এতক্ষণ ধরে মহামতি দ্রোণাচার্য তার শিষ্য-রাজপুত্রদের সঙ্গে আসছেন, কিন্তু যুদ্ধের বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করছেন না। কীভাবে সৈন্য পরিচালনা করতে হবে, কীভাবে আক্রমণ করতে হবে, অথবা যুদ্ধের কী স্ট্র্যাটেজি হবে–এসব নিয়ে একটি মন্তব্যও তার মুখ দিয়ে বেরচ্ছে না। অর্থাৎ এটাও তার দেখার যে, তাঁর শিষ্যরা কীভাবে তাদের জীবনের এই প্রথম যুদ্ধটির সম্মুখীন হয়। কৌরব রাজপুত্রেরা হই-হই করে যখন অহং পূর্ব অহং পূর্বং রবে আগে-ভাগে বেরিয়ে গেল, তখনও তিনি বাধা দেননি বা বলেননি যে, সবাই একসঙ্গে চল। দ্রোণাচার্য সঙ্গে চলেছেন এইমাত্র, কিন্তু তিনি কোনও নির্দেশ দিচ্ছেন না।
আসলে কৌরব এবং পাণ্ডব রাজপুত্রেরা একই সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন। কিন্তু পাঞ্চাল রাজ্যের কাছাকাছি এসে কৌরব রাজপূত্রদের আর ধৈর্য থাকল না। কে আগে দ্রুপদকে জীবন্ত বেঁধে এনে গুরুর পায়ে নিবেদন করতে পারে–বিশেষত পাণ্ডব-ভাইরা যেন দ্রুপদের নাগাল না পায় এবং তাদের পৌঁছনোর আগেই যাতে দ্রুপদকে ধরে নিয়ে আসা যায়–এই চিন্তায় দুর্যোধন-দুঃশাসন-কৰ্ণরা সকলকে পিছনে রেখে আগেই পৌঁছেছিলেন পাঞ্চাল-নগরের দ্বারদেশে।
জায়গাটা নগরের বাইরে আধ ক্রোশটাক হবে। পাণ্ডব-ভাইরা গুরু দ্রোণাচার্যকে সঙ্গে নিয়ে পাঞ্চাল–নগরের প্রান্তে এসে যখন দেখলেন–কৌরবরা তাদের জন্য কোনও অপেক্ষা করেননি, এবং তারা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করার জন্য ব্যস্ত, তখন অর্জুন আর কৌরবদের ভিড়ে মিশে যেতে চাইলেন না। তিনি বুঝলেন–যদি কোনওভাবে এই যুদ্ধে জিত হয়, তবে পাণ্ডবদের আলাদা কোনও নামও হবে না এবং যুদ্ধ-জয়ের সমস্ত সাফল্যই দাবি করবেন ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা। অথচ যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে অর্জুন তার পরিশ্রমের সমস্ত ভাগটুকু উজাড় করে দেবেন না, তা তো হতে পারে না। কিন্তু কৌরবদের অত্যুন্মুখ সাহংকার আচরণ দেখে অর্জুন দ্রোণাচার্যকে বললেন–আচার্য! এঁদের যত ক্ষমতা, কলা-কৌশল আছে, তার প্রদর্শনী আগে হয়ে যাক, তারপর আমরা যাব। আমার বিশেষ ধারণা–এঁরা দ্রুপদকে যুদ্ধে জয় করতে পারবেন না–এতৈরশকঃ পাঞ্চাল্যো গ্রহীতুং রণমূর্ধনি।
অর্জুন জানেন–পাঞ্চাল দ্রুপদ খুব কম বড় যোদ্ধা নন। হই হই করে তাকে জিতে আসা যাবে না। তিনি তাই ভাইদের নিয়ে নগরের বাইরে আধ ক্রোশটাক দূরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। হয়তো ভাবলেন–কৌরবদের আক্রমণে জয় নাই আসুক, এতক্ষণ যুদ্ধশ্রমে দ্রুপদ খানিক ক্লান্ত হবেন অবশ্যই। তখন নতুন উদ্যমে আক্রমণ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। দ্রোণাচার্য বুঝলেন–অন্তত এটা একটা স্ট্রাটেজি। তিনি অর্জুনের কথার কোনও উত্তর দিলেন না বটে, কিন্তু তিনিও পাণ্ডব–ভাইদের সঙ্গে ফিরে গেলেন অর্ধ-ক্রোশ পথ–অর্ধক্রোশে তু নগরাদতিষ্ঠ বহিরেব সঃ। পাণ্ডব অর্জুন অপেক্ষা করতে লাগলেন–কতক্ষণে কৌরব রাজপুত্রদের দম ফুরিয়ে আসে।
ভবিষ্যতে যিনি মহাযুদ্ধের নায়ক হবেন, সেই অর্জুন এমনই ঠান্ডা মাথায় কাজ করেন। কৌরব–জ্ঞাতিদের তিনি পছন্দ করেন না বলে তিনি ভীমের মতো রুক্ষ ভাষায় ঝগড়া করেন না। তিনি ঠান্ডা মাথায় প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। রঙ্গ যুদ্ধের প্রদর্শনীকালে কর্ণ-দুর্যোধন তাকে যে অপমান করেছিলেন, সেই অপমানের বদলা নেবার এই তো শীতল সময়। তাকে চেঁচাতে হয় না, কথা-কাটাকাটি করতে হয় না, নায়কোচিত গাম্ভীর্যে তিনি সময়ের অপেক্ষা করেন। অন্তত যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি কারও অনুগামী নন। তাঁর নিজের ভাবনা আছে, অতএব তার বীরোচিত পৃথত্ব আছে, ইংরেজিতে যাকে বলি Heroic isolation.
