বস্তুত সৌবীর যে কোনও যবন-রাজার নাম তা মনে হয় না। সিদ্ধান্তবাগীশের অনুবাদ সৌবীর নামক যবনরাজকে–আমাদের কাছে যুক্তিসঙ্গত নয়। মহাভারতে সিন্ধুদেশের সঙ্গে সৌবীর শব্দটি এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়েছে বারবার। মহারাজ শা, তিনি কাশীরাজনন্দিনী অম্বার প্রণয়প্রার্থী ছিলেন, তিনি সিন্ধু-সৌবীর দেশের অধিপতি ছিলেন বলে মহাভারতে দেখি। অন্যদিকে দুর্যোধনের ভগিনী দুঃশলার সঙ্গে যাঁর বিবাহ হবে, সেই জয়দ্রথকেও সিন্ধু-সৌবীর দেশের অধিপতি বলা হবে মহাভারতে। অর্জুনের এই বিজয়-যাত্রার সময়ে কোনও এক যবনরাজকে সৌবীর বলা হয়েছে বটে, কিন্তু তিনি সৌবীর দেশের মানুষ–এই অর্থই এখানে করা যায়।
আসলে সিন্ধু অঞ্চলের রাজারা চিরকাল অনেক বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন বলেই তারা হয়তো সুবীর নামে বিখ্যাত হয়েছেন। সেই সুবীরদের দেশই সৌবীর। অর্জুনের উত্তর-বিজয়ের সময় অন্তত তিনজন সৌবীর রাজার নাম করা হয়েছে–বিপুল, দামিত্র এবং সুমিত্র। এতে করে আরও মনে হয় সিন্ধু-অঞ্চলে একটি মাত্র রাজার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল না। সিন্ধুদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর্যায়নের বিভিন্ন কল্প শেষ হবার পর এখানে যে সব জনগোষ্ঠীর বীর নায়কেরা এসে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন, আর্যগোষ্ঠীর চোখে তারা যবন বলেই পরিচিত হয়েছেন, যার জন্য সিন্ধু-সৌবীর শব্দের পরিবর্তে কখনও বাহিক কখনও বা সিন্ধু-পুলিন্দকাঃ ইত্যাদি অধম জাতি গোষ্ঠীর নামও সিন্ধু অঞ্চলের রাজাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
ভগবান বুদ্ধের সময়ে সৌবীর দেশের রাজধানী রোরুবক নামে বিখ্যাত হয়েছিল এবং রাজগৃহ-মগধের সঙ্গে সৌবীর দেশের ব্যবসাও চলত ভালভাবে। মহাভারতের সময়েও সিন্ধু-সৌবীর রাজারা তাদের শক্তি এবং পরাক্রমের জন্যই বিখ্যাত ছিলেন। হেউইট সাহেব আবার সৌবীরদের পশ্চিম-ভারতের বেশ পুরাতন এক বিস্তৃত জনগোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ঋগবেদের বাণিজ্য-গোষ্ঠীর প্রতীক পনিদের সঙ্গে যেমন সৌবীরদের একাত্মক করে দেখেছেন হেউইট, তেমনই আধুনিক শৌ বা সওদাগর শব্দ দুটির মধ্যেও সৌবীর শব্দের শেষ পরিণতি লক্ষ্য করেছেন পণ্ডিতেরা।
যাই হোক মহাভারতে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ–এই সবগুলি দিকেই মহাকাব্যের গৌরব অর্জুনের যুদ্ধ অভিযান সূচিত হয়েছে বটে, কিন্তু আসলে সিন্ধু-সৌবীর অঞ্চলেই যে তাঁর। যুদ্ধকৰ্ম প্রধানত কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, সে কথা বোঝা যায় চার-পাঁচটি সৌবীর রাজার সঙ্গে তার মুখোমুখি যুদ্ধের ঘটনা থেকে। দেশ জয় করে যে বিপুল পরিমাণ ধনরাশি অর্জুন কুরুরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছিলেন এবং এতে তার যুদ্ধ–পরিচালনার ক্ষমতা এতটাই স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে–স্বভাবা অগমচ্ছব্দঃ–যে, পৃথিবীতে তাঁর আঁতো ধনুর্ধর দ্বিতীয় নেই–একথা লোক-প্রবাদে পরিণত হয়েছিল–অর্জুনস্য সমো লিকে নাস্তি কশ্চিদ্ ধনুর্ধরঃ। অন্যান্য পাণ্ডবভাইরাও, বিশেষত ভীম, যুধিষ্ঠিরের যৌবরাজ্যের সময়ে বেশ কিছু যুদ্ধজয় করেছিলেন এবং হস্তিনাপুরের রাজ্যসীমাও তাতে বেড়েছিল–পররাষ্ট্রনি নির্জিত স্বরাষ্ট্রং ববৃধুঃ-পুরা।
