.
১১১.
শত্রু-শাতনের নির্দিষ্ট উপায়গুলি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে কণিক ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন– সাম, দান, ভেদ এবং দণ্ড–এই চারটে উপায়ের প্রয়োগ করে শত্রুকে একেবারে উচ্ছেদ করে ছাড়তে হবে–সার্বোপায়ৈঃ প্রশাতয়েৎ। প্রাচীন রাজনীতিশাস্ত্রে সাম, দান, ভেদ, দণ্ড–এই চারটি উপায় যথেষ্ট বিখ্যাত শব্দ। সাম মানে মধুর-সান্ত্বনা বাক্যে শত্রুর মন জয় করা। সামে কাজ না হলে দান অর্থাৎ খানিকটা ছেড়ে দেওয়া। সে যেমন নিজকৃত পূর্বশর্ত ছেড়ে দেওয়াও হতে পারে, ধন-সম্পত্তি দানও হতে পারে আবার খানিকটা ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়াও হতে পারে। এই নীতির বশবর্তী হয়েই ভারত এক সময় পাকিস্তানকে বেরুবাড়ি অঞ্চল ছেড়ে দিয়েছিল, আবার সেদিন তিন বিঘা অঞ্চল মুক্ত করে দিল বাংলাদেশের কাছে। দান-নীতিতে কাজ না হলে ভেদ সৃষ্টি করতে হয়। গুপ্তচর বা বিশ্বস্ত পুরুষের সাহায্যে রাজার সঙ্গে মন্ত্রীর, মন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রীর, রাজার সঙ্গে প্রজার, প্রজার সঙ্গে মন্ত্রীর–এইভাবে নানা কথায় শত্রুরাজ্যের একের সঙ্গে অপরের মতভেদ তৈরি করে রাজ্যের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বাধিয়ে দিতে হবে। সাম, দান, ভেদ-এই তিন উপায়ই বিফল হয়ে গেলে তখন দণ্ডের ব্যবস্থা অর্থাৎ আক্রমণ। সেজন্য অবশ্য নিজেকে আগে থেকেই তৈরি করতে হবে। সাম, দান, ভেদের প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ের মধ্যেই শত্রুরাজ্য আক্রমণ করার মতো শক্তি সঞ্চয় করে নিতে হবে।
ধৃতরাষ্ট্র যে এই চারটি মোক্ষম উপায়ের কথা জানেন না, তা মোটেই নয়। তিনি এতদিন সিংহাসনে বসে রাজ্য চালাচ্ছেন, বিশেষত অন্ধত্বের দরুন তার বাস্তববোধ কিছু কম হলেও তাত্ত্বিকতার ক্ষেত্রে তিনি কিছু কম পোক্ত নন। কিন্তু তিনি যা জানেন, অথবা রাজনীতি শাস্ত্রেও যা বলে, তা হল–সাম-দান ইত্যাদির ক্রমিক প্রয়োগ। অর্থাৎ প্রথমটায় কাজ না হলে দ্বিতীয়টা অথবা দ্বিতীয় উপায় সফল না হলে তৃতীয়টার প্রয়োগ। কিন্তু একই সঙ্গে চারটি উপায়ের প্রয়োগ–এ তত বড় সাংঘাতিক কথা। ধৃতরাষ্ট্র তাই লজ্জা না করে বলেই ফেললেন–বামুন ঠাকুর! সাম, দান, ভেদ, দণ্ডের মাধ্যমে কীভাবে শত্রু দমন করতে পারি, সেটা একটু পরিষ্কার করে বলো তো বাপু–তন্মে ব্ৰহি যথাতথ।
কণিক বললেন–দেখুন মহারাজ! এ জিনিস বোঝাতে গেলে আপনাকে একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে হবে। আপনি বরং আমার কাছে একটা গল্প শুনুন। গল্পের মধ্যে কল্পনা আছে অবশ্যই, কিন্তু সেই কল্পনা শুধু গল্প বলার জন্যই। নইলে আসল রাজনীতির বিবরণ বাযথার্থতা এইরকমই। শুনুন তাহলে–এক বনে একটি শেয়াল থাকত। শেয়ালটি নীতিশাস্ত্র এবং অর্থশাস্ত্র দুইই খুব ভাল জানত। এ গল্প তার সম্বন্ধে জম্বুকস্য মহারাজ নীতিশাস্ত্রার্থদর্শিন৷ এই শৃগাল অবশ্যই রাজনৈতিক নেতার প্রতীক। অর্থদশী মানেই নিজের লাভ, নিজের সমৃদ্ধি তথা প্রতিপত্তি বিস্তারের উপায় যার জানা আছে। স্বার্থলাভের উপায়জ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শৃগালের বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা–কৃতপ্রজ্ঞঃ শৃগালঃ স্বার্থপণ্ডিতঃ। এই সব মিলেই একজন সার্থক রাজনীতিবিদের জীবন–চর্যা চলে।
