মহারাজ দ্রুপদ এই বিপন্ন অবস্থায় শত্রুর রথে তরবারি উঁচিয়ে থাকা এক বীর যুবকের কথা শুনে মনে মনে আপ্লুত হলেন নিশ্চয়। এই অসাধারণ বীরকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করে রাখলেন। বীর যুবকের কাছে পরাজিত হওয়ার লাঞ্ছনা ভুলে একবারের তরে অন্তত ওই কৃষ্ণবর্ণ যোদ্ধার দিকে আপ্লুত চক্ষু প্রসারণ করলেন মহারাজ দ্রুপদ। এই ছেলেটিকে তিনি মনে রেখে দিলেন।
অর্জুন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে জীবিত ধরে নিয়ে আসছেন দেখে দ্রুপদের প্রধানমন্ত্রীও তার সঙ্গে সঙ্গে এলেন। রাজার অস্তিত্ব না থাকলে তার মন্ত্রী-অমাত্যের অস্তিত্ব থাকে না। অতএব রাজা ধরা পড়বার সঙ্গে সঙ্গে সপ্তাঙ্গ রাজ্যের দ্বিতীয় অঙ্গ মন্ত্রীও স্বেচ্ছায় এলেন দ্রুপদের সঙ্গে। অর্জুন সেই অমাত্য-সহ দ্রুপদকে জীবিত অবস্থায় নিবেদন করলেন গুরু দ্রোণাচার্যের পায়ে–উপাজহঃ সহামাত্যং দ্রোণায় ভারতৰ্ষভ।
দ্রুপদের রাজ-অহংকারের সামান্যও অবশিষ্ট নেই এখন, রাজ্য-সম্পত্তি এই মুহূর্তেই হৃত হতে পারে, তার মধ্যে তিনি শত্রুর হাতে ধরা পড়েছেন। যিনি এককালে বাল্যবন্ধু দ্রোণাচার্যকে বন্ধু বলতে রাজি হননি, এখন তিনি অত্যন্ত হীন অবস্থায় সেই বন্ধুর পায়ে নিবেদিত। তার সমস্ত কিছু নির্ভর করছে বৃদ্ধ দ্রোণাচার্যের ওপর। দ্রোণাচার্য কিছু ভোলননি। যে অপমান সহ্য করে পুত্র–পরিবার সহ পাঞ্চাল রাজ্য থেকে চলে এসেছিলেন, সেই অপমান মাথায় রেখেই তিনি বললেন–আমি আমার শক্তিতে তোমার রাজ্য বিধ্বস্ত করে তোমার রাজধানীও দখল করে নিয়েছি। তোমার জীবন থাকবে কি না থাকবে, তাও এখন নির্ভর করছে আমার ইচ্ছের ওপর। ভেবে দেখ তো–অন্তত এখন তুমি আমাকে বন্ধু বলে স্বীকার করতে পার কিনা–প্রাপ্য জীবং রিপুবশং সখিপূর্বং কিমিষ্যতে।
দ্রোণাচার্য এবার একটু নাটুকে হাসি হেসে বললেন–প্রাণের ভয়ে ভীত হয়ো না, দ্রুপদ! আমরা বামুন মানুষ। ক্ষমাই আমাদের ধর্ম–মা ভৈঃ প্রাণভয়াদ বীর ক্ষমিণণা ব্রাহ্মণা বয়ম্। ছোটবেলায় পিতার আশ্রমে একসঙ্গে খেলা করেছি তোমার সঙ্গে, কাজেই তোমার ওপর স্নেহ-প্রীতি কিছু কম নেই আমার। দ্রোণাচার্য এবার দ্রুপদের পূর্ব-অপমান ফিরিয়ে দিয়ে বললেন–তবে কিনা তুমি বলেছিলে–রাজা ছাড়া রাজার বন্ধু হতে পারে না। তাই আমাকে একটু রাজা হওয়ার ব্যবস্থা করতেই হল–তস্মাৎ প্রযতিতং রাজ্যে–এখন মুশকিল হল, তোমারও তো কোনও রাজ্য নেই এখন। তো তুমিই যদি রাজা না হও, তাহলে তোমার সঙ্গেই বা আমার বন্ধুত্ব থাকে কী করে? আর ঠিক সেই জন্যই আমি তোমাকে তোমার অর্ধেক রাজ্য ফিরিয়ে দেব–রাজ্যস্যামবাপ্লহি। হাজার হোক, তুমি আমার বন্ধু ছিলে, তোমার সঙ্গে সেই বন্ধুত্বই আমি ফিরে পেতে চাই–প্রার্থয়েয়ং ত্বয়া সখ্যং পুনরেব জনাধিপ।
