ভীম-দুর্যোধনের গদাযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন দ্বন্দ্বযুদ্ধের আকার গ্রহণ করল তখন দ্রোণাচার্য নিজ-পুত্র অশ্বত্থামার মাধ্যমে তা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু কর্ণ যেহেতু অর্জুনের সঙ্গে তাঁর আচার্যকেও ছাড়েননি, তাকেও কর্ণ যেহেতু যথেষ্ট কটুকথা বলেছেন, অতএব দ্রোণাচার্য এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্বয়ং ইনভলভড হয়ে গেছেন। তিনি যুদ্ধ বারণ করছেন না, তিনি চাইছেন–তার শিক্ষা কীরকম–প্রমাণ হয়ে যাক এখনই। এই অবস্থায় কুলগুরু কৃপাচার্য এগিয়ে এলেন এই দুই ভয়ঙ্কর উন্মুখ প্রতিদ্বন্দ্বীর যুদ্ধ নিবারণ করার জন্য। কৃপাচার্য জানেন বা ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছেন যে, এঁরা দুজনেই বড় মাপের যোদ্ধা। কিন্তু দুজনের উক্তি–প্রত্যুক্তি থেকে যা বোঝা গেছে–তাতে অর্জুনকে থামালে তিনি থামবেন, কিন্তু কর্ণ যে ভাষায় যে তীক্ষ্ণতায় কথা বলেছেন, তাতে যুদ্ধ লাগলে তাঁকে থামানো মুশকিল হবে এবং এই দুইজনের একজন সমূহ বিপদগ্রস্ত হতে পারেন। কৃপাচার্য একটু কৌশল অবলম্বন করলেন।
কৃপাচার্যের এই কৌশল আধুনিকমনা প্রগতিবাদীর কাছে অত্যন্ত হীন প্রতিপন্ন হয়েছে এবং সত্যিই তা হীনও বটে, কিন্তু তৎকালীন সমাজের নিরিখে তথা যে কোনও উপায়ে যুদ্ধ বন্ধ করার ব্যাপারটা যদি ভাল করে বোঝা যায় তবে কৃপায়ের দিকেও কিছু যুক্তি অবশ্য আছে। কৃপাচার্য অর্জুনকে ধনুক তুলতে দেখে কর্ণকে বললেন–এই অর্জুন পৃথা-কুন্তীর গর্ভজাত কনিষ্ঠ পুত্র। প্রসিদ্ধ কুরুবংশে এঁর জন্ম এবং প্রয়াত মহারাজ পাণ্ডুর তৃতীয় পুত্র। ইনি অবশ্যই তোমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন–কৌরবো ভবতা সার্ধং দ্বন্দ্বযুদ্ধং করিষ্যতি। এবারে কর্ণ! তুমিও তোমার মাতা-পিতার পরিচয় দাও এবং কোন রাজবংশে তোমার জন্ম তাও আমাদের জানাও। তোমার সব কথা জানার পর এই পার্থ অর্জুন তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করতেও পারেন, আবার নাও পারেন–প্রতিযোৎস্যতি বা ন বা। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখ–একজন রাজপুত্র কখনও এক হীনবংশ হীনাচার ব্যক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করেন না–বৃথা কুলসমাচারে- যুধ্যন্তে নৃপাত্মজাঃ।
কথাগুলি ভয়ঙ্কর কটু, বিশেষত আধুনিক শিক্ষা এবং রুচিতে কারও হীনজাতিত্ব প্রমাণ করে তার প্রতিভা অস্বীকার করাটা আমাদের মতে দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া উচিত। সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে কৃপাচার্যকে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু কৃপাচার্য বৃদ্ধ এবং জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি কুরুবংশে লালিত হচ্ছেন মহারাজ শান্তনুর সময় থেকে। বিশেষত তিনি আচার্য, তার সামনেই তার পরম আত্মীয় এবং আচার্য দ্রোণ কর্ণের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন। সে কালের সমাজ-নীতি, রাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধনীতি এবং নীতিযুক্তিও কৃপাচার্যের নখদর্পণে–দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ-সমাচারে কুশলঃ সর্বধর্মবিৎ।
