রাজরোষের সঙ্গে জনরোষ মিশে যাওয়ায় কৌরব রাজপুত্ররা প্রমাদ গণলেন। কৌরব সৈন্যদের মধ্যে আর্ত চিৎকার শোনা গেল। কেউ কেউ বা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়েও যাচ্ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আধ ক্রোশ দূরে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের যুদ্ধনায়ক অর্জুন বুঝলেন–সময় হয়েছে। বুঝলেন–দুর্যোধন-দুঃশাসনরা পারেননি কিছু করতে, পারেননি কর্ণ। তাদের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, পাঞ্চাল নগরবাসীরা পর্যন্ত তাদের পিছনে ধাওয়া করেছে, এবং প্রায় চেঁচিয়ে তাড়াচ্ছে তাদের। ধাওয়া করতে করতে তারা মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আধ ক্রোশ পথও চলে এসেছে এবং সেখানে পাণ্ডবদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা বেশ খানিকটা গালাগালিও দিয়ে গেল পাণ্ডবদের। নেহাত পাণ্ডবরা কোনও অস্ত্রচালনা করেননি বলে তারাও বেশি কিছু না করে শুধু কৌরবদের তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে পাণ্ডবদের গালাগালি দিয়ে চলে গেল–দ্রবন্তি সম নদন্তি স্ম ক্রোশন্তঃ পাণ্ডবান্ প্রতি।
কৌরবদের আর্ত চিৎকারে অর্জুন সচেতন হলেন। বুঝলেন–এইবার যাবার সময় হয়েছে। তিনি গুরু দ্রোণাচার্যকে অভিবাদন জানালেন। দাদা যুধিষ্ঠিরের পায়ে হাত দিয়ে বললেন—আপনাকে আর যেতে হবে না, দাদা! আপনি এখানেই থাকুন। আমরা যা করার করছি।
কথাটা নতুন কিছু নয়। যুধিষ্ঠিকে সারা জীবনই এইরকম তোলা-তোলা করে রেখেছেন অর্জুন। রাশভারী তত্ত্বজ্ঞ জ্যেষ্ঠকে তিনি চিরকাল বৃদ্ধ পিতাটির মতো দেখেছেন এবং জীবনের এই প্রথম যুদ্ধ থেকেই যুধিষ্ঠিরকে সেইভাবেই অভ্যস্ত করেছেন অর্জুন। অতএব এই মুহূর্তে প্রায় আদেশের মতো করে–আপনাকে যুদ্ধে যেতে হবে না–মা যুধ্যস্ব–এমনটি বলে পাঞ্চালদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হলেন অর্জুন। কুরুবাড়ির জ্ঞাতি–গোষ্ঠীর মধ্যে তখনও অখণ্ডতা ছিল বলে পালিয়ে যাওয়া সৈন্য-সামন্তরা আরও একবার নতুন নায়কের সঙ্গে জড় হয়ে গেল। অর্জুন নকুল এবং সহদেবকে রাখলেন নিজের দুই পাশে, যাতে তিনি ভয়ঙ্কর যুদ্ধে ব্যস্ত থাকলে দুই ভাই তার রথ-অশ্ব এবং সারথিকে পরপক্ষের আকস্মিক আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারে। সমস্ত সৈন্য-সামন্তকে পিছনে নিয়ে আগে আগে চললেন মহাবীর ভীমসেন। তার হাতে বিশাল আয়সী গদা-সেনাগ্রগো ভীমসেনঃ সদা ভূদয়া সহ। সমস্ত সেনার সামনে এই মহাবীর থাকলে অনুগামী সৈন্য-সামন্তের যেমন মনোবল বাড়ে, তেমনি শত্রুপক্ষের বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ণ হয়।
