কর্ণ-দুর্যোধনের পারস্পরিক দানাদান যখন শেষের মুখে, তখনই আরও একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটল, যুদ্ধ–প্রদর্শনীর রঙ্গস্থলে। আমরা পূর্বেই জানিয়েছি–মহেন্দ্র পর্বত থেকে ফিরে কর্ণ সোজা চলে এসেছিলেন দুর্যোধনের কাছে। কর্ণের পালক পিতা অধিরথ পুত্রের ফিরে আসার সংবাদ শুনেই হস্তিনাপুরের দিকে রওনা হয়েছেন সঙ্গে সঙ্গে। তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন, লাঠিতে ভর দিয়ে তাকে পথ চলতে হয়। সেই চম্পা নগরী থেকে হস্তিনাপুর। পথ তত কম নয়। রথে চড়ে আসতে গেলেও একটি বৃদ্ধ মানুষের ক্লান্তি কিছু কম হয় না। বিশেষত মগধ-বিহারের সীমান্ত–ভূমি চম্পা থেকে হস্তিনাপুর–অর্থাৎ দিল্লির কাছাকাছি জায়গায় আসতে গেলে যে রাজপথ বেয়ে রথ চালাতে হয়, তার ভূমি সমতল নয়। সূত্রবৃদ্ধ অধিরথ তবু খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন হস্তিনাপুরে।
সূত অধিরথ জানেন যে, তার ছেলেটি ভয়ঙ্কর আবেগপ্রবণ এবং অর্জুনের ব্যাপারে তার চিরাচরিত প্রতিহিংসা-বৃত্তির কথাও তিনি জানেন। কর্ণ যেহেতু চম্পায় না ফিরে হস্তিনাপুরেই আস্তানা গেড়েছেন, তাই অধিরথের অনুমান–দ্রোণাচার্যের রঙ্গ-প্রদর্শনীর দিন তাঁর পুত্রটি সেখানে যাবেই। তিনি তাই তড়িঘড়ি আসছেন হস্তিনাপুরে।
যে মুহূর্তে রঙ্গস্থলের প্রবেশদ্বারে সূত অধিরথকে দেখা গেল, তখন অপরাহ্নের বেলা। অধিরথ রঙ্গমঞ্চে ঢুকলেন; তাঁর সমস্ত গা ঘামে ভিজে গেছে। স্কন্ধস্থিত উত্তরীয় বাস খানিকটা গলায় আর খানিকটা মাটিতে লুটোচ্ছে–ততঃ স্তোত্তরপটঃ সপ্রস্বেদঃ সবেপথুঃ। পথশ্রমের সঙ্গে এক দুরন্ত ভয় তাকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে তার সারা শরীর কাঁপছে। লাঠিতে ভর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিনি রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করেই বিহ্বলভাবে এদিক–ওদিক তাকিয়ে তার প্রিয় পুত্রটির নাম ধরে ডাকতে লাগলেন–কর্ণ! কর্ণ রাধেয়! তার গলার স্বরে ভয় মিশ্রিত ছিল। তিনি ভাবছিলেন–দ্রোণাচার্যের উপযুক্ত শিষ্য অর্জুনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কর্ণ যদি কোনওভাবে মারা পড়েন, তবে এই বৃদ্ধ বয়সে তার সারা জীবনের বাৎসল্য-সম্পদ, তার প্রিয়া পত্নী রাধার জীবনধারা সর্বস্ব হারিয়ে যাবে। আর ঠিক এই ভাবনাতেই তার ঘাম হচ্ছে, সারা শরীর কাঁপছে এবং প্রবেশদ্বার থেকেই তিনি বিহ্বলভাবে ডাকছেন–কর্ণ! রাধার ছেলে আমার রাধেয়–বিবেশাধিরথথা রঙ্গং যষ্টিপ্রাণো হয়ন্নিব।
