অনেক ভেবে চিন্তে ধৃতরাষ্ট্র তার মন্ত্রিসভার এক কুটিলবুদ্ধি মন্ত্রীকে খবর দিলেন। এই মন্ত্রীর নাম কণিক। মহাভারতের কবি কণিকের প্রথম বিশেষণ দিয়েছেন মন্ত্রজ্ঞ অর্থাৎ যে বিষয়ে তার মত চাইছেন ধৃতরাষ্ট্র, সেই রাজনীতির মন্ত্রণায় তার জুড়ি নেই। কণিকের দ্বিতীয় বিশেষণ–রাজশাস্ত্ৰার্থবিত্তমম্। এখানে রাজশাস্ত্র শব্দের অর্থ নীলকণ্ঠ করেছেন দণ্ডনীতিশাস্ত্র আর সিদ্ধান্তবাগীশ করেছেন নীতিশাস্ত্র। নীলকণ্ঠ যথাসম্ভব ঠিক অর্থ বলেছেন এবং সেইজন্যই সিদ্ধান্তবাগীশকে অন্য শব্দ ব্যবহার করতে হবে–এই তাড়নায় সিদ্ধান্তবাগীশ অত্যন্ত কমজোরি শব্দ ব্যবহার করেছেন।
বস্তুত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা সায়েন্স অফ গভর্নমেন্ট বলতে যে সব শব্দ প্রাচীনকালে ব্যবহৃত হত, তার মধ্যে অন্যতম শব্দগুলি হল রাজধর্ম, দণ্ডনীতি এবং রাজশাস্ত্র। কণিকের প্রসঙ্গে রাজশাস্ত্র কথাটা মহাভারতের কবিই প্রথম ব্যবহার করেছেন বটে, তবে পরবর্তীকালে নীতিপ্রকাশিকা নামে যে গ্রন্থটি ব্যাসশিষ্য বৈশম্পায়নের নামে চিহ্নিত হয়েছে, তার মধ্যেও রাষ্ট্রবিজ্ঞান অর্থে রাজশাস্ত্র শব্দটিই প্রযুক্ত হয়েছে। আর আছেন অশ্বঘোষ। তিনি কালিদাসের পূর্ববর্তী নাট্যকার এবং নিজকৃত বুদ্ধচরিত কাব্যে শুক্র-বৃহস্পতির লেখা রাজনীতি-বিজ্ঞানের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে অশ্বঘোষও রাজশাস্ত্র কথাটিই প্রয়োগ করেছেন।
তার মানে, রাষ্ট্রের পালন-পোষণ-সমৃদ্ধি এবং রাজ্যবিস্তারের নীতি-যুক্তির ক্ষেত্রে কণিক একেবারে ওস্তাদ মানুষ। কণিক রাজশাস্ত্র জানেন তথা অর্থশাস্ত্রও জানেন। নতুন ভূখণ্ড লাভ এবং তার পালনের উপায়ই অর্থশাস্ত্র। কণিক সেটাও ভাল জানেন, সেইজন্য রাজশাস্ত্ৰার্থবিত্তমঃ। কণিক মানুষটিকে শুধুমাত্র ধৃতরাষ্ট্রের অন্যতম মন্ত্রী বলে পরিচয় দিলে ভুল বলা হবে, ভারতবর্ষের রাষ্ট্রনীতির তাত্ত্বিকতা নিয়ে যদি কোনও বিচার করা যায়, তাহলে বলতে হবে–কণিক হলেন ভরদ্বাজ গোষ্ঠীর তাত্ত্বিক।
পুরাকালে যাঁরা রাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে বৃহস্পতি হলেন অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। বৃহস্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র ভরদ্বাজ। তিনি বৃহস্পতি-নীতি যেমন শিখেছিলেন তেমনই রাজনীতির বিষয়ে তার নিজস্ব ভাবনাও যথেষ্ট মূল্যবান ছিল, তার বলা রাজনীতি–বিজ্ঞান ভরদ্বাজ নীতি বলে প্রচারিত অর্থাৎ ভরদ্বাজ নীতি বাস্পত্য-নীতির একটি শাখা হলেও তার মধ্যে ভরদ্বাজের নিজস্ব অবদানও আছে। কণিক ভরদ্বাজ-নীতিই অনুসরণ করতেন, যদিও রাজনীতির ভাবনায় তারও নিজস্ব অবদান আছে। তবে ভরদ্বাজ–নীতির বহুলাংশ তার শাস্ত্রে পুনঃকথিত হওয়ায় কণিককে অনেকেই কণিক ভরদ্বাজ বলে ডাকেন অর্থাৎ কণিক ভরদ্বাজ স্কুলের তাত্ত্বিক।
