এমনিতেই মধ্যম পাণ্ডব ভীম বড় জ্বর-প্রকৃতির মানুষ। কোনও কিছুই তার মুখে আটকায় এবং নিজে অসাধারণ দৈহিক বলের অধিকারী বলে কাউকে তিনি তেমন আমলও দেন না, কারও সম্বন্ধে বিরূপ ধারণা হলে রেখে-ঢেকেও কিছু বলেন না। সূতবৃদ্ধের মুখে পুত্র সম্বোধন শুনেই সর্বত্র ব্যঙ্গের হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বললেন–ওরে ব্যাটা! সারথির পো! একটা যুদ্ধে অর্জুন যে তোকে বধ করবে, সে যোগ্যতাও তোর নেই। তুই বরং এক কাজ কর। ধনুক-বাণ ছেড়ে ঘোড়া-দৌড় করানোর জন্য এক গাছি চাবুক জোগাড় কর তাড়াতাড়ি–কুলস্য সদৃশস্থূৰ্ণং প্রতোদো গৃহং ত্বয়া। তোর বংশে সবাই ওটাই ভাল চালায়। আবার ওই যে আরেক জন! খুব বাড়াবাড়ি করে তোকে অঙ্গ–রাজ্য দিলেন। এও ঠিক হল না। তুই অন্তত রাজপদের যোগ্য নোস। যজ্ঞে যে পুরোডাশ দেবতাকে আহুতি দেওয়া হয়, একটা কুকুর কি সেই যজ্ঞ-বলি ভক্ষণের যোগ্য হয় কখনও–শ্বা হুতাশ-সমীপস্থং পুরোডাশমিবাধ্বরে।
বড্ড কড়া কথা। ভীম বড্ড কড়া কথা বললেন সবার সামনে। রাগে কর্ণের গা জ্বলে গেল, ঠোঁট কাঁপতে লাগল থর-থর করে–কিঞ্চিৎ প্রস্ফুরিতাধরঃ। একটি জ্বলন্ত দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে তিনি আকাশের সূর্যের দিকে একবার তাকালেন–গগনস্থং বিনিশ্বস্য দিবাকরমুদৈক্ষত। একবারও বোঝাতে পারলেন না তার অসহায় অবস্থা। কুকুরের যজ্ঞাহুতি ভক্ষণের কথা বলছেন ভীম, অথচ কর্ণ জানেন–যে দেবতার উদ্দেশে ব্রাহ্মণরা প্রতিদিন সাবিত্রী–মন্ত্র জপ করেন–তৎ সবিতুর্বরেণ্য ভর্গদেবস্য ধীমহি–সেই সূর্যদেবের ঔরসে তার জন্ম। কিন্তু শুধু মায়ের নাম উচ্চারণ করলে সেই কন্যা জননীর সঙ্গে তিনিও কলঙ্কিত হবেন বলে কর্ণের কোনও উপায় নেই স্পষ্ট কথা বলার।
কিন্তু কর্ণ কোনও কথা না বললেও তাঁর হয়ে বলার লোক তখন কৌরব-পক্ষের সবাই। ভীমের রুক্ষ-কঠিন অপমানে দুর্যোধন চুপ করে থাকলেন না। তিনি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন প্রতিপক্ষের আসন থেকে–উৎপপাত মহাবলঃ। দুর্যোধনের একশ ভাই, তারা কেউই দুর্যোধনের মতন নন। তারা নরম–সরম সাধারণ। মহাভারতের কবি তাই উপমা দিয়ে বললেন–ভাইদের মাঝখানে দুর্যোধনকে সক্রোধে উঠে দাঁড়াতে দেখে মনে হচ্ছে যেন পদ্মবন থেকে ক্রুদ্ধ হাতি বেরল একটি–ভ্রাতৃপদ্মবনা তস্মান্মদোকট ইব দ্বিপঃ।
দুর্যোধন ভীমকে উদ্দেশ করে বললেন–ওরে! এমন বাজে কথা বলিস না দ্বিতীয়বার। ক্ষত্রিয়ের জীবনে বলই সব, বংশ নয়। কর্ণকে যদি ক্ষত্রিয় নাই বলিস, কিন্তু আমার মতো ক্ষত্রিয়ের বন্ধু বটে। কাজেই ক্ষত্রিয়ের শক্তির কথা মাথায় রেখে যুদ্ধের মাঠে নেমে আয়। আরও একটা কথা বলি শোন–বলবান পুরুষ আর নদীর উৎস খুঁজতে যাস না, বাপু! কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে যাবে–শূরাণাঞ্চ নদীনাঞ্চ দুর্বিদা প্রভাবাঃ কিল। এই যে এত বড় বিশ্বামিত্র মুনির কথা শুনি, তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয়, অথচ হয়েছেন ব্রাহ্মণ। মহামতি দ্রোণাচার্যের জন্ম দ্রোণ-কলসে, কৃপাচার্যের জন্ম নল-খাগড়ার বনে। এঁদেরও জননী এবং জন্মবিন্দুর রহস্য আমার জানি না। আর তোরাই বা কম কিসে? তোদের নিজেদের জন্ম কেমন করে হয়েছে, তাও কি আমার জানতে বাকি আছে ভেবেছিস–ভবতাঞ্চ যথা জন্ম এতদপ্যাগমিং ময়া।
দুর্যোধন পঞ্চ-পাণ্ডবের জন্মের তথাকথিত অনৈতিকতার স্মরণ করিয়ে দিয়ে কর্ণের জন্ম–মাহাত্ম্য স্থাপন করতে চাইলেন অনুমান প্রমাণে। বললেন–তাছাড়া এই চেহারাটার দিকে একটু তাকিয়ে দেখ। গায়ে অলৌকিক সোনার বর্ম আঁটা কানে অভেদ্য কুণ্ডল। পুরুষ মানুষের যত সুলক্ষণ তাও সবই আছে কর্ণের চেহারায়। সাধারণ বা অধম কোনও ঘরে দীপ্ত সূর্যের মতো এমন চেহারার মানুষ একটাও পাবি না। একটা হরিণীর পেট থেকে কি একটা বাঘের জন্ম হয়–কথমাদিত্যসদৃশং মৃগী ব্যাঘ্রং জনিষতি?
