দেবী-ভাগবত পুরাণের বর্ণনা মতো তখন দৈত্যদের অধিপতি ছিলেন বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ। তার রাজত্বকালে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য একবার তপস্যা করতে গেলে দেবতারা দেবগুরু বৃহস্পতিকে পাঠালেন দৈত্যদের সঙ্গে ছলনা করতে। দেবগুরু শুক্রাচার্যের রূপ ধরে দৈত্যদের বিশ্বাস উৎপাদন করে নিলেন প্রথমে। তারপর তাদের নানা ভুল শিক্ষা দিলেন বছরের পর বছর। তপস্যা সেরে স্বয়ং শুক্রাচার্য যখন ফিরে এলেন তখন দৈত্যরা তাকে মানতেই চাইলেন না। যা হোক, শেষ পর্যন্ত শুক্রাচার্য নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন এবং দৈত্যরা সেই জোরে আবারও লিপ্ত হল সংগ্রামে। পৌরাণিক সংখ্যায় এই যুদ্ধ হয়েছিল সম্পূর্ণ একশো বছর ধরে এবং প্রহ্লাদ প্রথমে ভেবেছিলেন–যুদ্ধে আর জেতা যাবে না। কিন্তু দৈত্য-প্রধানেরা সাহস দিয়ে বললেন, দেখুন মহারাজ, জয়-পরাজয় অদৃষ্টের খেলা। অদৃষ্ট কেউ দেখেনি, কে সেই অদৃষ্ট নির্মাণ করে তাও জানি না–কেন দৃষ্টং ক বা দৃষ্টং কীদৃশং কেন নির্মিত। কাজেই আরও একবার যুদ্ধে যাব–যা হবার তা হোক।
একশো বছর নাই হোক, শত সংখ্যার গৌরবে অন্তত কয়েক বছর যুদ্ধ তো হয়েইছিল এবং শেষমেশ প্রহ্লাদের দল শুক্রাচার্যের কল্যাণে জিতে নিলেন দেবতাদের। ভীত সন্ত্রস্ত দেবতারা তখন আশ্রয় নিলেন মহামায়া চণ্ডিকার কাছে। তাকে স্তব করে তুষ্ট করলেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র। সিংহবাহিনী দেবী দেবতাদের আর্ত প্রার্থনা শুনে দেখা দিলেন এবং বললেন, ভয় পেয়ো না তোমরা। এই আমি যাচ্ছি, তোমাদের যাতে শুভ হয়, আমি সেই চেষ্টাই করব–ভয়ং ত্যজন্তু ভো দেবাঃ শং বিধাস্যে কিলাধুনা। দেবতাদের আশ্বাস দিয়েই সিংহারূঢ়াতি সুন্দরী দেবী প্রহ্লাদ এবং তার দৈত্য সেনাপতিদের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। প্রহ্লাদ এবং তার দল-বল সবাই একটু ভয়ই পেলেন। তবুও মুহূর্তের মধ্যে সামলে নিয়ে প্রহ্লাদ বললেন, পালিয়ে যাবার কোনও কারণ নেই। দরকার হলে যুদ্ধ করব। ইনি অবশ্যই উপস্থিত হয়েছেন দেবতাদের রক্ষা করার জন্য। কিন্তু তবু আমরা পালাব না–যোদ্ধব্যং নাথ গন্তব্যং পলায্য দানবোত্তমাঃ। তোমরা ভয় পেয়ো না। আমি এখন এই ত্রিভুবন-পূজা মহামায়ার স্তুতি করব, কারণ তিনি সবার জননী এবং ভক্তদের তিনি সব সময় দেখেন–সর্বেষাং জননীং শক্তিং ভক্তানামভয়ঙ্করীম্।
