মহাভারতের কবি সমস্ত মহাকাব্য জুড়ে তার নায়ক অর্জুনের জয়কার ঘোষণা করেছেন বলে শত্রুপক্ষের ওই মহাবীরের ওপর তিনি মোটেই অকরুণ নন। রঙ্গ-প্রবেশের সময় কর্ণের স্বত-উদ্ভাসিত চেহারার বর্ণনা দিচ্ছেন মহাভারতের কবি। সেই জন্ম-লব্ধ সোনার বর্ম কর্ণের বুকে আঁটা রয়েছে, কানের কুন্তল–দ্যুতিতে তার মুখখানি স্বত-উদ্ভাসিত-সহজং কবচং বিভ্রৎ কুণ্ডলোদ্দ্যোতিতাননঃ। স্কন্ধে ধনুঃশর, কটিদেশে লম্বিত কৃপাণ। সিংহের মতো শক্তিমান লম্বা-চওড়া তার চেহারা, আগুনের মতো ব্যক্তিত্ব এবং তার মধ্যে তার গায়ের রঙ, মুখের সৌন্দর্য যেন আকাশের সূর্য–চন্দ্রকে এক দেহে নামিয়ে এনেছে–দীপ্তিকান্তি দ্যুতিগুণৈঃ সূর্যেজ্বলনোপমঃ।
রঙ্গ-প্রবেশ দ্বারের অপর কোটিতে স্ত্রীলোকের মধ্যে বসা এক অসহায় জননী এই যুবক–পুরুষটিকে চিনলেন। সেই দীপ্তি, সেই তেজ সেই সোনার কবচ-কুণ্ডল। প্রথম যৌবনের প্রথম অপরাধ নিজের লজ্জা ঢাকবার জন্য এক কন্যা-জননী এই যুবক-পুরুষকে অতি শৈশবেই জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। রাজপ্রাসাদের বাইরে অশ্ব-নদীর পারে দাঁড়িয়ে সেই জননী কুন্তী সমস্ত দেবতার কাছে সকরুণ প্রার্থনা জানিয়েছিলেন–তার ছেলেটি যেন বেঁচে থাকে।
ছেলে তার বেঁচে আছে। কিন্তু এ কী হল আজ? পুত্রকে জীবিত দেখে তার জননী-হৃদয়ের সমস্ত বাৎসল্যের সঙ্গে এক অজানা ভয় তাকে যে প্রায় অবশ করে তুলছে। তার কন্যাবস্থার প্রথম পুত্রটি তারই গর্ভজাত আরেক সন্তানের প্রতিযোগী হয়ে রঙ্গ-মঞ্চে প্রবেশ করছে। ভাই ভাইকে চিনতে পারছে না, সূর্যের ঔরসজাত পুত্রটি ইন্দ্রের ঔরসজাতকে চিনতে পারছেন না ভ্রাতা ভ্রাতরম্ অজ্ঞাতঃ সাবিত্রঃ পাকশাসনিম। কিন্তু সূর্য আর ইন্দ্রের শক্তি-নিবেশের সেই সাধারণ আধার কুন্তী এ দুঃখ সইবেন কী করে? তিনি অবশ হয়ে পড়ছেন। এতকাল ধরে কর্ণের জন্য সঞ্চিত সেই মাতৃস্নেহের সহজ সুত ধারাটি ভয়ে স্তব্ধ হয়ে আসছে যেন। গান্ধারীকে এতক্ষণ যিনি ধারা-ভাষণ দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই ভাষণ এখন কোথায়? তিনি যে অবশ হয়ে পড়ছেন।
কর্ণ দ্বার ছেড়ে রঙ্গস্থলের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন একক বীরের মাহাত্ম্যে। সমস্ত রঙ্গস্থলের চারদিকে–সর্বততা রঙ্গমণ্ডল–একবার তাচ্ছিল্যভরে তাকালেন। যেন একটু ঠাহর করে নিলেন রঙ্গের পরিবেশটুকু। দ্রোণাচার্য এবং কৃপাচার্যের দিকে এক সেলাম ঠোকার মতো করে প্রণাম জানালেন চরম অনাদরে, অবহেলায়–প্রণামং দ্রোণ-কৃপয়ো-নাত্যাদৃতমিবাকরোৎ! ভাবটা এই–তোরা আবার গুরু! যা শিখতে চাইলাম, শেখালি না। কিন্তু কী করতে পেরেছিস আমার। যা শেখার তা আমি শিখে এসেছি।
