.
১০৭.
কর্ণ অর্জুনকে একেবারে নস্যাৎ করে দিয়ে বললেন–ওরে তুই যে আমায় গালমন্দ করলিনা ডাকতে এসেছি–ইত্যাদি ইত্যাদি–এসব কথা মানায় কাদের জানিস। দুর্বল লোকেরাই নানা কথা বলে আসল বস্তু থেকে সরে যাবার চেষ্টা করে। তুই ধনুকে শর-যোজনা করে বাণের আগায় কথা বল–কিং ক্ষেপৈঃ দুর্বয়াসৈঃ শরৈঃ কথয় ভারত। এই যে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তোর গুরুদেব দ্রোণাচার্য, তার সামনেই তোর মাথাটা ধড় থেকে নামিয়ে দেব–গুরোঃ সমক্ষং যাবত্তে হরাম্যদ্য শিরঃ শরৈঃ।
কর্ণের দম্ভোক্তি কোন চূড়োয় পৌঁছেছে! সাধারণ প্রাকৃত জন যেমন অতিক্রাধে দম্ভোক্তি করে বলে–তোর বাপ এলেও আমার কিছু করতে পারবে না–এই উক্তি প্রায় সেই রকম। সর্বজনমান্য দ্রোণগুরুর সামনে তার সর্বশ্রেষ্ঠ শিষ্যকে এইভাবে অপমান করা মানে পরোক্ষে সেই দ্রোণকেই অপমান করা–যে দ্রোণকে কর্ণ শুধু অর্জুনের শিক্ষাগুরু বলেই হীন মনে করেন। এবং তার কাছে তিনি ব্রহ্মাস্ত্রের সাহায্য পাননি বলে তাকে ঘৃণাও করেন। এই কথা বলে কর্ণ আরও দেখাতে চাইলেন যে–তুই তোর গুরুর কাছে কী শিখেছিস আর আমি বা আমার গুরুর কাছে কী শিখেছি, তার পরীক্ষা হয়ে যাক এখনই।
দ্রোণাচার্য কর্ণের ইঙ্গিত-অপমান যথেষ্ট বুঝলেন–আর তো দেরি করা যায় না। তিনি অর্জুনকে অনুমতি দিলেন যুদ্ধ করবার জন্য। চার পাণ্ডব ভাই অর্জুনকে আলিঙ্গন করে উৎসাহ জানালেন। অন্যদিকে কৌরব ভাইরা আলিঙ্গন করলেন কর্ণকে। ভাবটা এই–হয়ে যাক এপার-ওপার। সুসজ্জিত ধনুক-বাণ হাতে নিয়ে অর্জুন এসে দাঁড়ালেন এক পাশে, আরেক পাশে শরাসন হাতে কর্ণ–স্থিতঃ কর্ণঃ প্রগৃহ্য সশরং ধনুঃ।
মহাকাব্যের কবি আর লোভ সম্বরণ করতে পারেননি। দুই দেবপুত্র-ইন্দ্রপুত্র অর্জুন আর সূর্যপুত্র কর্ণ পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছেন–অতএব মর্ত্যলোকের মর্ত বর্ণনার মধ্যে মহাকাব্যের কবি এখন স্বর্গের ছোঁয়া লাগাবেন। নিজের ঔরসজাত পুত্র আজ প্রথম যুদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন দেখে দেবরাজ ইন্দ্র আকাশ-মার্গে উপস্থিত হলেন রঙ্গ দেখার জন্য। ইন্দ্র এলেন মানেই, তার সঙ্গে রাশি রাশি মেঘ এসে জমা হল আকাশে, রামধনুর শোভার সঙ্গে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের গর্জন উৎসাহিত করল অর্জুনকে। নীল মেঘের তলায় বকপংক্তির উল্লাস যেন মঙ্গল উচ্চারণ করল অর্জুনের জন্য। সুনীল গগন মণ্ডলে বলাকার হাসি উপহার দিয়ে ইন্দ্রদেব যেন মেঘের ছাতা বিছিয়ে দিলেন অর্জুনের মাথায়–আবৃতং গগনং মেঘৈ-বলাকা পংক্তিহাসিভিঃ।
