ঠিক এই সময়েই অর্জুনের কাজ আরম্ভ হল। তার একমাত্র লক্ষ্য দ্রুপদ রাজা এবং তাও জীবিত অবস্থায়। প্রচুর বাণবর্ষণে তিনি একদিকে পাঞ্চালদের হস্তিসৈন্য হ্রাস করতে আরম্ভ করলেন অন্যদিকে দ্রুপদকেও বিদ্ধ করতে আরম্ভ করলেন। সৃঞ্জয়-পাঞ্চালরাও কিছু কম যান না। তাদের যুদ্ধ-নায়কেরাও সিংহনাদ করে অর্জুনকে প্রতিবিদ্ধ করল। অর্জুন আবার সব সহ্য করতে পারেন কিন্তু কারণহীন সিংহনাদ সহ্য করতে পারেন না। সহ্য করলেনও না–সিংহনাদস্বনং ত্বা নামৃষ্যৎ পাকশাসনিঃ। ঘোর যুদ্ধ আরম্ভ হল। অর্জুনের বিশাল বাণজালে সমস্ত পাঞ্চাল–সৈন্য আচ্ছন্ন হল।
অর্জুন দ্রুপদরাজকে জীবিত ধরার প্রয়াসে তার খুব কাছাকাছি চলে এলেন। সিংহ যেমন হাতি ধরে সেই কৌশলে অর্জুন দ্রুপদকে ধরার জন্য এগোতেই সমস্ত পাঞ্চাল সৈন্যমধ্যে হাহাকার রব উঠল–তত হলাহল–শব্দ আসীৎ পাঞ্চালকে বলে। দ্রুপদের ভাই সত্যজিৎ তৈরিই ছিলেন। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন অর্জুনের ওপর। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হল বটে, তবে তিনি শেষরক্ষা করতে পারলেন না, শেষ পর্যন্ত অর্জুনের হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে পালিয়ে গেলেন অন্যত্র। এবার আরম্ভ হল আসল যুদ্ধ দ্রুপদের সঙ্গে অর্জুনের।
দ্রুপদ নিজে যত বড় যোদ্ধাই হোন, অর্জুনের তুলনায় তার বয়স বেশি এবং এতক্ষণ যুদ্ধ করে তিনি ক্লান্ত হওয়ায় অর্জুনের যুদ্ধবেগ তিনি স্তব্ধ করে দিতে পারলেন না। অর্জুন সুতীক্ষ্ণ শরক্ষেপে তার ধনুক কেটে ফেললেন এবং তার সারথি এবং ঘোড়াগুলিকে বিদ্ধ করলেন প্রায় একই সঙ্গে। দ্রুপদের নড়বার পথ রইল না। ধনুক-বাণ ফেলে দিয়ে উন্মুক্ত তরবারি হাতে লাফ দিয়ে নিজের রথ থেকে নেমে পড়লেন অর্জুন এবং এক মুহূর্তের মধ্যে লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন দ্রুপদের রথে। দ্রুপদ রথে নিরস্ত্র অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়েছেন আর অর্জুন তার রথের মাঝখানে তরবারি উঁচিয়ে দাঁড়ালেন রথের ঈষাটি ধরে। রথের ঈষা হল রথের চাকা দুটি যে বৃহৎ কাষ্ঠটির সঙ্গে আটকানো থাকে সেটা। অর্থাৎ নিজে রথ চালিয়ে পালানোর একমাত্র পথটিও দ্রুপদের বন্ধ হয়ে গেল। রথের ঈষা ধরে থাকলে রথ চলবেই না। এই প্রথম উন্মুক্ত কৃপাণ হাতে একবার বীরোচিত সিংহনাদ করলেন অর্জুন।
দেশের রাজা তথা প্রধান যোদ্ধা এইভাবে বাঁধা পড়বার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুপদের সৈন্যেরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে লাগল। পুরাকালে গরুড় যেমন মহাসমুদ্র আলোড়িত করে সর্পরাজকে ধরেছিলেন, অর্জুনও তেমনি পাঞ্চালদের সৈন্য-সমুদ্র বিক্ষুব্ধ করে দ্রুপদকে ধরে ফেললেন–বিক্ষোভ্যাম্ভোনিধিং তাéস্তং নাগমিব সোগ্রহীৎ। অর্জুন এবার জীবিত দ্রুপদকে নিয়ে খঙ্গ হাতে বেরিয়ে চললেন রণক্ষেত্র থেকে। বেরিয়ে যেতে যেতে দেখলেন–মহাবীর ভীমসেন তখনও সৈন্য বিতাড়ণে রত এবং তিনি দ্রুপদ রাজার রাজধানী একেবারে তছনছ করে দিচ্ছেন। তার এই ধ্বংস–প্রয়াসে তার সহায় হয়েছেন অন্যান্য রাজকুমারেরা–মমৃদুস্তস্য নগরং দ্রুপদস্য মহাত্মনঃ।
