আজ সেই অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে। দ্রোণের আকাঙ্ক্ষিত কাল এখন উপস্থিত। তিনি এবার গুরুদক্ষিণা চাইবেন। দ্রোণাচার্য দ্রুপদের অপমানের কথা মাথায় রেখে একদিন তার সমস্ত শিষ্যকে ডেকে পাঠালেন। পাণ্ডব-কৌরব সমস্ত ভাইরা এবং তার কাছে শিক্ষা লাভ করতেন এমন অন্যান্য শিষ্যরাও গুরুর ডাক পেয়ে দ্রোণাচার্যের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন। এমনকি কর্ণও এসেছেন দুর্যোধনের সঙ্গে। বন্ধুত্বের জন্যই হোক অথবা যুদ্ধ-সরসতায়, কর্ণও উপস্থিত হয়েছেন এই দ্রোণাচার্যের এই শিষ্য-সম্মেলনে। দ্রোণাচার্য শিষ্যদের বললেন এতদিন তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছি এইবার তোমাদের গুরুদক্ষিণা দিতে হবে। শিষ্যরা গুরুর আজ্ঞার জন্য উন্মুখ হতেই দ্রোণাচার্য বললেন–আমার অর্থ চাই না, সম্পদ চাই না, কিচ্ছু চাই না। তোমাদের কাজ একটাই–পাঞ্চালদেশের রাজা দ্রুপদকে যুদ্ধে হারিয়ে তাকে জীবিত ধরে আনতে হবে আমার কাছে, সেইটাই তোমাদের সবচেয়ে বড় দক্ষিণা দেওয়া হবে পাঞ্চালরাজং দ্রুপদং গৃহীত্ব রণমূধনি। পৰ্য্যায়ত ভদ্রং বঃ সা স্যাৎ পরম দক্ষিণা। যাও। তোমাদের মঙ্গল হোক।
দ্রোণাচার্য এতদিন কুরুবাড়িতে আছেন, রাজপুত্রদের সঙ্গে মেলামেশা করছেন, অতএব তার শিষ্যদের জানতে বাকি নেই যে, দ্রোণাচার্য কেন এই দক্ষিণা চাইছেন। বিশেষত ভীমের সঙ্গে দেখা হবার মুহূর্তেই পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কাছে নিজের অপমানের কথা সবিস্তারে জানিয়েছিলেন দ্রোণাচার্য। সেইসব সূত্র থেইে হোক অথবা নিজেরা জেনে যাবার ফলেই হোক, হস্তিনাপুরের রাজপুত্রেরা কোনও দ্বিরুক্তি না করে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে আরম্ভ করলেন।
দ্রোণাচার্য এইটাই চেয়েছিলেন। দ্রুপদের কাছে অপমানিত হবার পর তিনি যে দ্রুপদকে আক্রমণ করেননি তার একটাই কারণ। তিনি একা, কিন্তু দ্রুপদ বহু সৈন্য-সামন্ত বেষ্টিত এক রাজা। দ্রোণাচার্য চেয়েছিলেন–দ্রুপদের সঙ্গে রীতিমতো একটা যুদ্ধ হোক, যাতে সৈন্য সামন্ত, হাতি-ঘোড়া সবই লাগবে। পাঞ্চালদের সঙ্গে কৌরব-গোষ্ঠীর আনুপূর্বিক শত্রুতা থাকায় মহামতি ভীষ্ম যেমন দ্রুপদের ক্রোধ হবে জেনেও দ্রোণাচার্যকে আশ্রয় দিতে দ্বিধা করেননি, তেমনই আজকে হস্তিনাপুরের রাজপুত্রেরা সৈন্য-সামন্ত নিয়ে দ্রুপদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেও বৃদ্ধরা তার মধ্যে কোনও দোষ খুঁজে পেলেন না। তারা বরং পরোক্ষে দ্রোণাচার্যকে মদত জুগিয়ে গেলেন। দ্রুপদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার যে একটি গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে এবং সে কথা যে কুরুবৃদ্ধেরা জানতেন না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু সেই তাৎপর্য আছে জেনেও রাজপুত্রদের তারা বাধা দিলেন না। দ্রোণাচার্যও এইটাই চেয়েছিলেন যে, একটি সুগঠিত সৈন্যবাহিনীর দশ-বারোটি অধিনায়ক তার হয়ে যুদ্ধ করে আসুক এবং দ্রুপদকে ধরে নিয়ে আসুক জীবন্ত। লক্ষণীয় বিষয় হল, দ্রোণাচার্য এই যুদ্ধযাত্রায় কৌরবদের সঙ্গী হয়েছেন। কিন্তু তিনি অস্ত্রে হাত লাগাবেন না বলেই ঠিক করেছেন। দ্রুপদকে শায়েস্তা করার জন্য তার শিষ্যরাই যথেষ্ট–এটা বোঝানোর জন্যই দ্রোণ অস্ত্রচালনা করবেন না। কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে যাচ্ছেন।