.
১০৯.
ওদিকে পাঞ্চাল-কৌরবদের তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হল। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ যুদ্ধক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়াতে লাগলেন জ্বলন্ত অঙ্গার-চক্রের মতো। কৌরব রাজকুমাররা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে দেখলেন প্রত্যেকেই তারা দ্রুপদের শরবর্ষণের আস্বাদ পাচ্ছেন–অলাতচক্রবৎ সর্বং চরন বাণৈরতপয়ৎ–এবং সে আস্বাদ বড় তীক্ষ্ণ, বড়ই মর্মন্তুদ। দুর্যোধন, দুঃশাসন, বিকর্ণ-কৰ্ণরাও চেষ্টা কম করলেন না। এক সময় তাঁরাও দ্রুপদকে বেশ বিপন্ন করে ফেলেছিলেন। এতগুলি মহাবীরের অকৃপণ বাণবর্ষণে একা দ্রুপদ বেশ কাতরই হয়ে উঠেছিলেন–সোতিবিদ্ধো মহেষাসঃ পাৰ্ষতো যুধি দুর্জয়ঃ। কিন্তু তাই বলে তাকে জয় করা গেল না মোটেই। বাণবিদ্ধ দ্রুপদ দ্বিগুণ ক্রোধে প্রতি-আক্রমণ করলেন কর্ণ-দুর্যোধন দুঃশাসনদের। বাণে বাণে প্রতিবিদ্ধ করলেন নায়ক রাজপুত্রদের।
দ্রুপদের উচ্ছ্বাস দেখে পাঞ্চাল নগরের বাজনদাররা যুদ্ধক্ষেত্রের পাশ থেকে শঙ্খ, ভেরী, মৃদঙ্গের তুমুল আওয়াজ তুলল আর অন্যেরা পাঞ্চালরাজের জয়কার ঘোষণা করল সিংহনাদশ্চ সংজজ্ঞে পাঞ্চালানাং মহাত্মনাম। পাঞ্চাল-দেশের মানুষ-জনেরা একটু অন্যরকম। রাজার দুঃখ-সুখের সঙ্গে তাদের দুঃখ-সুখ একরকম। কৌরব রাজপুত্রদের প্রথম এবং অকস্মাৎ আক্রমণে তারা একটু বিভ্রান্ত হয়েছিল বটে, কিন্তু যে মুহূর্তে তারা দেখল–তাদের রাজা দ্রুপদ চালকের ভূমিকায় আরূঢ়, সেই মুহূর্তেই পাঞ্চালদেশের বালক-বৃদ্ধ সবাই কৌরবদের ধাওয়া করল একযোগে–সবালবৃদ্ধান্তে পৌরাঃ কৌরবান অভ্যয়ুস্তদা। নগরবাসী পাঞ্চালেরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য প্রত্যেকেই বাড়িতে একাধিক মুষল রাখতেন। কারণ বিপদে পড়লে খুব তাড়াতাড়ি মুষল ছোঁড়াটাই সবচেয়ে সুবিধের। যারা লোহার মুষল রাখতে পারত না, তারা অন্তত লাঠি রাখত। আজ দ্রুপদের বিপন্নতায় তারা সব মুষল আর লাঠিসোটা নিয়ে ছুটে এল যুদ্ধক্ষেত্রে। রাজার প্রতি সমব্যথায় তারা বৃষ্টির ধারার মতো মুষল আর লাঠি ছুঁড়ে আঘাত করতে লাগল কৌরব রাজপুত্র এবং তাদের সৈন্যদের ওপর–ততস্থ নাগরাঃ সর্বে মুষলৈৰ্যষ্টিভিস্তদা।