পাঞ্চাল রাজ্যের কোন অর্ধেক দ্রুপদ পাবেন আর কোন অর্ধেক দ্রোণাচার্য নিজের জন্য রাখবেন সে সম্বন্ধেও নিজের টার্ম ডিকটেটকরলেন দ্রোণাচার্য। বললেন–গঙ্গার দক্ষিণ দিকে রাজা থাকবে তুমি, আর গঙ্গার উত্তরাঞ্চলে রাজা হব আমি–রাজাসি দক্ষিণে কূলে ভাগীরথ্যাহমুত্তরে। এইভাবেই আমার বন্ধু হলে তুমি। দ্রুপদ একেবারে নিরুপায়। শত্রুর হাতে তিনি বন্দী হয়েছেন। অতএব তার হৃদয় ক্রোবজর্জর হলেও দ্রোণকে দু-চার কথা শুনিয়ে দেবার উপায় নেই তার। সবিনয়ে, নিতান্ত মৌখিকতা বজায় রাখার জন্যই দ্রুপদ বললেন–আপনি মহান ব্যক্তি এবং আপনার অসীম পরাক্রম। আপনি আমাকে আমার রাজ্যের অর্ধেক ফেরত দিয়েছেন, তাতেই আমার সন্তুষ্টি ঘটেছে। আপনার সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব হোক আমার–প্ৰীয়ে ত্বয়াহং ত্বত্তশ্চ প্রীতিমিচ্ছামি শাশ্বতীম্।
দুই পরাক্রমশালী মহাবীরের মধ্যে যদি বিরোধ বাধে এবং তার মধ্যে যদি আবার মর্যাদা, মান, অপমান যুক্ত হয় তবে সেই বিরোধ কখনও মেটে না। চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব তো দূরের কথা। দ্রোণ এই মুহূর্তে দ্রুপদের মৌখিক আচরণেই সন্তুষ্ট হলেন এবং সাদরে তাকে রাজ্যের অর্ধেক ফিরিয়ে দিলেন মহান দাতার মতো।
সুপ্রসিদ্ধ পাঞ্চাল নগরী ভাগ হয়ে গেল। কৌরব বংশের মহারাজ অজমীদের পুত্র পরম্পরায় পাঞ্চাল নগরে যে সুপ্রসিদ্ধ রাজারা রাজত্ব করে গেছেন–সৃঞ্জয়-সোমক ইত্যাদি তারা কিন্তু দক্ষিণ এবং উত্তর পাঞ্চাল দুই-ই ভোগ করেছেন। অজমীঢ়ের দুই ছেলে যে রাজ্য প্রথমে অধিকার করেছিলেন, তার নাম কৃবি, যা পাঞ্চাল-নগরের পূর্ব-নামা কৃবি অধিকার করে ভাগীরথীর দুই কূলে অজমীঢ়ের দুই ছেলে রাজা হন দক্ষিণ এবং উত্তর পাঞ্চালের। দক্ষিণ পাঞ্চালের রাজধানী ছিল কাস্পিল্য এবং তার সঙ্গে আরেক বড় শহর হল মাকন্দী। আর উত্তর পাঞ্চালের রাজধানী হল অহিচ্ছত্র।
দ্রোণ নিজের জন্য রাখলেন অহিচ্ছত্রের অধিকার–অহিচ্ছত্রঞ্চ বিষয়ং দ্রোণঃ সমভিদ্যত। অহিচ্ছত্র উত্তরপ্রদেশের বেরিলি জেলায় অনোলার কাছে এখনকার রামনগর। একটু পৌরাণিক নামে এঁকে ছত্রবতীও বলা হয়। দ্রুপদ রাজা হলেন দক্ষিণ পাঞ্চালে এবং তার রাজধানীর নাম কাস্পিল্য, যা মোটামুটি এখনকার বুদায়ুন এবং ফরুকখাবাদ। মাকন্দী দ্রুপদের অধিকারে ছিল বলে তাঁর রাজত্ব দক্ষিণে চম্বল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল–দক্ষিণাংশ্চাপি পাঞ্চালা যাবচ্চমতী নদী। পাঞ্চালের উত্তরেই কুরুদেশ।