দুর্যোধনের হাত ধরা কর্ণের কানে এই বিহ্বল ডাক পৌঁছল। রঙ্গস্থলের মধ্যভূমি থেকে কর্ণের দৃষ্টি পড়ল সূতবৃদ্ধ অধিরথের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাঁধ থেকে ধনুক ছুঁড়ে ফেললেন মাটিতে, নামিয়ে ফেললেন সশর তৃণীর। তখনও তার মাথা থেকে চুঁইয়ে পড়ছে অভিষেক বারি-বিন্দু। পিতা অধিরথ সেই সুদূর চম্পা থেকে এতদূর এসেছেন তাকে দেখতে। পিতার গৌরবে কর্ণ সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন তার কাছে। দুই হাত দিয়ে সুস্থির করার চেষ্টা করলেন তার কম্পমান শরীর। তারপর সকলের সামনে, পাণ্ডব-কৌরব এবং সমবেত জনতার সামনে সগৌরবে তার অভিযেক-বারি সিঞ্চিত মস্তকখানি স্থাপন করলেন পিতা অধিরথের পায়ে–কণোভিষেকাম্ৰাশিরাঃ শিরসা সমবন্দত। এতটুকু লজ্জা নেই, এতটুকু সংকোচ নেই, কর্ণের এই বিনতির মধ্যে সবটাই তাঁর পালক পিতার জন্য গৌরব নিহিত। সম্ভ্রম আর পুরুষকারের অভিব্যক্তি এমনই গৌরবময় হয় বুঝি।
এতকাল ধরে এই পূত্রটিকে লালন-পালন করছেন অধিরথ। কিন্তু তার মনে মনে বিশেষ বারণা আছে–ছেলেটি অবশ্যই কোনও বড় ঘরের ছেলে হবে। ছেলের চেহারা, গায়ের রঙ, তাঁর ব্যক্তিত্ব, ক্ষমতা এবং উচ্চাশা সব কিছু মিলিয়ে কেবলই তার মনে হয়–এই ছেলেটি এক বড় বংশের ছেলে এবং ঈশ্বরের করুণায় ছেলেটি এই সূত মাতা-পিতার পুত্রত্ব স্বীকার করেছে যেন। অধিরথ তাঁর ছেলেটিকে খুব ভালবাসেন, খুব আদর করেন, কিন্তু মনে মনে এই ছেলেটির উচ্চকুলের জন্ম-সম্ভাব্যতার কথা মনে রেখে এই আদরণীয় পুত্রটির প্রণাম নিতে সংকোচ বোধ করেন একটু। বাৎসল্যভরে মুখে কিছু বলেন না, কিন্তু একটু সংকোচ আছে তাঁর। কাজেই কর্ণ যখন সগৌরবে সূতবৃদ্ধের চরণে মাথা নোয়ালেন, তখন অধিরথ তাঁর আলুথালু লুটিয়ে পড়া বস্ত্রাঞ্চল দিয়ে নিজের পা-দুটি ঢাকার চেষ্টা করলেন–ততঃ পাদাববচ্ছাদ্য পটান্তেন সসম্রমঃ। কিন্তু সসম্ভ্রম মুহূর্তটুকু কেটে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই–অর্থাৎ কর্ণও তাঁর পদস্পর্শ করলেন আর অধিরথও পা লুকোনোর চেষ্টা করলেন–এই ত্বরমান পারস্পরিক শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সূত অধিরথের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল সেই শৈশব-স্মৃতি-বিজড়িত সস্নেহ মধুর আহ্বান–পুত্র! পুত্র আমার-পুত্রেতি পরিপূর্ণার্থামব্রবীদ্রথ সারথিঃ।
.
১০৮.
সূতবৃদ্ধ অধিরথ কর্ণের অভিষেক-জলসিক্ত মস্তক চুম্বন করে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। আর বারবার তাঁকে সস্নেহ মধুর স্বরে ডাকতে লাগলেন–পুত্র! পুত্র আমার।
সূত অধিরথের মুখে পুত্র-সম্বোধন শোনা মাত্রই পাণ্ডব-পংক্তির মধ্যে এক নতুন প্রতিক্রিয়া হল। মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেনের মুখে এক অদ্ভুত হাসি দেখা গেল। এতক্ষণ কর্ণ অনেক কথা বলেছেন, অনেক হম্বিতম্বি করেছেন। তারপর কৃপাচার্য তাঁর বংশের সম্বন্ধে প্রশ্ন তুললে দুর্যোধন তাকে যেভাবে অঙ্গ রাজ্যের রাজত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করলেন, তাতে পাণ্ডবদের কারও মুখে আর একটি কথাও সরছিল না। কিন্তু যেই না সূতবৃদ্ধ অধিরথ কর্ণকে পুত্র বলে সম্বোধন করলেন, তখনই যেন ভীমের কাছে এক অপূর্ব সুযোগ এসে গেল কর্ণকে প্রতি-অপমান করার।