খানিকক্ষণ স্তব করেই প্রহ্লাদ কিন্তু দেবীর কাছে দৈত্য-দানবদের চিরকালের সমস্যাগুলি অত্যন্ত সযৌক্তিকভাবে নিবেদন করতে আরম্ভ করলেন। বললেন, শত কোটি প্রণাম জানিয়েই তোমাকে বলছি মা। দেবতা কি দানব-তাতে তোমার কী যা, আসে মা? ছেলেরা ভালই হোক আর মন্দ, তুমি মা হয়ে ভিন্ন দৃষ্টিতে তাদের দেখবে কী করে–মাতুঃ পুত্ৰেযু কো ভেদো’ পশুভেযু শুভেষু চ? দেবতারা যেমন তোমার ছেলে, আমরাও তো তেমনই। তুমি না। বিশ্বজননী! তা তুমি যদি বল-তোরা অসুরেরা বড় স্বার্থপর, নিজেরটা ছাড়া কারোরটা বুঝিস না, তাহলে বলি মা, আমরা যেমন স্বার্থপর, দেবতারাও তেমনই স্বার্থপর-তেপি স্বার্থপরা নূনং তথৈব বয়মপত। যদি বল–তোরা দিন-রাত ভোগ-সুখ আর কামিনী-কাঞ্চন নিয়ে আছিস, তাহলে বলব–দেবতারাও ওই নিয়েই আছে। তারাও বৈষয়িক সুখ-ভোগে মত্ত আছে, আমরাও আছি। তাহলেই দেখ–দেবতা আর অসুরে আদতে কোনও ভেদই নেই, তবুও যে তোমরা এরকম একটা ভেবে যাচ্ছ–ওরা ভাল, এরা খারাপ–এই ধারণাটা একেবারে ভুল গো জননী, এই ভেদটা তোমাদের মোহ–নান্তরং দৈত্য-সুরয়োর্ভেদো’য়ং মোহসম্ভব।
বিশ্বজননী চণ্ডিকার কাছে প্রহ্লাদ আজকে আর কিছু লুকোতে চান না। প্রহ্লাদ জানেন–স্বার্থপর, দোষী, ভোগী–এই কথাগুলি নিতান্তই সাধারণীকরণের মাত্রা। এতে কিছুই প্রতিপন্ন হয় না। তবু এই পদ্ধতিতেই তিনি সমস্ত ব্যাপারটা আরও একটু ফিলসফাইজ’ করে দিলেন-কারণ পরমেশ্বরী চণ্ডিকা পূর্বাহ্নেই দেবতাদের আর্তি শুনে এসেছেন, তার মনটাও এখনও দেবতাদের ব্যাপারে করুণাঘন হয়ে আছে। অতএব সাধারণীকরণের পদ্ধতিই আপাতত যুক্তিযুক্ত।
তার মধ্যে প্রহ্লাদ পরম বিষ্ণুভক্ত, বেদ-বেদান্ত, দর্শন তার ভালই জানা আছে। তিনি তাই একেবারে দার্শনিক যুক্তি সাজিয়ে বললেন, দেখ মা! দেবতারাও প্রজাপতি কাশ্যপের বংশধর, দৈত্য-দানবেরাও তাই। আমাদের মধ্যে তো কোনও বিরোধই থাকবার কথা নয়। তবে আমাদের ওপরেই কেন এই বিরুদ্ধ ভাব, মা জননী! তুমি অসুর আর দেবতাদের মধ্যে সাম্যভাব দেখাও, বিশ্বজননীকে সেটাই যে মানায়। দেখ মা, সত্ত্ব, রজঃ আর তমোগুণের ইতরবিশেষে দেবতা, অসুর–সবারই জন্ম হয়েছে, দেহধারী জীব মাত্রেই কাম, ক্রোধ, লোভ আছে, থাকবে। সেখানে তুমি দেবতাদের মধ্যেই শুধু গুণ দেখতে পাবে–এ কথাটা কেমন হল মা-গুণান্বিতা ভবেয়ুস্তে কথং দেবভূতোমরা?
প্রহ্লাদ এবার অভিমান করে বললেন, আমার তো মনে হয়, মা-যুদ্ধ দেখতে তোমার ভাল লাগে, তাই তুমি তোমার কৌতুকের সাধ পূরণ করার জন্য আমাদের মধ্যে এমন বিরোধ বাধিয়ে রেখেছ–ত্বয়া মিথথা বিরোধোয়ং কল্পিতঃ কিল কৌতুকাৎ। বাস্তবিক তোমার যদি ঝগড়া দেখতে ভাল না লাগত, তাহলে ভাইতে ভাইতে এমন বিরোধ লেগে থাকবে কেন? তোমার ইচ্ছেতেই এমনটি ঘটছে। প্রহ্লাদ এবার চরম আত্মবিশ্বাস নিয়ে দেবীকে বললেন, ধর্মের তত্ত্ব আমার কিছু জানা আছে মা—জানামি ধর্মং ধর্মজ্ঞে–আর ইন্দ্রকেও আমি ভালমতো জানি। কিন্তু শুধু বিষয়-আশয় নিয়ে আমাদের মধ্যে ঝগড়া লেগে রয়েছে সব সময়। তা এই তিন ভুবনের ভার তো মা তোমার হাতে, তুমি সবাইকেই শাসন করতে পার। কিন্তু বিষয়-লালসার সওয়াল যেখানে, সেখানে কোন পণ্ডিত কথা রাখে, তুমিই বল মা?
