হৃত রাজ্যের অর্ধেকটা উদ্ধার হল বটে, কিন্তু সেটা দ্রোণাচার্যের দয়ায় উদ্ধার হওয়ায় দ্রুপদের মনে কোনও সুখ রইল না। তিনি কাম্পিল্যে ফিরে গিয়ে পাঞ্চাল শাসন করতে আরম্ভ করলেন বটে, কিন্তু তার অন্তরে জেগে রইল গভীর দুঃখ–সোধ্যাবস দীনমনাঃ কাস্পিল্যঞ্চ পুরোত্তমম্। এক নতুন জটিলতাও তার হৃদয় অধিকার করল। বারবারই তার মনে হতে লাগল–দ্রোণাচার্য শুধু বামুন বলে তার ব্রাহ্মশক্তিতে দ্রুপদকে পরাভূত করেছেন। ক্ষত্রিয়ের পরাক্রম কোনও কাজে লাগল না এবং হয়তো ক্ষত্রিয়ের ভুজবলে তাকে পরাভূত করা যাবে না–ক্ষাত্রেণ চ বলেনাস্য নাপশ্যৎ স পরাজয়। তিনি ভাবলেন–অলৌকিক ব্রাহ্মশক্তিতেই দ্রোণাচার্যকে শেষ করবেন তিনি। দ্রুপদ এখন একটি পুত্র চান, যে পুত্র জন্মাবে যাগ-যজ্ঞের অলৌকিক সাধনে। দ্রুপদ রাজধানী থেকে বেরিয়ে পড়লেন একজন উপযুক্ত যাজকের সন্ধানে–পুত্রজন্ম পরীহ্মন্ বৈ পৃথ্বীমনুচচার হ। এমন একজন যাজক, যিনি মন্ত্রবলে দেবতার আহ্বান করবেন এবং সেই যজ্ঞের শক্তিতেই জন্ম নেবে দ্রোণ-ঘাতক পুত্র। দ্রুপদ মনে মনে দ্রোণকে হত্যা করে ফেলেছেন, এখন তিনি কার্যক্ষেত্রে দ্রোণ-হত্যার জন্য একটি অলৌকিক শক্তিধর পুত্র চান।
১১০. দ্রোণাচার্য আর দ্রুপদের হিংসা-প্রতিহিংসার কাহিনী
১১০.
মহাভারতের কবি বেশ ভারী বর্ণনা দিয়ে দ্রোণাচার্য আর দ্রুপদের হিংসা-প্রতিহিংসার কাহিনী শোনালেন বটে কিন্তু এই বর্ণনার পিছনে তার অন্তত তিনটি উদ্দেশ্য আছে। এক, দ্রোণাচার্য ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি গ্রহণ করেছেন এবং যেহেতু ক্ষত্রিয়োচিত সুখ–সমৃদ্ধি তথা রাজ্যলাভে তিনি যথেষ্টই আসক্ত ছিলেন, সেই আসক্তি তার ফলবতী হল বাল্যবন্ধুর রাজ্য গ্রাস করে। দ্রোণাচার্য রাজা হলেন এতদিনে। তার এতদিনের অন্নকষ্ট এবং অর্থকষ্ট নির্মল হল রাজকীয়তার পরিণতিতে।
দুই, দ্রোণ-দ্রুপদ দুজনেই কুরুবাড়ির বাইরের লোক। কিন্তু দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরের রাজপুত্রদের শিক্ষকতার ভার নিয়ে কুরুবাড়ির বৃদ্ধদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করলেন এবং তার ফল হল এই কুরুবাড়ির মানুষেরা দ্রোণাচার্যের একান্ত নিজস্ব সমস্যাকে রাজনৈতিকতায় পর্যবসিত করলেন। দুটি বাইরের লোকের হিংসা-প্রতিহিংসার হল–কর্ষিত ভবিষ্যতের ভূমিতে ভারতযুদ্ধের বীজ প্রোথিত হল।
তিন, দ্রোণ-দ্রুপদের আগন্তুক ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্ব নির্ণয় করেও মহাভারতের কবি তাঁর প্রিয় নায়ককে ভোলেননি। তিনি অর্জুন। কুরুবাড়ির রাজকুমারদের শিক্ষা প্রসঙ্গেই দ্রোণাচার্যের কথা এসেছিল, এবং সেই প্রসঙ্গে এসেছিল পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কথা। কিন্তু এই দুই আগন্তুকের কাহিনীর