলতর শক্তি ইঁদুরকে সে কাজে লাগিয়ে সকলের বিশ্বাস উৎপাদন করেছে, তার মধ্যে শেয়ালের মধুর ব্যবহার, সকলের জন্য ভাবনা দেখানো তো আছেই, উপরন্তু বন্ধুদের স্নান করে ফিরে না আসা পর্যন্ত মৃত পশুটিকে আগলে রাখার ভার নিয়ে সে তার বদান্যতা এবং দানের প্রবৃত্তিও ফুটিয়ে তুলেছে। সোজা কথায় এখানে সাম-দানের প্রয়োগ ঘটল প্রায় একই সঙ্গে, অবশ্য এটা কোনও রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয় নয়, বিষয়টি একটি মৃত পশুর আহার-সংক্রান্ত, কাজেই সাম এবং দানের মধ্যে সময়ের ব্যবধান তত নেই। কিন্তু বিষয়টা রাষ্ট্রিক না হলেও রাজনৈতিক বটে। কাজেই রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান কিছু বাড়লেও বাড়তে পারে বটে, কিন্তু তাই বলে যুগপৎ সাম-দানের প্রয়োগ হতে পারবে না তা মোটেই নয়। বরঞ্চ প্রাচীন রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা সাম-দানের প্রক্রিয়াটি খুব তাড়াতাড়ি মিটিয়ে নিতে বলেন, কারণ তাতে পরবর্তী উপায় দুটি নিঃসঙ্কোচে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কণিকের বলা উপাখ্যান অনুযায়ী বাঘ খুব তাড়াতাড়িই নদীতে স্নান করে এল। পাঁচজনের মধ্যে সেই সবচেয়ে বলশালী, অতএব মাংসের ভাগটাও তার সবচেয়ে বেশি চাই বলেই হয়তো সে সবার আগে স্নান করে ফিরল–অথাজগাম পূর্বত্ত স্নাত্বা ব্যাঘ্রো মহাবলঃ। কিন্তু এইবার শুরু হল প্রাজ্ঞ শৃগালের আসল খেলা। সম্পূর্ণ হরিণটাকেই সে একা আত্মসাৎ করতে চায়। অতএব পাঁচজনে স্নান করতে যেতেই যে সময়টুকু সে পেল, তার মধ্যেই শেয়াল তার ইতিকর্তব্য স্থির করে ফেলল। সে ভয়ঙ্কর রকমের চিন্তার ভাণ করে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল। বাঘ স্নান করে এসে শেয়ালের এই চিন্তাকুল অবসন্ন ভাব দেখে–চিন্তাকুলিতমানসম্ নিজেও চিন্তাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করল–কী এত ভাবছ, পণ্ডিত! আমাদের মধ্যে তুমিই হলে সবচেয়ে বুদ্ধিমান। সমস্যা হলে তোমার কাছে সমাধান নেই এমন তো হতেই পারে না–কাজেই চিন্তা কিসের? কিং শোচসি মহাপ্রাজ্ঞ ত্বং নো বুদ্ধিমতাং বরঃ। আজকে আমরা সবাই মিলে মহানন্দে মাংস খাব।
শেয়াল বলল–সে তো বেশ ভালই হত, ভাই! কিন্তু আমাদের ওই ইঁদুর–ভায়া এমন একটা কথা বলে গেল, যা তোমাকে বলতেও আমার সংকোচ হচ্ছে, অথচ না বলেও পারছি না। আমার এত চিন্তা তো সেই জন্যই। বাঘ বলল–আহা বলই না কী বলেছে। শেয়াল বলল–ওইটুকু পুঁচকে ইঁদুর! সে কি না এত বড় একটা কথা বলে গেল! শুনবে সে কথা? ইঁদুরটা এই একটু আগে এসে আমায় বলে গেল–ধিক্ তোমাদের বাঘ-মশাইকে, আর ধিক তার শক্তিকে? লজ্জা বলে যদি কোনও জিনিস থাকে ওই বাঘের? ওই হরিণটাকে