যেখানে দুই মহাবীরের যুদ্ধাত্মান ঘোষিত হচ্ছে, যেখানে এই মানসিক আঘাতে একতম মহাবীরের হৃদয় কতটা ক্ষত-বিক্ষত হয়, সে ব্যাপারে কর্ণের সমদুঃখভাব ব্যক্ত করেছেন মহাভারতের কবি। এত বড় বীর যে কৃপাচার্যের কথায় এক্কেবারে চুপ মেরে গেলেন, এতে মহাকাব্যের কবিরও আঘাত লেগেছে মনে। তিনি বলেছেন–কৃপের প্রশ্ন শুনে কর্ণের মুখ লজ্জায় অবনত হল–ব্রীড়াবনত আনন। কর্ণ যখন অর্জুনের সঙ্গে প্রতিস্পর্ধা করে যুদ্ধাহ্বান করছিলেন তখন তাঁর মুখটি লাগছিল প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো। এই মুহূর্তে সে ফুল্ল-বিকশিত পদ্মের ওপর কৃপের প্রশ্ন যেন বর্ষার জল ঢেলে দিল–বভৌ ব্যাম্বুবিক্লিন্নং পদ্মমাগলিতং যথা। পদ্মের উপমা কেন? পদ্ম যে পাঁকেও ফোটে। কর্ণও তত সূত–জাতির পঙ্কে পঙ্কজ। যদি বা পাঁকে কর্ণের মতো পদ্মফুল ফুটল, তার ওপরে বর্যার প্রবল জলধারা নামল। সূতজাতির কোমলমৃণাল–মেরুদণ্ডে পদ্মফুল আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না। তার মুখ–পদ্ম আনমিত হল–বর্ষাম্বুবিক্লিন্নং পদ্মমাগলিতং যথা।
ঠিক এই মুহূর্তে এই উপমা দেওয়ার একটা স্বর্গীয় কারণও আছে। সূর্যের তেজে পদ্মফুল ফোটে। সূর্যপুত্র কর্ণ, সূর্যের তেজেই তার জন্ম। কিন্তু বর্ষার মেঘ সূর্য-তেজ আচ্ছন্ন করে। কৃপাচার্যের প্রশ্ন হল বর্ষার ধারাসার। তাতেও বেগও আছে এবং তাতে ক্লেদেরও সৃষ্টি হয়েছে। তাই বর্ষাঘুবিক্লিন্ন পদ্মের মতো কর্ণের মুখ অবনত হল–পদ্মমাগলিতং যথা।
এই মুহূর্তে কর্ণের অসহায় অবস্থা দেখে জননী কুন্তীর হৃদয়ে কত ব্যথা লেগেছিল, তা মহাভারতের কবি বর্ণনা না করলেও আরেক মহাকবি তা লিখেছেন কর্ণকুন্তী সংবাদে। কিন্তু মহাভারতের কবির কাছে জননী-হৃদয়ের এই কারুণ্যের যথেষ্ট মূল্য থাকলেও, এখন তিনি কর্ণের সম্মান-ভাবনায় ভাবিত আছেন। ঠিক যেমন কুন্তীও এই মুহূর্তে ভাবিত আছেন তার কন্যাগৰ্ভজাত পুত্রের সম্মান-ভাবনায়। কর্ণের সম্মান রক্ষায় এগিয়ে আসছেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি পাণ্ডব–বিদ্বেষী, যাঁর সঙ্গে কুন্তীর গর্ভ-সম্বন্ধ নেই এবং যিনি মহাকাব্যের প্রতিনায়ক দুর্যোধন।
দুর্যোধন কৃপাচার্যের ক্লিন্ন কথার প্রবল প্রতিবাদ করলেন। বললেন–আচার্য! আপনি রাজপুত্রের মাহাত্ম খ্যাপন করছেন কোন প্রমাণে? শাস্ত্রের নিয়ম-নীতিতে তিন রকমের মানুষ হলেন রাজা নামের উপযুক্ত। এক তো যিনি বংশ-পরম্পরায় রাজা। দ্বিতীয়, যিনি মহাবীর, তিনি আপন শক্তিবলে রাজশক্তির অধিকারী হন। আর তিন, যিনি নিজের বুদ্ধি-শক্তিতে সেনা পরিচালনা করতে পারেন। স্বীকার করা গেল কর্ণ বংশের কৌলীন্যে রাজা বা ক্ষত্রিয় নন। কিন্তু বীরত্বের নিরিখে, সেনা পরিচালনার নিরিখে কর্ণের রাজোপাধির বাধা কোথায়?