পাঞ্চাল-রাজের সঙ্গে যুদ্ধ করার সময় যুধিষ্ঠিরকে যেভাবে স্থির রেখে অর্জুন তিন ভাইকে নিয়ে চললেন–এর মধ্যে মহাভারতের নায়কের চিত্র পাওয়া যায়। সেই ফরাসি বিদূষী মাদাম বিয়ার্দোর কথা মনে আছে তো? তাঁর গবেষণা মাথায় রাখলে এই যুদ্ধ-গমনের চিত্রকে রীতিমতো দার্শনিক দৃষ্টিতে তথা চাতুর্বর্ণের ব্যাখ্যায় ব্যাখ্যা করা যায়। ধর্মের প্রতীক যুধিষ্ঠির কখনও যুদ্ধ করেন না। তিনি ব্রাহ্ম-শক্তি। অর্জুন তাকে সিংহাসনে স্থির বসিয়ে রাখেন, আর তারই নীতিজ্ঞতা অনুসরণ করে পরিশীলিত ক্ষাত্র-শক্তির প্রতীক অর্জুন যুদ্ধে চললেন নায়কের মতে, রাজার মতো। শুধু পরিশীলিত ক্ষাত্র-শক্তি দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। তার জন্য চাই ক্রুডআনরিফাইনড় রঅর্থাৎ নির্মম ক্ষাত্র-শক্তি। ভীমসেন তারই প্রতীক। অপরিশীলিত ক্ষাত্র শক্তি সকারণে ব্যবহৃত হলেও তার নিয়ন্ত্রণ থাকে পরিশীলিত ক্ষাত্র শক্তির হাতে। অর্জুন সেই নিয়ন্তা। বয়সে বড় হলেও নিয়ন্তা অর্জুন ভীমের রাশ টেনে ধরবেন। সময়মতো আবার প্রয়োজনে ব্যবহারও করবেন তাঁকে। আর নকুল-সহদেব বৈশ্য-শূদ্রের প্রতীকী আচরণে পরিশীলিত রাজশক্তিধর নায়কের সেবায় রত হন। তারা তাই পাশাপাশি চলেছেন, তারা অর্জুনের চক্ররক্ষক–মাদ্রেয়ৌ চক্ররক্ষৌ তু ফাল্গুনশ্চ তদাকবরা। কিন্তু কে কোথায়, কী করবে, তার নির্দেশ দেবেন অর্জুন। তিনি নায়ক, নকুল-সহদেবকেও তিনি নিযুক্ত করেন, ভীমকেও তিনি নিযুক্ত এবং নিয়ন্ত্রিত করেন এবং ধর্মকে তিনি বলেন–তুমি স্থির থাকো আমরা আছি। তোমার স্থাপনের জন্যই আমরা।
তত্ত্বকথা থাক, বাস্তব যুদ্ধ-কথায় আসি। শত্রুদের গর্জন-সিংহনাদ স্তব্ধ করে দিয়ে অর্জুনের রথ সবেগে চলল দিঙমণ্ডল নিনাদিত করে। গদা হাতে ভীম যমের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন পাঞ্চাল সৈন্যদের ওপর। তিনি যুদ্ধবিশারদ ব্যক্তি এবং ভীমের যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য হল তার আকস্মিকতা এবং ক্ষিপ্রতা। তিনি প্রথমে গদার আঘাতে বেশ কিছু পদাতিক সৈন্যকে ভূপতিত করে পাঞ্চালদের হস্তিসৈন্যের দিকে ধাওয়া করে গেলেন–স্বয়মভ্যদ্রব ভীমো নাগানীকং গদাধরঃ। ভীম যে সব ছেড়ে আগে পাঞ্চালদের হস্তিসৈন্যের দিকে ধাবিত হলেন, তার একটা কারণ আছে। তখনকার দিনের যে কোনও সেনাবাহিনীতে হস্তিসৈন্যের মর্যাদা ছিল সবচেয়ে বেশি। যে কোনও সময়ে শত্রুসৈন্য বিমর্দন করার পক্ষে গজারোহী বাহিনী ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। ভীম চাইলেন–তাঁর লৌহ-গদার আঘাতে তিনি যদি বেশ কিছু হস্তীর, মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে পারেন তবে শত্রুপক্ষের মনোবল ভেঙে যেতে বাধ্য।
ভীম এই পরিকল্পনাতেই এগোলেন এবং বজ্রাঘাতে পর্বতশিখরের মতো পাঞ্চাল-সৈন্যের হাতিগুলি মারা পড়তে লাগল–পতন্তি দ্বিরা ভূমৌ…ভিন্ন-মস্তক-পিণ্ডকাঃ। অশ্বারোহী এবং রথী পুরুষেরাও বাদ গেল না। ভীমের আক্রমণ আসুরিক এবং ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্র গোপালক রাখাল যেমন অনেকগুলি গোরু একসঙ্গে তাড়িয়ে নিয়ে যায় ভীম সেইরকম তাড়িয়ে নিয়ে চললেন পাঞ্চালদের। একইসঙ্গে তিনি নিজেদের রথী এবং হস্তিসেনার পথ করে দিলেন পাঞ্চালদের পিছনে।