দ্রোণাচার্যের প্রথম অস্ত্র পরীক্ষাকালে যে মহাবীর শুধু বৃক্ষস্থিত পক্ষীটির মাথাটুকুই দেখতে পাচ্ছিলেন, আর কিছু নয়, এখানে এই বিরাট রণক্ষেত্রেও তার নীতি–নিয়ম একই রকম আছে। তার লক্ষ্য ছিল শুধু দ্রুপদকে জীবিত ধরা, আর কিছু নয়। দ্রুপদকে জীবিত ধরার পর তার সৈন্য–শাতন করা বা তার নগর বিমর্দন করা তার লক্ষ্যও নয়, উপলক্ষ্যও নয়। কিন্তু ভীম এমনই একজন উত্তেজনাপ্রবণ ব্যক্তি যিনি যুদ্ধ আরম্ভ করে ফল পেলে আর থামতে পারেন না। ক্রমাগত তার আক্রোশ বেড়েই চলে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দ্রুপদকে নিয়ে যেতে যেতে অর্জুন যখন দেখলেন–ভীম ভয়ঙ্করভাবে পাঞ্চাল–নগর ধ্বংস করতে উদ্যত তখন তিনি হাত তুলে ভীমকে বারণ করে বললেন–দাদা আমার! আপনি মনে রাখবেন–ভারতবর্ষীয় রাজকুলের মধ্যে অতিমান্য দ্রুপদ রাজা কিন্তু কুরুবাড়ির রাজাদের পরম আত্মীয়-সম্বন্ধী কুরুবীরাণাং দ্রুপদো রাজসত্তমঃ গুরু আমাদের কাছে দক্ষিণা চেয়েছেন, সে কাজ আমাজের সম্পূর্ণ। আপনি শুধু শুধু দ্রুপদের সৈন্য–ধ্বংস করবেন না–মা বধীস্তদবলং ভীম গুরুদানং প্রদীয়তাম।
পরিশীলিত ক্ষাত্র রাজশক্তি অপরিশীলিত ক্ষাত্র শক্তির রাশ টেনে ধরল, কারণ তার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। মহাবীর ভীমের অন্তরে যুদ্ধের বেগ এসে গিয়েছিল। তিনি নিজে সে বেগ সংযত করতে পারছিলেন না; কিন্তু ছোট ভাই হলেও অর্জুনের এই অনুরোধের মধ্যে এমনই এক ব্যক্তিত্বময় আদেশ লুকিয়ে আছে, যা না মেনে পারা যায় না। ভীম তার প্রারব্ধ যুদ্ধ-সরসতায় অতৃপ্ত থেকে গেলেন কিন্তু অর্জুনের মেঘগম্ভীর স্বল্পবাক্য অনুরোধ মেনে তাকে ফিরে আসতেই হল–অতৃপ্তে যুদ্ধ-ধর্মেযু ন্যবৰ্তত মহাবলঃ।
অর্জুনের মিত-সার বাক্যের মধ্যে শুধু ভীমের প্রতি গম্ভীর এক নির্দেশ ছিল, তাই শুধু নয়, ওই অল্প কটি কথা বলে তিনি বিজিত এবং নিজের হাতে আবদ্ধ শত্রুর প্রতি চরম সম্মান জানিয়েছেন। দ্রুপদের সামনে খঙ্গ উঁচিয়ে রেখেও তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, হঠাৎ এই আকস্মিক আক্রমণের দায় তার নিজের নয়। দ্রুপদকে তিনি শত্রু তো মনে করেনই না, বরঞ্চ কুরুবীরদের পরম সম্মানিত আত্মীয় বলে মনে করেন। তবু যে তাকে যুদ্ধ জয় করতে হয়েছে। এর মধ্যে তার আপন শত্রুতার কোনও চরিতার্থতা নেই, তিনি তার গুরুর আজ্ঞাবাহীমাত্র। গুরুর শত্রুতা মেটানোর জন্যই যে তিনি নিজে থেকে যুদ্ধে নেমেছেন, তাও নয় তাঁকে গুরুদক্ষিণা দেবার জন্য এই অদ্ভুত অভিযানে প্রবৃত্ত হতে হয়েছে। একটি মাত্র পংক্তি, তাও ভীমের উদ্দেশে ব্যবহার করে, অর্জুন বুঝিয়ে দিতে চাইলেন যে, জীবনের প্রথম গুরুদক্ষিণার দায় এমনই যে, তার অনিচ্ছা থাকলেও গুরুর কারণেই তাকে যুদ্ধে নামতে হয়েছে। নইলে তিনি কুরুবংশের ইতিহাস-বিস্মৃত কোনও অধম ব্যক্তি নন। অর্জুন জানেন–পাঞ্চাল-সৃঞ্জয়রা প্রসিদ্ধ কুরুবংশেরই এক শাখা। নানা কারণে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সামাজিক বিরোধ ঘটলেও তাঁদের প্রতি আত্মীয়তা ভুলে যাননি অর্জুন। দ্রুপদকে তিনি হারিয়ে দিয়েও তাঁকে মর্যাদা দিয়েছেন রাজসত্তম বলে, পরম আত্মীয় বলে।