দুর্যোধনের কথার যুক্তি অবশ্যই আছে। ধর্মশাস্ত্রের নিয়মে যিনি আপন ভুজবলে রাজ্যখণ্ড অধিকার করেছেন, তিনি হীনবর্ণের মানুষ হলেও তার ক্ষত্রিয়ত্ব বা রাজ-পদবি সিদ্ধ হয়। দুর্যোধনও সেই কথাই বলেছেন। কিন্তু তাতেও যদি বলা হয়–কই কর্ণের এই শাসিত ভূখণ্ডটি কোথায়–সেই অপমান-নিবৃত্তির জন্য দুর্যোধন বললেন–এমন যদি হয় যে, অর্জুন রাজা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে যুদ্ধ করবেন না, তো ঠিক আছে, এই মুহূর্তে আমি কর্ণকে অঙ্গরাজ্যের রাজপদে অভিষিক্ত করছি–তস্মদেষোঙ্গবিষয়ে ময়া রাজ্যেভিষিচ্যতে।
সেই মুহূর্তেই দুর্যোধনের আদেশে হস্তিনাপুরের পুররমণীরা স্বর্ণঘটে জল নিয়ে এল। কর্ণকে দাঁড় করানো হল স্বর্ণময় পাদপীঠে। মেয়েরা কর্ণের জয়কার দিতে দিতে মঙ্গল উচ্চারণ করল। ব্রাহ্মণরা অভিষেক মন্ত্রে আপ্যায়িত করলেন কর্ণকে–কাঞ্চনৈঃ কাঞ্চনে পীঠে মন্ত্রবিদ্ভি-মহারথঃ। কর্ণ অঙ্গরাজ্যের অধিপতি হলেন। এই আধিপত্য-লাভের সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোধনের নির্দেশে একজন কর্ণের মাথার ওপর রাজছত্র ধারণ করল, কেউ বা ডুলাতে লাগল চামর। বৈতালিকেরা জয়কার দিলেন কর্ণের–সছত্র-বালব্যজননী জয়শব্দোত্তরেণ চ।
সেই শৈশব কাল থেকে পালক পিতা অধিরথ এবং স্নেহময়ী রাধার ভালবাসা কর্ণ কিছু কম পাননি। কিন্তু এই সম্মান, এই রাজসম্মান তার আর কে দিয়েছে? নিজের সূতজাতির হীনত্ব অতিক্রম করে এই রাজকীয় মর্যাদা কর্ণকে যতখানি আহ্লাদিত করল, ঠিক ততখানি কৃতজ্ঞ করে তুলল দুর্যোধনের প্রতি। আপ্লুত, গদগদ কর্ণ দুর্যোধনকে বললেন–তোমার এই রাজ্যদানের কী প্রতিদান আমি দিতে পারি–অস্য রাজ্যপ্রদানস্য সদৃশং কিং দদানি তে? তুমি বলো দুর্যোধন! আমি কী দিতে পারি তোমাকে? দুর্যোধন কিছু চাইলেন না। আজীবন পাণ্ডববিদ্বেষী দুর্যোধন তাঁর আপন বিদ্বেষ আরও ভালভাবে চরিতার্থ করার জন্য তিনি শুধু কর্ণকে পাশে পেতে চান সব সময়। বললেন–আমি তোমার চরম বন্ধুত্বটুকুই শুধু চাই, আর কিছু নয়–অত্যন্তং সখ্যমিচ্ছামি ইত্যাহ তং সুযোধনঃ। কর্ণ স্বীকার করলেন–সম্পদে-বিপদে সদা সর্বদা তিনি দুর্যোধনের বন্ধু থাকবেন। কর্ণ-দুর্যোধনের গাঢ় আলিঙ্গনে এই বন্ধুত্ব সকলের সামনে স্বীকৃত হয়ে গেল।
এই বন্ধুত্বে পাণ্ডব-পক্ষের কেউই খুশি হলেন না। খুশি হলেন না কুরুবৃদ্ধরাও। শুধু কৌরবপক্ষ ছাড়াও আর একজন যদি এই বন্ধুত্বে আপাতত খুশি হয়ে থাকেন, তিনি জননী কুন্তী। কর্ণ তাঁর প্রথম পুত্র, তিনি আজ রাজমর্যাদা লাভ করেছেন। বিশেষত তার দুই পুত্রের দ্বন্দ্বযুদ্ধ আপাতত শান্ত হয়েছে। কুন্তী তাই আশ্বস্ত বোধ করছে এখন।