কণিক বলে চললেন–এই বনবাসী শেয়ালের চারজন বন্ধু। এক বন্ধু বাঘ, দ্বিতীয় বন্ধু একটি ইঁদুর, তৃতীয় জন একটি নেকড়ে আর চতুর্থ বন্ধু হল একটি বেজি। চারজনকে নিয়ে শেয়াল ভালই আছে, ঠিক যেমন একজন ধূর্ত রাজা তার চারপাশে প্রবল, দুর্বল এবং নিজের সমান শক্তিসম্পন্ন রাজাদের সঙ্গে নিয়েই চলেন।
একদিন হল কী, সেই বনের মধ্যে একটি বিশাল এবং বলিষ্ঠ হরিণ দেখা গেল। নধরকান্তি হরিণটিকে দেখে সকলেরই মাংস খাবার লোভ হল বটে, কিন্তু শেয়াল অন্তত মুখে কিছু বলল না। বাঘ যেহেতু এই পাঁচ জনের মধ্যে অসীম শক্তিধর, অতএব সে কারও তোয়াক্কা না করেই দু–একবার হরিণটিকে ধরার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সে ব্যর্থ হয়েছে। বাঘই যেখানে পারেননি সেখানে অন্যেরা তো কোন ছাড়।
হরিণটিকে মাঝে-মাঝেই দেখা যাচ্ছে, তাকে দেখে খাবার লোভও হচ্ছে, অথচ তাকে ধরা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় পাঁচজনের মন্ত্রণাসভা বসল আর মন্ত্রণাসভায়–কে না জানে, সবার আগে শেয়ালই কথা বলবে। কারণ তার বুদ্ধি বেশি। শেয়াল বলল–দেখ ভাই বাঘ! তুমি এই হরিণটাকে মারবার জন্য বার বার চেষ্টা করেছ–অসকৃ যতিততা হেষ হন্তুং ব্যাঘ্র বনে ত্বয়া। কিন্তু হরিণটা যেমন জোয়ান, যেমন বেগবান, তেমনই তার বুদ্ধি। তুমি তাই পারনি ধরতে। কিন্তু হরিণটা আমাদের চাইই চাই। তোমরা আমার বুদ্ধি শোনো। হরিণটা যখন ঘুমিয়ে থাকবে, তখন আমাদের এই ইঁদুর-বন্ধু নিঃশব্দে গিয়ে ওর চারখানা পায়ের গোড়ালির মাংস টুকিয়ে টুকিয়ে খেয়ে নেবে। পরের দিন দেখবে–ওর আর দৌড়বার অত ক্ষমতা থাকবে না। এর পর যে শক্তি এবং বেগে হরিণ দৌড়বে, তাতে আমাদের বাঘ-মশায়ের কোনও অসুবিধেই হবে না হরিণটাকে ধরতে। একবার ধরা পড়লে আমরা তখন সকলে মিলে প্রেমানন্দে হরিণটাকে খাব–ততৌ বৈ ভক্ষয়িষ্যামঃ সর্বে মুদিতমানসাঃ।
শেয়ালের বুদ্ধি সকলের বেশ পছন্দ হল। নির্দিষ্ট কর্তব্য অনুসারে ইঁদুর সময় বুঝে ঘুমন্ত হরিণের পায়ে এমন মৃদু-তীক্ষ্ণ কামড় লাগাল যে হরিণ বুঝতেও পারল না যে, তার চারখানি পা-ই ভীষণ রকমের কমজোরি হয়ে গেল। বাঘের কোনও অসুবিধেই হল না পরের দিন। সে সাবহেলে দু-চার লাফেই ধরে ফেলল হরিণটিকে–মূষিকাভক্ষিতৈঃ পাদৈগং ব্যাঘ্রোবধীত্তদা। হরিণটির বিশাল করুণ দেহখানি নিথর হয়ে যেতেই–অচেষ্টমানস্তু ভূমৌ মৃগকলেবর শেয়াল এবার চার বন্ধুকে বলল–এই হরিণটাকে আমি দেখে রাখছি। তোমার কোনও চিন্তা নেই। তোমরা নদীতে গিয়ে ভাল করে স্নান-টান করে এসো। তারপর শান্তিতে মাংস ভোজন করা যাবে–স্নাত্বাগচ্ছত ভদ্রং বো রক্ষামীত্যাহ জম্বুকঃ।