কর্ণ অর্জুনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন সামনা-সামনি। বললেন–অনেক তো খেলা দেখালে বাপু! দেখালে যেন কত বিশেষ বিলক্ষণ অস্ত্রযোজনা তুমি জান। তুমি যা ক্ষমতা দেখিয়েছ, তাতে নিজেকে নিয়ে অত অবাক হয়ো না কিছু। কারণ যা যা তুমি করে দেখিয়েছ, তার চেয়ে অনেক বেশি কায়দা-কেতা আমি সবার সামনে করে দেখাব–করিষ্যে পশ্যতা নৃণাং মাত্মনা বিস্ময়ং গমঃ।
কর্ণের কথা শুনে রঙ্গস্থলের সমবেত জনতা একেবারে লাফ দিয়ে দাঁড়াল। স্প্রিং ছেড়ে দিলে তার ওপরে থাকা বস্তুপিণ্ড যেমন হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে, সমবেত জনতা তেমন করেই অবাক হয়ে উঠে দাঁড়াল–বলে কি লোকটা! অর্জুনের থেকেও বেশি করবে? অর্জুনের অস্ত্রচালনার কৌশল দেখে তাদের মনে যে ঘোর লেগেছিল, সে ঘোর এক মুহূর্তে কেটে গেল। তারা কর্ণের কৌশলে পুনরায় বেঘোর হতে চায়–যন্ত্ৰোক্ষিপ্ত ইবাতস্থৌ ক্ষিপ্রং বৈ সর্বতো জনঃ। দর্শকদের এই ভাব-পরিবর্তনে দুর্যোধন ভারি খুশি হলেন। পাণ্ডব অর্জুন এতক্ষণ ধরে দর্শকদের মনে যে সাড়া জাগিয়েছিলেন, তা হঠাৎ গতি পরিবর্তন করায় পাণ্ডব-বিদ্বেষী দুর্যোধন পরম আহ্লাদিত হলেন। আর অন্যদিকে সবার সামনে, আচার্যের সামনে, কৌরবদের সামনে এইভাবে নস্যাৎ শব্দ শুনে যুগপৎ লজ্জা এবং ক্রোধে আরক্ত হয়ে উঠলেন–হ্রীশ্চ ক্রোধশ্চ বীভৎসুং ক্ষণেনাম্বাবিবেশ হ।
রঙ্গস্থলে ঢুকে কৌশল দেখাব বললেই কৌশল দেখানো যায় না। রঙ্গস্থলের একটা শৃঙ্খলা আছে। এই অস্ত্র-রঙ্গ প্রদর্শনীর মূল হোতা যেহেতু দ্রোণাচার্য, কাজেই তিনি এখানে সব। তার অনুমতি ছাড়া এখানে কিচ্ছুটি করা যাবে না। কর্ণকে অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হলেও এখানে দ্রোণের অনুমতি চাই। অর্জুনের প্রতি পূর্ব-পক্ষপাতে এবং আপাতত কর্ণের তাচ্ছিল্যে দ্রোণাচার্য এই অনুমতি নাও দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি দিলেন, অনুমতি দিলেন। দিলেন কেন? হয়তো এর পিছনে দ্রোণের এমন এক কৌতূহল কাজ করেছে যে, তার কাছে বিশেষ কিছু না শিখেও কেমন অস্ত্রবিদ্যা শিখেছে কর্ণ। দ্বিতীয় কারণ হয়তো দ্রোণও জানেন না। যেহেতু সে কারণ মহাভারতের কবির অন্তরশায়িত এক মহাকাব্যিক কারণ।
কবি যে মহাকাব্য লিখতে বসেছেন! এখানে সামান্য তাচ্ছিল্য বা ব্যক্তিগত ক্রোধ খুব ছোট ব্যাপার। মহাকাব্যের পরিসরে–যে গুরু দ্রোণাচার্য তার একতম শিষ্যকে চরম অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে আপন মনেই সন্তুষ্ট হয়ে ভাবলেন–এই সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর, এবং আমার চাইতে বেশি শিক্ষা কেউ দিতে পারে না, মহাকাব্যের কবি তাকে বাস্তব জগৎ চিনিয়ে দিয়ে বোঝান–তুমি ছাড়াও আরও গুরু আছেন, দ্রোণাচার্য! তারাও অনেক কিছু পারেন, তাঁদের ক্ষমতাও দেখো। আপনাতে আপনিই সন্তুষ্ট হয়ো না।