মারল কে? আমি। আমি মেরেছি–ধিশ্বলং মৃগরাজস্য ময়াদ্যায়ং মৃগো হতঃ। ও তো কতবার চেষ্টা করেছে। পেরেছে? আমার শক্তির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে যে, সে আজ গর্জন করে বলছে–মাংস খাবে। ছি ছি লজ্জাও করে না? তুমি তাকে বলে দিও, পণ্ডিত–অমন মাংস আমি ছুঁয়েও দেখি না। আমি হরিণ মেরে দিয়েছি, এখন ও মাংস তোমার বাঘই খাক, অত গর্জন করার দরকার নেই–গর্জমানস্য তস্যৈবমতো ভক্ষ্যং ন রোচতে।
শেয়াল তার প্রথম ভেদনীতি প্রয়োগ করল এবং সফল হল। সত্যিই তো হরিণ মারার ব্যাপারে ইঁদুরের অবদান আছে। আর বাঘের মতো প্রবল শক্তিশালীর পক্ষে ইঁদুরের এই সাহায্য গ্রহণ লজ্জারই বটে। বাঘ স্বীকারও করল সে কথা। তার নিজের শক্তির ব্যাপারে সে সর্বদাই সচেতন, একজন অতি প্রবল রাজার মতোই আত্মসচেতন। অথচ হরিণ মারার ব্যাপারে ক্ষুদ্র-ইঁদুরের সাহায্য সে নিয়েওছে। বাঘ অতএব একটু সলজ্জেই শেয়ালকে বলল–ইঁদুর যখন এ কথা বলেই গেছে, তখন তুমি আমাকে সে কথা সময়মতো জানিয়ে খুবই ভাল করেছ–কালে হ্যস্মিন্ প্রবোধিতঃ। তুমি আমাকে আমার আত্মসম্মান বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছ। তোমার ইঁদুরকে বোলো–আর তার সাহায্যের দরকার হবে না। আমি আমার নিজের ক্ষমতাতেই বনের পশু মারতে পারব যথেষ্ট–স্ববাহুবলমাশ্ৰিত্য হনিষ্যেহং বনেচরা–এবং আমারও খাবার জুটবে, আমার মাংসের অভাব হবে না–খাদিষ্যে তত্র মাংসানি।
রাগের চেয়ে বাঘের অভিমান হল অনেক বেশি। ইঁদুরের কথায় তার মানে লেগেছে। সে আর বাক্য-ব্যয় না করে নিজের পুরুষকার প্রমাণ করার জন্য বনে চলে গেল–ইত্যুত্ত্বা প্রস্থিতো বনম। এই স্নান করে পরিপাটি হয়ে শেয়ালের সামনে উপস্থিত হল ছোট্ট ইঁদুর। ইঁদুরকে শেয়াল এমনিই মেরে ফেলতে পারত, কিন্তু তাতে বন্ধুদের মধ্যে নানা কথা উঠবে। ইঁদুরের উপকারের প্রসঙ্গও আসবে। রাজনীতিকরা দুর্বল শত্রুকেও রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করে–সেটা দেখানোর জন্য ইঁদুরের ওপরেও ভেদনীতি প্রয়োগ করল শেয়াল।
শেয়াল বলল–দেখ ভাই ইঁদুর! তুমি এসে গেছ ভালই হয়েছে। দেখ ভাই! একদিন মাংস খাওয়াটা খুব বড় কথা নয়। আমি চাই তোমার সর্বাঙ্গীণ সর্বকালীন মঙ্গল হোক এবং সেইজন্যই একটা কথা তোমায় না বলে পারছি না–শৃণু মূষিক ভদ্রং তে নকুলো যদিহাব্রবীৎ। ওই যে বেজি! হরিণ মারার ব্যাপারে সে কী করেছে? এতটুকু সাহায্যও তো করেনি। এদিকে সে কী বলছে জান? বলছে–ওই হরিণের মাংস আমি খাব না। ওতে বাঘের মুখ লেগেছে, ও মাংস বিষ হয়ে গেছে আমার কাছে–মৃগমাংসং ন ভক্ষেয়ং গরমেতন্ন রোচতে। আমি বরং নতুন অনুচ্ছিষ্ট মাংস খাব। আমি ওই ইঁদুরটাকে খেতে চাই, আপনি অনুমতি করুন–তদ ভবান্ অনুমন্যতা।