কুরুবাড়ির যুবক রাজপুত্রদের কাছে এই প্রথম যুদ্ধ। এই প্রথম তারা রাজ্য ছেড়ে গিয়ে অন্য রাজ্যে আক্রমণ চালাবেন। স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত রাজপুত্রদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা গেল। দুর্যোধন, কর্ণ, যুযুৎসু, দুঃশাসন, জলসন্ধ, সুলোচন ইত্যাদি কুরুকুমাররা–বিশেষত যাঁরা ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র–তারা নতুন উন্মাদনায়–আমি আগে যাচ্ছি! আরে তুই থাক, আমি আগে যাচ্ছি–এইভাবে পাঞ্চাল দেশে এসে উপস্থিত হলেন–অহং পূর্বমহং পূর্ব ইত্যেবং ক্ষত্রিয়ভাঃ।
পাঞ্চাল দেশের নগর যথেষ্ট সুরক্ষিত। নগরের দ্বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন নগররক্ষী বীরপালেরা। তাঁদের কারও কাছে কোনও যুদ্ধ লাগার খবর নেই, কোনও প্রতিবেশী রাজা আকস্মিকভাবে পাঞ্চাল আক্রমণ করবেন, গুপ্তচরের মুখে এমন খবরও তাদের কাছে আসেনি। কৌরব-কুমাররা হঠাৎ পাঞ্চালে উপস্থিত হয়ে নগরে প্রবেশ করার প্রথম বাধা দ্বারপালদের হত্যা করলেন। তারপর টগবগে ঘোড়ায় চড়ে অশ্বারোহী সৈন্যবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে সদর্পে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন–প্রবিশ্য নগরং সর্বে রাজমার্গম্ উপাযযুঃ! কুরু সৈন্য এবং রাজপুত্রদের আকস্মিক আক্রমণে সমস্ত পাঞ্চাল নগরের মধ্যে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি হল।
মহারাজ দ্রুপদের কাছে এই আকস্মিক আক্রমণের সংবাদ পৌঁছল যথেষ্টই তাড়াতাড়ি। তিনি শুনলেন–বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে কৌরব-রাজপুত্রেরা তাঁর রাজ্য আক্রমণ করেছে। দ্রুপদ সঙ্গে সঙ্গে তার ভাইদের নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করলেন কৌরবদের বিরুদ্ধে। মনে রাখার দরকার মহারাজ দ্রুপদ গুরু দ্রোণাচার্যের সহপাঠী। একই গুরুর কাছে তিনিও অস্ত্রশিক্ষা করেছেন। কাজেই সাদা ঘোড়ায় সুসজ্জিত একটি সুন্দর রথে চড়ে দ্রুপদ যখন কৌরব–সৈন্য এবং কৌরব–ভাইদের ওপর বাণ বর্ষণ আরম্ভ করলেন, তখন কৌরব-রাজপুত্রদের টনক নড়ল। দ্রুপদ যে এতখানি অস্ত্রনিপুণ ব্যক্তি, এ তারা ভাবতেও পারেননি।
দ্রুপদ এক জায়গায় স্থির হয়ে যুদ্ধ করছেন না। যুদ্ধক্ষেত্রের একদিক থেকে আরেক দিক ক্রমাগত রথ নিয়ে বিচরণ করতে করতে শরবর্ষণ করতে লাগলেন দ্রুপদ। কৌরব রাজপুত্রেরা একেবারে বোকা বনে গেলেন–শরজালেন মহতা মোহন্ কৌরবীং চমূম। তারা বেশ ভয়ও পেলেন। দ্রুপদের বাণ–মোণ এত ক্ষিপ্র, এবং তা সংখ্যায় এতই বেশি যে, একাকী একরথে বিচরণকারী দ্রুপদকে অনেক দ্রুপদ বলে মনে হল কৌরব-রাজপুত্রদের–অনেকমিব সন্ত্রাসা মেনিরে তত্র কৌরবাঃ।
