একশো ভাই কৌরবরা গাত্রোখান করার সঙ্গে সঙ্গেই দুর্যোধন কর্ণের হাত ধরলেন। হাত ধরেই পথ চলতে আরম্ভ করলেন অনুগামী এবং পুরোগামী স্বপক্ষপাতী জনতার সঙ্গে। তারা মশাল জ্বালিয়ে দুর্যোধন–কর্ণকে পথ দেখাতে লাগল–দীপিকাগ্নিকৃতালোক-স্তস্মাদ রঙ্গা বিনির্যযৌ। পাণ্ডব পক্ষপাতী জনতা এবং পাণ্ডবদের সঙ্গে চলতে লাগলেন দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য এবং ভীষ্ম। সকলেই হাঁটতে হাঁটতে নিজের নিজের বাড়ি পৌঁছলেন।
আজকের সারা দিনের রঙ্গ-প্রদর্শনীর মধ্যে অর্জুনের অস্ত্র-কৌশল যেমন একটা বিলক্ষণ দর্শনীয় বস্তু ছিল, সেই দর্শনীয়তার মধ্যে কর্ণের আকস্মিক আবির্ভাব, তার ক্ষমতার অভিব্যক্তি এবং সর্বোপরি তার রাজ্যাভিষেকের রাজনৈতিক তাৎপর্য মিশে যাওয়ায় বিভিন্ন জনের মনে বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া হল। পরশুরামের শিষ্য এবং অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন কর্ণকে বন্ধু হিসেবে পাবার পর থেকেই দুর্যোধন মনে মনে পরম নিশ্চিন্ত হলেন। অতিবলশালী ভীমকে তিনি সুকৌশলে যুদ্ধে হারাবেন–এ বিষয়ে তাঁর নিশ্চিত ধারণা ছিল, কিন্তু অর্জুনের সম্বন্ধে তার ভয় ছিল অসম্ভব। কর্ণের সঙ্গে পুনর্মিলনের আগে পর্যন্ত অর্জুনই যেহেতু ছিলেন সবচেয়ে অস্ত্রশিক্ষিত পুরুষ, অতএব অর্জুনকে তিনি কীভাবে প্রতিহত করবেন, সে বিষয়ে তার দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু অর্জুনের সমান অথবা আরও বড় প্রতিযোগী হিসেবে কর্ণকে নিজের অনুগামী হিসেবে পেয়ে যাওয়ায় দুর্যোধন অর্জুনের ব্যাপারে একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন–ভয়মৰ্জুন-সঞ্জাতং ক্ষিপ্রমন্তরধীয়ত। কর্ণও দুর্যোধনের প্রতি কৃতজ্ঞতায় একেবারেই বশংবদ হয়ে গেলেন।
পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির যুদ্ধ-বিগ্রহ ভালবাসেন না, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বও তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু দুর্যোধন এবং কর্ণের বন্ধুত্ব যে সুরে বাঁধা হল, তা যেহেতু একান্তভাবেই প্রতিহিংসার সুর এবং যেহেতু কর্ণ একেবারেই অনন্যসাধারণ এক যোদ্ধা, তাই যুধিষ্ঠিরের মনে হল–কর্ণের মতো অত বড় যোদ্ধা তিন ভুবনে আর কোথাও নেই–ন কর্ণতুল্যোস্তি ধনুর্ধরঃ ক্ষিতৌ। যুধিষ্ঠিরের বিনয়-শিক্ষা এতটাই বেশি যে, স্বপক্ষীয়, বিশেষত নিজের ভাই বলেই অর্জুনের দক্ষতাকে তিনি ছোট করে দেখতে লাগলেন।
এই রঙ্গ প্রদর্শনীতে যদি সবচেয়ে আনন্দিত ব্যক্তি কেউ থাকেন তবে তিনি অবশ্যই দুর্যোধন। কিন্তু তার চেয়েও যিনি আনন্দিত হলেন তার উচ্ছ্বাসটুকু সবটাই চাপা রইল বুকের মধ্যে। তিনি জননী কুন্তী। কন্যা অবস্থায় নিজের কলঙ্ক-মোচনের জন্য যে শিশু পুত্রটিকে তিনি প্রথম স্নেহচুম্বন দিয়েই জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, তাকে যে কোনও দিন তিনি এইভাবে আবিষ্কার করবেন–এ তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। শুধু