প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কবি একটি অসাধারণ মন্তব্য করেছেন। বলেছেন–এই যে রম্য জনপদযুক্ত অহিচ্ছত্রা নগরীতে দ্রোণাচার্য তাঁর রাজ্যাধিকার লাভ করলেন, সেই রাজ্যটা কিন্তু আসলে পাণ্ডব অর্জুনই জিতে নিয়ে দিয়েছে তার গুরুকে–যুধি নির্জিত্য পার্থেন দ্রোণায় প্রতিপাদিতা। অর্থাৎ দ্রোণাচার্য এতক্ষণ যে দ্রুপদের দর্পচূর্ণ করে–অর্ধেক রাজ্য তোমার থাক আর অর্ধেক আমার–অনেক বড় বড় কথা বললেন, সেই রাজ্য জেতার নায়ক কিন্তু তিনি নন, সেই রাজ্য জিতে দিয়েছেন মহাভারতের কবির নায়ক অর্জুন।
দ্রোণ-দ্রুপদের এই হিংসাহিংসি বন্ধ হবার পর ঠিক এক বছর সময় চলে গেল। পাণ্ডবরা যেভাবে অস্ত্র শিক্ষা পেয়েছেন এবং যেভাবে তাদের বিনয়-নীতির শিক্ষা ঘটেছে, তাতে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন তাদের ওপর। বিশেষত জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের নীতি এবং ধর্মবোধ, বিনয় এবং নম্রতা তথা বুদ্ধি এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা ধৃতরাষ্ট্রকে মুগ্ধ করেছিল। তাই সব দিক বিবেচনা করে যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজ পদে অভিষেক করলেন ধৃতরাষ্ট্র। যৌবরাজ্য লাভ করে যুধিষ্ঠির এমনভাবেই রাজকার্যে সহায়তা করতে লাগলেন, যাতে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে এবং সেই সুনাম তাঁর পিতা পাণ্ডুর খ্যাতিও ম্লান করে দিল–পিতুরন্তর্দধে কীর্তিং শীলবৃত্ত-সমন্বিতঃ।
ভীম-অর্জুনও চুপ করে বসে ছিলেন না। জ্যেষ্ঠ পাণ্ডবের ভবিষ্যৎ রাজ্যলাভ প্রায় স্বীকৃত হয়ে যাওয়ায় ভীম-অর্জুনের কিছু নিশ্চিন্ততাও ছিল। সেই নিশ্চিন্ততার সুযোগ নিয়ে তারা নিজেদের আরও সুশিক্ষিত করে তুললেন। ভীম যতখানি গদাযুদ্ধ শিখেছিলেন, তা নেহাত কম কিছু নয়, কিন্তু গদাবিদ্যার উচ্চতর পাঠ গ্রহণের জন্য তিনি চলে গেলেন কৃষ্ণ–জ্যেষ্ঠ বলরামের কাছে। সেকালের দিনে গদাযুদ্ধে যারা পরম পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন, তাদের মধ্যে বলরাম ছিলেন প্রধানতম। ভীম তার কাছে গদাযুদ্ধের বহুতর পাঠ নিয়ে এলেন।
অন্যদিকে অর্জুন, যিনি ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হিসেবে চিহ্নিত হবেন, তিনি চলে গেলেন যুদ্ধে। অর্জুনের আর কিছু শিক্ষণীয় ছিল না। যা তার প্রয়োজন ছিল, তা হল অভ্যাস। আর যুদ্ধ, নিরন্তর যুদ্ধই ছিল তাঁর শিক্ষা-সম্পূর্ণতার সোপান। হস্তিনাপুরের উত্তরদিকে যে সব রাজারা হস্তিনাপুরকে কর দিত না, অর্জুন তাদের শিক্ষা দিতে রওনা হলেন। উত্তর দিকের যোদ্ধা রাজাদের মধ্যে যবনরাজ সৌবীর ছিলেন ভয়ঙ্কর শক্তিশালী। মহারাজ পাণ্ডুও তাকে শায়েস্তা করতে পারেননিন শোক বশে কর্তৃং যং পাণ্ডুরপি বীর্যবান। অর্জুন সেই সৌবীর যবনরাজকে হত্যা করলেন অবলীলায়।