দেবরাজ ইন্দ্রের এমনতর পুত্র-পক্ষপাত দেখে সূর্যদেবও উপস্থিত হলেন রণাঙ্গনে। তিনি আপন তেজে যথাসম্ভব মেঘরাশি দূরীভূত করে নিজের প্রসন্ন দক্ষিণ মুখখানি প্রকাশ করে রাখলেন। কর্ণের মধ্যে নিহিত করলেন আপনার সহস্র কিরণ করাঙ্গুলির স্পর্শ। কেমন দেখাল? ইন্দ্রও কম যান না, সূর্যও কম যান না। কেউ কাউকে ফেড়ে দেবেন না। মর্ত্যলোকে কর্ণার্জুনের যুদ্ধের ইঙ্গিতে দেবলোকেও এক অলৌকিক প্রতিদ্বন্দিতা শুরু হল আকাশপথে। রঙ্গস্থলের অর্ধেকটায়–যেখানে অর্জুন দাঁড়িয়ে আছেন–সেই অর্ধেকটা মেঘাচ্ছন্ন করে রাখলেন ইন্দ্র–মেঘচ্ছায়োপগূঢ়স্তু ততোদৃশ্যত ফাল্গুনঃ। আর অর্ধেকটা যেখানে কর্ণ দাঁড়িয়ে আছেন–সেই অর্ধেকটা আলোকিত করে রাখলেন সূর্যদেব, আলোকিত করে রাখলেন কর্ণকে –সূর্যতাপ-পরিক্ষিপ্তঃ কর্ণোপি সমদৃশ্যত।
আকাশমার্গের এই দ্বিধা ভিন্ন অভিসন্ধি মর্তের মনেও কাজ করল। কৌরবরা একশো ভাই দাঁড়ালেন কর্ণের পিছনে। আর দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, ভীষ্মের মতো কুরুবৃদ্ধরা দাঁড়িয়ে রইলেন যেদিকে অর্জুন আছেন।
ভীম এবং দুর্যোধনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়ে যেমন হয়েছিল, আবারও সেইরকম রোল উঠল দর্শকাসনে বসা মানুষগুলির মধ্যে। তারা দুই ভাগ হয়ে গেল। কেউ অর্জুনের হয়ে চিৎকার করতে লাগল, কেউ বা কর্ণের আগাম জয় ঘোষণা করতে লাগল। সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল রঙ্গ–দর্শনোৎসুকা রমণীকুলের মধ্যে। হস্তিনাপুরের পুর-রমণীরা যারা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যেও এক দ্বৈধভাব দেখা গেল। যাঁরা প্রধানত কৌরব ভাইদের পরিচারিকা, বা জননী গান্ধারীর কাছাকাছি থাকা মানুষ তারা কর্ণকে সমর্থন করতে লাগলেন। আর যারা জননী কুন্তীর পক্ষপাতিনী, তাঁরা সমর্থন করতে লাগলেন অর্জুনকে।
কিন্তু এই অদ্ভুত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সবচেয়ে বেশি যিনি বিমূঢ়া হলেন, তিনি জননী কুন্তী। তিনি যে কর্ণকে চিনতে পেরেছেন। আপন গর্ভজাত দুই পুত্র দুজনে দুজনের দিকে শরসন্ধান করছে–এই সাংঘাতিক ঘটনা দেখে কুন্তী ক্ষণিকের মধ্যে জ্ঞান হারালেন–কুন্তীভোজসুতা মোহং বিজ্ঞার্থা জগাম হ। কুন্তীকে এইভাবে নিজাসনে সংজ্ঞাহীন হতে দেখে মহামতি বিদুর তাড়াতাড়ি করে এলেন কুন্তীর কাছে। পরিচারিকারা বিদুরের ইঙ্গিতে চন্দনের গন্ধ দেওয়া সুবাসিত জল এনে ঝাঁপটা দিল কুন্তীর চোখে-মুখে–কুন্তীমাশ্বাসয়ামাস প্ৰেষ্যাভিশ্চন্দ নোদকৈঃ। কুন্তীর জ্ঞান তাতে ফিরে এল বটে, কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন–তার দুই ছেলেই রাগে ঠোঁট কামড়াচ্ছে। কুন্তী যে কী করবেন কিছুই বুঝতে পারলেন না। একবার ভাবলেন–এক্ষুণি ছুটে গিয়ে সব রহস্য মোচন করবেন সবার সামনে, আবার ভাবলেন–এতদিন পর, বিশেষত কর্ণের জন্ম–যন্ত্রণা, মনের অবস্থার নিরিখে তিনি যদি সকলের সামনে প্রত্যাখ্যাত হন, তবে সে কষ্টই বা তিনি সহ্য করবেন কী করে? ঠিক এই অবস্থায় এক অসাধারণ আপতিক সৌভাগ্য কুন্তীর জননী-হৃদয়কে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করল।