তাই নয় দুর্যোধনের বদান্যতায় তার সেই অসহায় শিশু পুত্রটি আজ অঙ্গরাজ্যের রাজা হল–এও কি এক জননীর পক্ষে কম বড় প্রাপ্তি। তিনি জানেন–অনেকেই তাকে দোষ দেবে–কেন তিনি নিজের স্বার্থে এক শিশু পুত্রকে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। তারা তো আর বুঝবে না যে, তিনি নিজের কাছেই নিজে এক করুণার পাত্র, তিনি অপরকে দয়া দেখাবেন কী করে। বিশেষত যে পুত্রের জন্মে কন্যা-জননীর কলঙ্ক রয়েছে। যিনি নিজের পিতা-মাতার কাছে স্বচ্ছন্দে মানুষ হতে পারেননি, যিনি বালিকা বয়সে কুন্তিভোজের বাড়িতে এসেছিলেন দত্তক দেওয়া এক কন্যা হিসেবে, তার কন্যা-অবস্থার পুত্রটিকে কি পালক পিতা ভাল মনে মেনে নিতেন? তাই তাকে নির্মমভাবে সেদিন ভাসিয়ে দিতে হয়েছিল। কিন্তু সমাজ-সংস্কার মেনে, হাজারো নির্মম ব্যবহার করেও কি কোনও জননী তার প্রথমজাত পুত্রমুখ ভুলতে পারেন?
আজ এতদিন পরে সেই সোনার বর্ম-আঁটা, সেই সুবর্ণ-কুণ্ডল পরিহিত শিশুটিকে এক অমিতবলশালী যোদ্ধার মতো রঙ্গভূমি কাঁপিয়ে দিতে দেখে কুন্তীর জননী–হৃদয় আহ্লাদে গর্বে ভরে উঠল। সেই অসহায়, ভাগ্যনদীতে ভাসমান শিশুটি আজ রাজা হয়েছে–এত আনন্দ কুন্তী কোথায় রাখবেন। তবু তাকে লুকোতেই হবে। নিজের কাছে নিজেকে লুকোতে হবে। লুকোতে হবে উত্তরজন্মা পুত্রদের কাছে। লুকোতে হবে সমস্ত সমাজের কাছে। কিন্তু সব কিছুর পরেও তিনি এখন সব সময় সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলের খবর পাবেন, তার প্রতিপত্তি–ক্ষমতার খবর পাবেন, তাঁর সমৃদ্ধির সংবাদ পাবেন–এই বিচিত্র অনুভূতি কুন্তীর সমস্ত হৃদয়ের মধ্যে এক অভূতপূর্ব আনন্দ ছড়িয়ে দিল–পুত্রমঙ্গেশ্বরং জ্ঞাত্বা ছন্না প্রীতিরজায়ত।
কৌরব-পাণ্ডব সকলের অস্ত্রশিক্ষা এখন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র গুরু দ্রোণাচার্যকে যে গুরু দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে দায়িত্ব দ্রোণাচার্য অত্যন্ত সফলভাবে সাঙ্গ করায় তিনিও এখন ভারমুক্ত। তিনি এখন হস্তিনাপুরের রাজবাড়িতেই থাকেন। কিন্তু রাজবাড়িতে রাজার মতো সম্মান এবং ভীষ্মের দেওয়া বৃত্তি লাভ করলেও, তার এই বোধটি অটুট আছে যে, তিনি একজন আশ্রিত ব্যক্তি, জীবনে তিনি এক জায়গায় হেরে আছেন। তাঁর বাল্যবন্ধু পাঞ্চাল দ্রুপদ তাকে কথা দিয়েও কথা রাখেননি এবং উন্মুক্ত রাজসভার মধ্যে তাঁকে সেদিন যে অপমান তিনি কারেছিলেন, সে অপমান তিনি ভোলেননি। সেই অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্যই তিনি হস্তিনাপুরের রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। রাজপুত্রদের শিক্ষার প্রারম্ভেই তিনি তাদের বলে দিয়েছিলেন–বাছারা! আমার কিন্তু একটা কাজ করে দিতে হবে। আমি মনে মনে একটা বিষয় ভেবে রেখেছি, তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হলে সেই জিনিসটা তোমাদের দিতে হবে–কাৰ্য্যং মে কাঙ্ক্ষিতং কিঞ্চি হৃদি সম্পরিবর্ততে।
