হাতি ঘোড়া, পারিজাত অথবা কৌস্তভ মণি, কি লক্ষ্মীদেবী সমুদ্র মন্থনের গৌণ ফল মাত্র। কিন্তু মুখ্য ফল যে অমৃত, তার শক্তি যে দেবতাদের সুস্থ করে তোলার কাজেই নিযুক্ত হবে, সেটা অসুরদের মৃতসঞ্জীবনীর প্রতি তুলনা থেকেই অনুমান করা যায়। দ্বিতীয় কথা হল-সমুদ্র মন্থনের সময় যত বৃক্ষ লতা, ওষধিকে সমুদ্রে এনে ফেলতে বলা হচ্ছে বারবার। এটা একটা ‘পয়েন্টার’ মন্থনের ফলে যা উঠেছে– হাতিঘোড়া বাদ দিয়ে তার ক্রমিক পর্যায়টি লক্ষ করুন। মৎস্য পুরাণ বলেছে বিশাল বিস্তার মন্দর পর্বত ঘুরতে থাকলে অমৃত লক্ষ শ্বাপদ এবং ফল সমন্বিত বৃক্ষের সারাংশে পুষ্ট ওষধির রসে দুগ্ধসাগর দধিসাগরে পরিণত হল। তারপর সহস্র জীব শ্বাপদের বসামেদে দধিসাগর সুরায় পরিণত হল।
দেখুন, এখানে দুগ্ধ দধি অথবা ঘৃত সুরা এগুলি কিন্তু বড় কথা নয়। বড় হল–ক্রমিক পর্যায়গুলি। পুষ্পৌষধি বা বসা-মাংসের মিশ্রণে কী তৈরি হতে পারে তা নিয়ে পৌরাণিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে কিন্তু যে সমস্ত পৌরাণিকের বিভ্রান্তি নেই, তারা তাদের বক্তব্যে যথেষ্টই ঋজু। মহাভারতের পরিশিষ্ট বলে পরিচিত হরিবংশ পুরাণে এই ঋজুতা দেখতে পাই। পৌরাণিক বলেছেন
সমস্ত দেবতা এবং অসুর লবণ সমুদ্রের জলে মন্দর পর্বতকে মন্থন-দণ্ড বানিয়ে সমুদ্র মন্থন করলেন। সমুদ্রের জলে ছিল হাজারো রকমের ওষধি-বীরুঘো হিমবদরসম্। সম্পূর্ণ হাজার বছর ধরে মন্থন করার ফলে সমস্ত ওষধি দুগ্ধে পরিণত হল এবং তা থেকেই উঠে এল অমৃত
সমাঃ সহস্রং মথিতং জল ওষধিভিঃ সহ।
ক্ষীরভূতং সমাযোগা অমৃতং প্রত্যপদ্যত।।
হরিবংশের এই ঋজু কথাগুলি কবি থেকে আরম্ভ করে ঐতিহাসিক এবং বৈজ্ঞানিক সবাই মেনে নিতে পারে। দেবতাদের প্রয়োজন ছিল ওষধিজাত এমন এক মৃত্যুঞ্জয়ী প্রলেপ যা তাদের বাঁচিয়ে রাখবে, যা তাদের মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে তুলবে অবলীলায়। এবারে মহাভারতে লক্ষ্য করে দেখুন–এই অমৃতের ঔষধ হাতে নিয়ে উঠে এলেন যিনি, তিনি কিন্তু আর কেউ নন, তিনি দেব-বৈদ্য ধন্বন্তরি। দেবকুলে তিনি আয়ুর্বেদের চিকিৎসক বলে বিখ্যাত। গরুড় পুরাণ ধন্বন্তরির হাতে ধরা অমৃতকে ঔষধের মর্যাদা দিয়েই সমুদ্র মন্থনের কাহিনী শেষ করেছে। পৌরাণিক বলেছেন- ভগবান শ্রীহরি ক্ষীরসাগর মন্থনের সময় ধন্বন্তরির অবতার গ্রহণ করেছিলেন। অমৃতের কমণ্ডলু হাতে নিয়ে তিনি ক্ষীর সাগর থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আর তারপর? তারপর দেব-দানবের যুদ্ধ যতই লাগুক, ভগবান ধন্বন্তরি তার অমৃত বিদ্যা শিখিয়ে দিলেন তার প্রিয় শিষ্য সুতকে–
ক্ষীরোদমথনে বৈদ্যো দেবো ধন্বন্তরি হর্ভূৎ।
বিভ্রৎ কমণ্ডলুং পূর্ণ অমৃতেন সমুখিতঃ।
আয়ুর্বেদমষ্টাঙ্গং সুতায় স উক্তবান্।
