আর এতাবৎ পর্যন্ত সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর, অর্জুনকে যে এমন লজ্জায় ফেললেন মহাকাব্যের কবি, তারও কারণ হল–তিনি অর্জুনকেও বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। যে মহাবীর তার ভবিষ্যতের নায়ক হবেন, সেই যুবক পুরুষ কতগুলি অল্পশিক্ষিত যোদ্ধার মধ্যে নিজের বিদ্যা দেখিয়েই নায়কে পরিণত হবেন, সেটি হতে দেবেন না মহাকাব্যের কবি। কর্ণের মুখ দিয়ে তাই অর্জুনকে শুনতে হয়েছে–নিজের কর্ম-ক্রিয়াকে অসাধারণ মনে করে আপনাতে আপনিই বিস্মিত হয়ো না–মাত্মনা বিস্ময়ং গমঃ! এই কৌরব-পাণ্ডব ভাইরা ছাড়াও আরও এক বৃহৎ জগৎ আছে। সেখানে তোমার প্রতি কেউ পক্ষপাত দেখাবে না কোনও দ্রোণ-কৃপ সেখানে তোমাকে রক্ষা করবেন না, সেই জগতের সম্মুখীন হতে হবে তোমার নিজেকেই। এবং দেখো, এই মুহূর্তেই দেখো–দ্রোণ–গুরু কর্ণের মুখ স্তব্ধ করে দিলেন না, তিনি অনুমতি দিলেন কর্ণকে তার কৌশল দেখাবার জন্য–ততো দ্রোণাভ্যনুজ্ঞাতঃ কর্ণঃ প্রিয়রনঃ সদা।
কর্ণ যা বলেছিলেন, তাই করলেন। সমবেত জনতার সামনে, মান্য কুরুবৃদ্ধদের সামনে অর্জুন যা যা আশ্চর্য কর্ম করে দেখিয়েছিলেন, একে একে সে সবই করে দেখালেন কর্ণ–যৎ কৃতং তত্র পার্থেন চ্চকার মহাবলঃ। অর্জুন লজ্জায় মাটিতে মিশে গেলেন। আর সেই প্রায় বিবশা জননী কুন্তী! তার কী হল? তার প্রথমজন্মা অনাদৃত পুত্রের কৃতিত্বে একদিকে তিনি স্ফীত বোধ করলেন, আরেক দিকে তার স্বীকৃত পুত্রের মুখ চেয়ে বিমনা হলেন। এ কীরকম হর্ষ এবং বিষাদ। দুটিই এত চরম যে তার বিবশতা ছাড়া কীই উপায় থাকতে পারে নিজের কাছে লুকোবার।
কর্ণের স্পর্ধা এবং নিপুণতা দেখে পরম পুলকিত দুর্যোধন ভাইদের সঙ্গে আসন থেকে নেমে এসে জড়িয়ে ধরলেন কর্ণকে–কর্ণং পরিঘজ্য মুদা ততো বচনমব্রবীৎ। বললেন– ভাগ্যিস আজ তুমি এখানে এসেছিলে–তুমি যে কত আমার মান বাড়িয়েছ, সে তুমি নিজেও জান না–স্বাগতং তে মহাবাহো দিষ্টা প্রাপ্তোসি মানদ। এখন থেকে তুমি আমার সঙ্গেই থাকবে এবং এই কুরুরাজ্যের সমস্ত ভোগও তোমার প্রাপ্য–যথেষ্ঠমুপভুজ্যতাম্। দুর্যোধনের সমাদরে কর্ণ একেবারে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। বললেন–অন্য কোনও ভোগই আমি চাই না, আমার প্রয়োজনও নেই তাতে। আমি শুধু তোমার বন্ধুত্ব চাই–কৃতং সর্বেন তেন্যেন সখিত্বত্ত ত্বয়া বৃণে। আরও একটা জিনিস আমি চাই তা হল–এই মুহূর্তেই আমি অর্জুনের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করতে চাই।
