কণিক ধৃতরাষ্ট্রকে যা বলেছেন, তা মহামতি মেকিয়াভেলির উপদেশের থেকে কম কিছু নয়। কণিক অনেক উপদেশ দিয়েছেন। তার মধ্যে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তার সঙ্গে যেগুলো মেলে, সেগুলোই শুধু উল্লেখ করলে এইরকম দাঁড়ায়। কণিক বললেন–দেখুন মহারাজ! আপনি যাকে শত্রু বলে মনে করছেন, বিশেষত যদি সে আপনার কোনও অপকার করে থাকে, তবে তাকে মেরে ফেলাটাই সবচেয়ে ভাল–বধমেব প্রশংসন্তি শত্ৰুণাম অপকারিনা। শত্রু যদি পরাক্রমশালী হয় তবে ফঁক খুঁজতে হবে–কখন তার বিপদ আসে এবং সেই বিপদের সময়ে আক্রমণ করে তাকে মেরে ফেলতে হবে। তখন যেন ভাই-বন্ধু এসব বিচার করতে যাবেন না। আবার শত্রু যদি রাজ্যের মধ্যেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, সে যদি আবার তার মধ্যে যুদ্ধনিপুণ হয় তবে, তাকে নিজের রাজ্যের মধ্যে না রেখে নির্বাসন দেওয়াটাই উচিত। কারণ সে যে কোনও সময় বিপদ ঘটাবে।
কণিক উপমা দিয়ে বললেন–সামান্য একটু আগুন থেকেই একটা গোটা বন পুড়ে যায়, মহারাজ। কাঠ-ফাটের মতো দাহ্য বস্তুর সামান্য একটু আশ্রয় পেলেই এতটুকু আগুন এত বড় বন পুড়িয়ে দেবে। আরও একটা কথা বলি–শত্রুকে কাতর দেখে তার ওপর আবার মায়া-মমতা করতে যাবেন না। ওসব সময় একেবারে অন্ধ হয়ে থাকবেন, যেন কিছুই দেখতে পাননি। বিপদে পড়লে শত্রু অনেক কান্নাকাটি করবে, তখন এমন ভাব করবেন, যেন কিছুই শুনতে পাননি–অন্ধঃ স্যাৎ অন্ধবেলায়াং বাধিমপি চায়েৎ। ওসব শরণাগত–টরণাগত বুঝি না, সোজা মেরে ফেলুন।
রাজার সব সময়েই শত্রুবধের শক্তি-সামর্থ্য থাকে না, তার নিজের এমন অবস্থা থাকতেই পারে যাতে প্রবলের সঙ্গে তিনি পেরে উঠছেন না। সে অবস্থায় কণিকের উপদেশ হল–প্রবল শত্রু যদি আপনাকে আক্রমণ করে, তবে কোনও ভাবনা না করে ঘাস-পাতার মতো শুয়ে পড়বেন মহারাজ। কিন্তু আপনি সদা সতর্ক থাকবেন হরিণের মতো কানটি খাড়া করে। শত্রুকে মিষ্টি কথায় ভোলাবেন, দরকার হলে এটা-ওটা ভালরকম পেন্নামি দেবেন। তারপর যখন দেখবেন, সে ঠান্ডা হয়েছে, তখন ঝোঁপ বুঝে কোপ মারবেন। সব সময় মনে রাখবেন–মৃত শত্রুর কাছে আপনার কোনও ভয় নেই। যে ভাবেই হোক, শত্রু মরলেই আপনি নিশ্চিন্ত-নিরুদ্বিগ্নো হি ভবতি ন হতাজ্জায়তে ভয়। শরণাগত হয়েছে বলে তাকে দয়া করতে হবে–এসব বড় বড় কথা আমার রাজনীতিতে নেই মহারাজ–দয়া ন তস্মিন্ কর্তব্যা শরণাগত ইত্যুত।