এ কথা অনেককেই বলতে শুনি যে, যুধিষ্ঠির একেবারেই বোকা-সোকা মানুষ। তাঁর রাজ্য পরিচালনার বুদ্ধি কিছুই নেই এবং শুধু ধর্মবুদ্ধির দ্বারাই তিনি রাজকার্য পরিচালনা করার চেষ্টা করতেন। হ্যাঁ এটা অবশ্যই ঠিক যে, রাজ্য চালনার মতো রাজনৈতিক তথা অর্থশাস্ত্রীয় ব্যাপারে ধর্মবুদ্ধিকে তিনি কখনই বিসর্জন দিতেন না। কিন্তু এই যে তার যৌবরাজ্যকালে তার ভাইরা যুদ্ধ-বিজয়ের মাধ্যমে কুরুরাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ঘটালেন, এতে যুধিষ্ঠিরের ধর্মবুদ্ধির সঙ্গে রাজনৈতিক বুদ্ধিও জড়িত ছিল। ধর্মবুদ্ধি এই জন্য যে, যুদ্ধযাত্রার মতো বিষয়ে, যেখানে প্রতি মুহূর্তে প্রাণহানির আশঙ্কা থেকে যায়, সেখানে তিনি দুর্যোধন-দুঃশাসনের মতো ব্যক্তিকে নিয়োগ করেননি। তিনি যুদ্ধে পাঠিয়েছেন নিজের ভাইদের এবং হয়তো তারা যুদ্ধ যাত্রার অনুমতিও চেয়েছিলেন তারই কাছে।
আর রাজনৈতিক বুদ্ধি এইজন্য যে, তারই যৌবরাজ্যকালে যুদ্ধযাত্রা করে পাণ্ডব-ভাইরা হস্তিনাপুরে নিজেদের গৌরব বাড়িয়ে নিলেন। তারা দেখিয়ে দিলেন যে, প্রয়াত মহারাজ পাণ্ডুর উত্তরাধিকারী হিসেবে তারা যথেষ্টই উপযুক্ত এবং প্রয়োজনের সময় শত্রুর আক্রমণ রোধ করার মানসিক প্রস্তুতি ছাড়াও অপ্রয়োজনেও তারা নিজেদের প্রয়োগ করতে পারেন। হস্তিনাপুরের সমৃদ্ধির জন্য তারা যুদ্ধে নিজেদের জীবনকেও তুচ্ছ করতে পারেন। এই আত্মত্যাগবৃত্তির সঙ্গে পাণ্ডব-ভাইদের শক্তি এবং ক্ষমতার একটা পরীক্ষা হয়ে যাওয়ায় পাণ্ডবদের বিশেষত মহামতি যুধিষ্ঠিরের রাজনৈতিক লাভ হল অনেকটাই। পৌর জনপদবাসীদের মধ্যে পাণ্ডবভাইদের শক্তি একেবারে বিখ্যাত হয়ে পড়ল–ততো বল অতিখ্যাত।
এই খ্যাতিলাভে পাণ্ডবদের রাজনৈতিক লাভ ঘটে গেল বলেই কিন্তু অন্যদিকে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের মন হঠাৎই বিষিয়ে গেল পাণ্ডবদের ওপর–দূষিতঃ সহসা ভাবো ধৃতরাষ্ট্রস্য পাণ্ডুযু। তার ভাবটা এই–যুধিষ্ঠির যৌবরাজ্য লাভ করেছেন এই যথেষ্ট, কিন্তু এত যুদ্ধ জয় করে নিজেদের খ্যাপন করার কী দরকার ছিল! পাণ্ডবদের এই রাজনৈতিক লাভে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এতই দুর্ভাবনা করতে লাগলেন যে, রাত্রে আর তার ঘুম আসে না। নিজের ছেলেরা দুর্যোধন–দুঃশাসন কেন যুদ্ধজয় করে আসেননি, সে কথাও তিনি বলতে পারেন না। কেন না এঁরা যুদ্ধে গেলে ধৃতরাষ্ট্রের আশঙ্কা কিছু থেকেই যেত। কিন্তু পাণ্ডবরা যুদ্ধে জয় লাভ করে কেন এত তাড়াতাড়ি বিখ্যাত হয়ে পড়ল–সেই চিন্তা যেমন তাকে ঈর্ষান্বিত করে তুলল, তেমনি তিনি ভাবতে লাগলেন যে, পাণ্ডবদের এই শক্তি-পরাক্রম যদি উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকে, তবে তার পুত্রদের সঙ্গে তাঁর নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। পুত্র এবং তাঁর নিজের স্বার্থে তার মন বিষিয়ে গেল পাণ্ডবদের ওপর। দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা তার রাতের ঘুম কেড়ে নিল–স চিন্তাপরমো রাজা ন নিদ্ৰামলভন্নিশি।