দুর্যোধন শেষ কথায় নিজেকে সপ্রমাণ করে বললেন–আরে শুধু অঙ্গ রাজ্য কেন, আমার কথায় এবং নিজের বাহুবলে এ মানুষটা সমগ্র পৃথিবীর রাজা হবার উপযুক্ত। তাছাড়া এত সব কথা বলে লাভ কী? কর্ণকে অঙ্গরাজ্যের রাজা করে দিয়েছি, বেশ করেছি। আমার এই কাজটা যদি কারও অপছন্দ হয়ে থাকে, তোত সে বাপু একটু পায়ে হেঁটে কষ্ট করে রথে উঠুক এবং ধনুকের ছিলা ধরে একটু টান দিক। তারপর দেখা যাক কার কত ক্ষমতা–রথমারুহ্য পদ্ভ্যাং স বিনাময়তু কামূকম্।
দুর্যোধনের মুখে সোজাসুজি এই যুদ্ধাহ্বান শুনে সমস্ত রঙ্গভূমিতে হাহাকার শব্দ উঠল। দর্শকাসনে বসা মানুষরা বুঝল–এবার আর ব্যাপারটা নির্দোষ প্রদর্শনী বা প্রতিযোগিতার স্তরে নেই। যা ঘটতে যাচ্ছে তা হল যুদ্ধ। এ যুদ্ধে দুই বীরের যা গতি হয় তোক, কিন্তু শরবর্ষণ আরম্ভ হলে কাছে বসা মানুষজনের জীবনহানির আশঙ্কা থেকেই যাবে। ফলে তাদের মধ্যে ভয়ঙ্কর চেঁচামেচি আরম্ভ হল–ততঃ সর্বস্য রঙ্গস্য হাহাকারো মহানভৃৎ। অতিরিক্ত সাহসী জনতার কেউ কেউ অবশ্য সাহসী কথাবার্তা বলবার জন্য, ক্ষত্রিয়োচিত তেজ প্রকাশ করার জন্য দুর্যোধন–কর্ণের প্রশংসাও করতে লাগল।
দুর্যোধনের সাহংকার ঘোষণায় একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিলই, কিন্তু যুদ্ধের সমস্ত সম্ভাবনা নির্মূল করে দিয়ে সূর্যদেব অস্ত গেলেন। সেকালের যুদ্ধনীতিতে এই নিয়ম ছিল–সূর্য অস্ত গেলে আর যুদ্ধ করা চলবে না। অতএব সকলেই বাড়ি যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। সেদিনকার রঙ্গ-প্রদর্শনীর নায়ক হয়ে রইলেন কর্ণ এবং অর্জুন। সূর্যাস্ত ঘোষণার সঙ্গে রঙ্গ-যুদ্ধের অন্ত-ঘোষণাও হয়ে যাওয়ায় উৎসাহী জনতা মশাল জ্বালিয়ে পথ চলতে আরম্ভ করল। অস্তাচলগামী স্তিমিত সূর্যের আলোক আবৃত হল মানুষের হাতে হাতে ধরা দীপিকাগ্নির আলোকে। সমস্ত জনতা আবারও দুই ভাগ হয়েই চলতে আরম্ভ করল। তারা কেউ অর্জুনের জয় ঘোষণা করছে, কেউ বা জয় ঘোষণা করছে কর্ণের, কেউ বা দুর্যোধনেরও–অর্জুনেতি জনঃ কশ্চিৎ কশ্চিৎ কর্ণেতি ভারত। কশ্চিদ্ দুর্যোধনেত্যেবং ব্রুবন্তঃ প্রস্থিতাস্তদা।