কণিক বোধহয় পাণ্ডবদের দিকে ইঙ্গিত করেই কথাটা বললেন। বস্তুত রাজ্যলাভের ক্ষেত্রে ভাই কিংবা ভাইয়ের ছেলেরা হলেন সহজ শত্রু, কারণ তাদেরও রাজ্য পাওয়ার ইক থাকে। বিশেষত পিতার মৃত্যুর পর পাণ্ডবরা এখন ধৃতরাষ্ট্রের শরণাগত। কিন্তু কণিকের মতে তাদেরও শত্রুর মতোই মনে করা উচিত। কণিক বললেন–দেখুন মহারাজ! রাজনীতিতে দয়া-মায়ার কোনও স্থান নেই। আমি শত্রুর মুলোচ্ছেদে বিশ্বাসী। প্রথমে শত্রুর মূল, তারপর তার সহায়, তারপর শত্রুপক্ষের সবাইকে এমনকি শত্রুর ওপরে যারা ভরসা করে আছে, তাদেরও মেরে ফেলা দরকার। মুখে এমন একটা ভাব বজায় রাখুন যাতে কেউ কিচ্ছুটি বুঝতে না পারে। বাইরে আপনি ঋষি-মুনির ভাব দেখিয়ে যজ্ঞ করুন, গেরুয়া কাপড় পরুন, এমনকি জটাও পাকাতে পারেন চুলে, দরকারে মৃগচর্মও পরিধান করুন, মহারাজ! এগুলোতে বেশ সুবিধে হয়। লোকে ধার্মিক বলে আপনাকে বিশ্বাস করুক এবং সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আপনি সময়মতো বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ুন শত্রুর ওপর–লোকান্ বিশ্বাসয়িত্বৈ ব ততো লুম্পেদ যথা বৃকঃ।
কণিকের কথা শুনে ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ-চক্ষু ছানাবড়া হয়ে উঠছে। তিনি কথা বলার ফাঁক খুঁজছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না। কণিকও সেটা বুঝলেন, কিন্তু তাই বলে তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে কথা বলার সুযোগ দিলেন না মোটেই। বরঞ্চ তার অন্তরের গভীর কথাটি কেড়ে নিয়ে বললেন–মহারাজ! একজন রাজা তো আর বসে বসে আঙুল চোষার জন্য রাজা হয় না, সে ফল চায়, রাজ্যের সমৃদ্ধি চায়, নিজে রাজা হিসেবে গদিতে থাকতে চায়, সমস্ত মানুষই তাই চায়, মহারাজ! আর তার জন্যই যত চেষ্টাফলার্থোয়ং সমারম্ভঃ লোকে পুংসাং বিপশ্চিতম্। সাধারণের অবস্থাই দেখুন না। গাছ থেকে ফল খাবে; তো লোকে গাছের ডাল টেনে টেনে নুইয়ে নিজের সামনে আনবে, তারপর পাকা ফলটি তুলে নেবে টুক করে–আনম ফলিনীং শাখাং পং পং প্রশাতয়েৎ। গাছের শাখাটি যদি ভাবে–আমাকে আদর করার জন্য কাছে নিয়ে যাচ্ছে, তো ভুল ভাবছে। সেইরকম জটা-চীর ধারণ করে আদরের ভাব করুন, মহারাজ কিন্তু ফলটি তুলে নিতে হবে। আপনার সময় যতক্ষণ পরিপক্ক না হচ্ছে, ততক্ষণ আপনি মাটির কলসীর মতো শত্রুকে কাঁধে করে বেয়ে নিয়ে বেড়ান, মহারাজ–বহেদমিত্রং স্কন্ধেন যাবৎ কালস্য পর্যয়ঃ। কিন্তু সময় যখন আসবে, তখন পাথরের ওপর কলসী যেমন আছাড় মেরে ভাঙে, তেমন করেই শত্রুকে আছাড় মারবেন–ততঃ প্রত্যাগতে কালে ভিন্দ্যা ঘটমিবাশ্মনি। সময় এসে গেলে আর কোনও মায়া-দয়া নেই। তখন সে ডাক ছেড়ে কাঁদুক, হাত জোড় করুক আর–শরণাগতই হোক, তাকে সোজা মেরে ফেলুন–অমিত্রো ন বিমোক্তব্যঃ কৃপণং বহুপি ব্রুবন্। এইভাবে কখনও ভাল কথা বলে, কখনও কিছু দিয়ে, কখনও বন্ধুজনের সঙ্গে তার ভেদ সৃষ্টি করে এবং সর্বশেষ উপায়ে তাকে মেরে ফেলে নিজের কাজটি গুছোতে হবে, মহারাজ!