কণিক জাতিতে ব্রাহ্মণ এবং ধৃতরাষ্ট্রের পরামর্শদাতা মন্ত্রী। ধৃতরাষ্ট্র তাকে নিজের বাড়িতে ডেকে এনে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে সরলভাবে তার কাছে নিজের অন্তর উদঘাটিত করলেন। বললেন–বামুন–ঠাকুর বড় কষ্টে আছি আমি। আমারই ভ্রাতুস্পুত্র পাণ্ডবদের শক্তি-বুদ্ধির কথা সকলেই এক সুরে গেয়ে বেড়াচ্ছে। তারা এখন বিখ্যাত মানুষ। এদের এই বাড়বৃদ্ধি দেখে আমার কিন্তু মনে বড় অসূয়া জন্মাচ্ছে–উৎসক্তাঃ পাণ্ডবা নিত্যং তেভ্যো সূয়ে দ্বিজোত্তম।
অসূয়া কথাটা আমরা খুব ব্যবহার করি বটে, তবে অসূয়া শব্দের একটা গভীর অর্থ আছে। অসূয়া মানে হল হাজার গুণ থাকলেও তার মধ্যে দোষ আবিষ্কার করা–গুণবত্ত্বেপি দোষাবিষ্করণম্। এর খুব সোজা উদাহরণ দেখবেন ক্লাস-রুমে। একটি ছেলে দারুণ ফল করছে, পরীক্ষায় প্রথম হচ্ছে অথচ অন্য অল্পবুদ্ধি ছাত্র (কখনও বা তার মা-বাবাও) সেই প্রথম হওয়া ছাত্রের সম্বন্ধে বলছে–আরে! মুখস্থ করে মারছে, মাথায় কিছুই নেই। একে বলে সগুণে দোষ আবিষ্কার করা। আচ্ছা তোকে বা তোর ছেলেকে কি আমরা মুখস্থ করতে বারণ করেছি? তুই মুখস্থ করেই প্রথম হ না। কিন্তু বেশ জানি–অক্ষম অকর্মণ্যের দাম্ভিক ঈর্ষাই হল অসূয়া।
ধৃতরাষ্ট্র তার নিজের ছেলেদের ঠিকপথে চালিত না করে পাণ্ডবদের শক্তিমত্তা–বুদ্ধিমত্তার মধ্যে দোষ আবিষ্কার করছেন। ধৃতরাষ্ট্র কণিককে বললেন–যেভাবে এদের বাড়বৃদ্ধি ঘটছে, তাতে এদের সঙ্গে ভাব রেখে চলব নাকি এদের সঙ্গে বিবাদ-বিসংবাদে যাব সে বিষয়ে রীতিমতো চিন্তার কারণ ঘটেছে আমার। তোমাকে তাই জিজ্ঞাসা করছি–কী করা যায় বলো তো। তুমি যা বলবে তাই করব–করিষ্যে বচনং তব।
কণিক বললেন–মহারাজ! আপনি পরামর্শ চাইছেন, সে পরামর্শ আমি নিশ্চয় দেব। রাজনীতির সমস্ত রহস্যই আপনাকে জানাব। কিন্তু মহারাজ রাজনীতিশাস্ত্রের উপদেশ মোটেই মধুর নয়। বরঞ্চ তীক্ষ্ণ। অতএব সেই তীক্ষ্মতার কথা শুনে আপনি যেন আমার ওপর আবার অসূয়া করবেন না। যদি বলেন–স্বভাব-কোমল ব্রাহ্মণ হয়েও এমন তীক্ষ্ণ উপদেশ শোনালে দোষ তো তাকে দেবই, তাহলে জানাই–আমি আপনাকে যা বলব তা আমার ব্যক্তিগত কোনও মত নয়। রাজনীতি শাস্ত্রের যা নির্দেশ, তাই আপনাকে জানাব এবং সে নির্দেশ দাঁড়িয়ে আছে। রাজনীতির দর্শনের ওপর। সে দর্শনাটাই তীক্ষ্ণ–উবাচ বচনং তীক্ষং রাজশাস্ত্রার্থদর্শনম। অতএব আপনি যেন আমার গুণে আবার দোষ আবিষ্কার না করেন–ন মেভ্যসূয়া কর্তব্য।