সেকালের যুদ্ধনীতির মধ্যে কতগুলি কর্তব্য-অকর্তব্যের বাঁধন ছিল। কোন কোন অস্ত্র প্রয়োগ করা যাবে এবং যাবে না, কোন অবস্থায় করা যাবে এবং যাবে না, কার ওপরে প্রয়োগ করা যাবে এবং যাবে না–সে বিষয়ে যেমন কিছু সুস্পষ্ট নীতি ছিল তেমনই দ্বন্দ্বযুদ্ধেরও কতকগুলি নিয়ম ছিল। সেই নিয়মে একজন রাজা বা রাজপুত্র যেমন অসমান বা হীনবর্ণ মানুষের সঙ্গে যুদ্ধে নামতেন না তেমনই একজন উচ্চবর্ণের মানুষের সঙ্গেও দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন না। এই মহাভারতের মধ্যেই কখনও কখনও এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে ক্ষত্রিয়ের দ্বন্দ্ব যুদ্ধের উদ্যোগ ঘটেছে। দেখবেন–ক্ষত্রিয় অনেক হম্বিতম্বি করছেন, মেরে ফেলব বলে ভয় দেখাচ্ছেন, কিন্তু বারবারই তার মুখ দিয়ে শোনা যাবে–ব্যাটা! তুই যদি ব্রাহ্মণ না হতি, তবে এই মুহূর্তে তোকে..ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কখনই এইসব দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিণতি ঘটেনি।
উচ্চবর্ণের সঙ্গে যেমন, নিম্নবর্ণের ক্ষেত্রেও তাই। আধুনিক সমাজের মানসিকতায় হীনবর্ণের কথা উচ্চারণ করলে আমাদের খারাপ লাগে, কিন্তু উচ্চবর্ণের ঘটনায় এসব আমাদের মনে থাকে না। কিন্তু নিয়ম-নীতি একই রকম এবং কৃপাচার্য যে নিয়ম যথেষ্টই জানেন–দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ-সমাচারে কুশলঃ। অতএব একজন রাজা রাজপুত্র অন্তত দ্বন্দ্বযুদ্ধের সময় হীনবর্ণের মানুষ এমনকি হীনচেতার সঙ্গেও সমানে সমানে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন না। ক্ল্যাসিক্যাল যুগের কোনও নাইট বা ব্যারন একজন কৃষকের সঙ্গে ডুয়েল লড়তেন না কখনই। এখানেও সেই ভাবনাটা তৎকালীন যুগের বিবেচনায় অসভ্য নয়।
দ্বিতীয় কথা হল–কৃপাচার্য বুঝেছেন–যেভাবেই হোক যুদ্ধটা থামাতে হবে। শিক্ষাবিজ্ঞানের অভিজ্ঞ পণ্ডিতদের কাছে শুনেছি–একটি ক্লাসরুমে সমবয়সী ছাত্রদের মধ্যে যে একটু বেশি জানে এবং সেই জানার দরুন সচেতনভাবে সে যদি বেশি ফটর-ফটর করে, তবে নাকি মাস্টারমশাইয়ের উচিত সেই অত্যুৎসাহী ছাত্রকে একটু দমিয়ে দেওয়া। এখানে কর্ণ যেভাবে আচার্য দ্রোণকেও প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বীর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন এবং তাও সেটা যে ভাষায়, তাতে কর্ণকে অন্যভাবে আঘাত না করলে তার বাড় আরও বেড়ে যেত। তাছাড়া কর্ণের দুর্বল জায়গায় আঘাত না করলে তিনি থামতেন বলেও মনে হয় না। অথচ যেভাবে হোক এই সমুদ্যত দ্বন্দ্বযুদ্ধ থামাতেই হবে। অতএব কৃপাচার্য অত্যন্ত কঠিনভাবে কর্ণের দুর্বল জায়গায় আঘাত করলেন–তোমার পিতা-মাতা, রাজবংশের পরিচয় বল–কথয়স্ব নরেন্দ্রাণাং যেষাং ত্বং কুলভূষণম্।