কর্ণ একটু বেশি আপ্লুত হয়ে পড়েছেন। দুর্যোধনের বন্ধুত্ব তিনি চান–সে বেশ কথা। কিন্তু তিনি তার হৃদয়টি পড়ে ফেলে তাকে একেবারে ভিজিয়ে তুলেছেন স্তাবকতায়। দুর্যোধনকে তিনি প্রভু বলে সম্বোধন করে বলছেন–আমি অর্জুনের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামতে চাই প্রভু। দুর্যোধন পাকা বুদ্ধিমান লোক। তিনি তো আর সবার সামনে হৃদয় উজাড় করে বলতে পারেন না যে,–হ্যাঁ অর্জুনকে একটু উচিত শিক্ষা দাও তো ভাই। তিনি তাই কৌশল করে বললেন–আমার সমস্ত ভোগে তোমারও অধিকার আছে বন্ধু। তুমি সব সময়েই এই বন্ধুটির প্রিয় কার্য সাধন করো। আর যারা তোমার শত্রু তাদের মাথায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো তুমি–দু হৃদাং কুরু সর্বেষাং মূর্মি পাদমরিন্দম।
দুর্যোধনের এই বক্রোক্তি অর্জুনের কাছে মোটেই সহনযোগ্য নয়, আর কর্ণের কথাটা তো নয়ই। কর্ণ অর্জুনকে সোজাসুজি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন, সে চ্যালেঞ্জ অর্জুন ছেড়ে দিতে পারেন না। তবু অর্জুন বড় ভদ্র। তিনি হঠাৎ মাথা গরম করে এক মানসিক প্রস্তুতিহীন যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে পারেন না। যিনি ভবিষ্যতে এক উদাত্ত নায়কে পরিণত হবেন, তার কথাবার্তার ধরন–ধারণ সাধারণের মতো হবে না। অর্জুন একটু যেন অভিমানীর মতো বলে উঠলেন–যাদের কেউ ডাকেনি, তারা যদি এসে উপস্থিত হয়, যাদের বলতে বলা হয়নি, তারা যদি এসে মেলা বকতে থাকে–অনাহুতোপসৃষ্টানা অনাহূপেজল্পিনাম–তাদের জন্য পরলোকে যে জায়গাটা ঠিক করা আছে আগে থেকেই, আমি তোমাকে হত্যা করলে তোমার যে সেই অধম লোকে গতি হবে, কর্ণ!
এর উত্তরে দুর্যোধনের মদতপুষ্ট কর্ণ কোনও মহান, মধুর, সভ্য কথা বলেননি এবং ঠিক এইখানেই মহাশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির কুসঙ্গে থাকার কুমহিমাটুকু ব্যক্ত হয়েছে। তার আশৈশব-লালিত মানসিক জটিলতার সঙ্গে দুর্যোধনের তাচ্ছিল্যের স্বভাব পশ্চাদযুক্ত হওয়ায় অর্জুনের প্রতি তাঁর ভাষাটা হল এইরকম–আরে যাঃ! এই রঙ্গস্থলটা শুধু তোর একার জায়গা নাকি রে, অর্জুন! এখানে সবার অধিকার সমান। আমাকে কেউ ডেকেছে কি না ডেকেছে, সে কথা একেবারেই অবান্তর। তাছাড়া না ডাকতেই না হয় আমি এসেছি, তাতে তোর কী–রঙ্গোয়ং সর্বসামান্যঃ কিমত্র তব ফানঃ? এখানে বড় বড় রাজারা অনেকেই আছেন, তারা বলুন কিছু? কই তারা তো কিছু বলছেন না, কারণ ধর্ম বা নীতি-নিয়ম শক্তিমানকেই অনুসরণ করে–বলং ধর্মোনুবর্ততে।
আসলে এইটাই কর্ণের ফিলজফি। কর্ণ জানেন–শক্তি যদি থাকে, পুরুষকার যদি থাকে, তবে নীতি-নিয়ম-শৃঙ্খলা তারই মতে তৈরি হবে নতুন করে। ধর্ম শক্তিমানকে অনুসরণ করবে, শক্তিমান ধর্মের অনুসরণ করেন না–বীর্যশ্রেষ্ঠা হি রাজানঃ বলং ধর্মোনুবর্ততে। কর্ণের এই কথাগুলির মধ্যে যত শক্তিই থাকুক, যত পৌরুষই থাকুক, ভারতবর্ষের মাটিতে শক্তি কিংবা পুরুষকার যদি ধর্ম-শৃঙ্খলার অনুবর্তী না হয় তবে পরিণামে সে শক্তি জয়ী হয় না। কর্ণের বীর্যোৎসিক্ত কথাগুলির মধ্য দিয়েই মহাভারতের কবি তার দুর্ভাগ্য রচনা করছেন। তাঁর শতগুণ-বর্ণনা করেও সেই গুণের বিপদটুকুও তিনি দেখিয়ে দিলেন।