দুগ্ধ, ঘৃত, ওষধি, ‘ফার্মেন্টেশন’- সুরা, অমৃত, ধন্বন্তরি এবং সুশ্রুত এক পংক্তিতে এগুলি যদি পর পর ঋজুভাবে সাজিয়ে দিই তবে অমৃতের অর্থ গিয়ে দাঁড়াবে সেই অশেষ রোগহর নিরাময়কারী ঔষধ, যা দেব দানবের যুক্ত পরিশ্রমের আবিষ্কার এবং যা হয়তো শুক্রাচার্যের মৃত-সঞ্জীবনীর তুলনায় আরও বেশি ফলপ্রদ, আরও বেশি আকাক্ষিত। তাই ছলে-বলে দেবতারাই সেই অমৃত অধিকার করতে ব্যস্ত হয়েছিলেন, আর অসুরেরা বাদ পড়েছিলেন মোহিনী মায়ায়। আমার মূল বক্তব্য কিন্তু বাকি রয়েই গেল। কারণ সমুদ্র মন্থন করে যে অমৃত উঠল, সেই অমৃতটুকু কিন্তু আমার প্রতিপাদ্য নয়, আমার প্রতিপাদ্য হল সেই বিষয়টুকু সে বিষ, যা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে দেবতারা জেতেন, সেই ছলনা, যাতে অসুরেরা পরাজিত হন।
.
১১.
অসুর-দানবেরা শত পরিশ্রম করেও অমৃতের অধিকার লাভ করতে পারলেন না, অন্যদিকে দেবতারা-মানুষ যাদের উদ্দেশে স্তুতি গান করেছে, মানুষ যাদের কাছে সহায়হীন হয়ে আশ্রয় নিয়েছে-সেই দেবতারা অসুরদের সঙ্গে ছলনা করলেন। নিরপেক্ষ জনে ভাবতে আরম্ভ করল–দেবত্বের মধ্যে যদি সত্য, সত্ত্ব, সমদর্শিতা না থাকল, তাহলে কীসের দেবত্ব? কী হবে মনুষ্যত্বকে দেবত্বের পর্যায়ে উন্নীত করে? বস্তুত অমৃত নিয়ে চিরকালীন এক কপট- নাটকের এই যে প্রস্তাবনা হল–তার নিন্দা সইতে হয়েছে দেবতাদেরই। লক্ষ্মী আর অমৃত–অন্য কিছু নয়, মহাভারতের মতে শুধু লক্ষ্মী আর অমৃতের অধিকার নিয়েই দেবতা আর অসুরদের বিরোধ শাশ্বতিক রূপ ধারণ করল-অমৃতার্থে চ লম্ফর্থে মহান্তং বৈরমাশ্রিতাঃ।
এই ঘটনার পর দেবতার প্রতি মানুষের নম্র নেত্রগাত, ধূপের ধোঁয়া আর সুমঙ্গলী স্তুতির নিরিখে দেবতাদের দেখতে চাই না, দেখতে চাই দেবতার বিরুদ্ধ পক্ষ অসুরদের অনুভব আর তর্ক-যুক্তিতে। বাস্তবিক পক্ষে বর্তমান গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন দলের বিপরীত পক্ষে থেকে যে রাজনৈতিক দল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে, সেই বিষময় শব্দরাশির মধ্যে আতিশয্য থাকলেও কখনও যেমন সত্যও থাকে, ঠিক তেমনই অসুরদের চরম আক্ষেপের মধ্যে অতিশয়োক্তি কিছু থাকলেও সত্যও আছে কিছু। বিশেষ করে অমৃত না পাওয়ার যন্ত্রণায় অসুরদের যে সব কথাবার্তা পৌরাণিকেরা লিপিবদ্ধ করেছেন, সে সব কথা মহাভারতের মধ্যে স্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও সৌতি উগ্রশ্রবা অমৃত-মন্থনের কাহিনী বলে দেবতা, অসুর এবং অবশ্যই মানুষের পারস্পরিক স্থিতিটি নির্ণয় করে দিয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কী, পুরাণকারের কথা বুঝলেই মহাভারতের মধ্যে অমৃত-মন্থনের কাহিনীটিও যথাযোগ্য হয়ে পড়বে।
