এই অব্রাহ্মণত্ব যে মিথ্যাভাষণের ফল, সে কথা পরশুরামের আক্ষেপ শুনলেই বোঝা যায়। নইলে ক্ষত্রিয় হওয়া সত্ত্বেও অর্জুন ব্রহ্মাস্ত্র লাভ করতেন না। লাভ করতেন না রামায়ণের রামচন্দ্রও। শুধু সত্য কথা বলার জোরেই জাবালি সত্যকামের ব্রাহ্মণত্ব প্রতিপন্ন হয়েছিল। এখানেও প্রথম মিথ্যাবাদিতা এবং ছলনা কর্ণের অপরাধের মূল সে কথা আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় পরশুরামের পরবর্তী উক্তি থেকে। পরশুরাম বললেন–যুদ্ধে তোর মতো ক্ষত্রিয় এই পৃথিবীতে মিলবে না। কিন্তু তবু তুই এখনই এই আশ্রম ছেড়ে চলে যা, কারণ আমার এখানে তোর মতো মিথ্যাচারীর কোনও স্থান নেই–গচ্ছেদানীং ন তে স্থান অন্তস্যেহ বিদ্যতে।
অত ধৈর্য ধরে, অমন বিষম যন্ত্রণা সহ্য করে যে গুরুভক্তি কর্ণ দেখিয়েছিলেন, তার ফল তিনি পরশুরামের কাছে পেলেন এই মহান আশীর্বাদে–তোর মতো যুদ্ধবীর ক্ষত্রিয় পৃথিবীতে থাকবে না–ন ত্বয়া সদৃশো যুদ্ধে ভবিতা ক্ষত্রিয়ো ভুবি। বাস! এইটুকুই। কিন্তু এর বেশি তিনি যা চেয়েছিলেন পরের হত্যার আকাঙ্ক্ষায়, অস্ত্রলোভে এবং মিথ্যাচারিতায়, সেটুকু–সেই মারণাস্ত্রের ব্যবহার ক্ষমতা তার নিজেরই প্রবঞ্চনায় নিজের কাছে অধরা রয়ে গেল।
আমরা জানি–জন্ম থেকে কর্ণের দুর্ভাগ্যের জন্য তাঁর প্রতি আমাদের চরম মায়া আছে। সে মায়া আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন করুণরসাহূদী কবিরা–কাশীরাম থেকে রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল পর্যন্ত। কিন্তু কর্ণ-চরিত্রের প্রতি সমস্ত মায়া সত্ত্বেও মহাভারতের কবি দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে কীভাবে একটি শৈশবে মাতৃ-পিতৃহারা বালকের জীবন পরিবেশগত কারণে বিকারগ্রস্ত হতে থাকে। অর্জুনের প্রতি তার অকারণ আক্রোশ তৈরি হওয়ার কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু শুধু দুর্যোধনের বন্ধুত্ববশত তারই মতো পাণ্ডব-বিদ্বেষ এই অসাধারণ বালকের মধ্যে অনুস্যুত হয়েছিল বলে কর্ণের মনস্তত্ত্বও সেইভাবে এক বিকৃত আকার ধারণ করতে থাকে।
লক্ষ্য করে দেখুন, মহাভারতের কবি জানিয়েছেন–মাহেন্দ্র পর্বত থেকে ফিরে এসেই কর্ণ প্রথম দেখা করলেন দুর্যোধনের সঙ্গে এবং তাঁর কাছে আবারও ফের একটি মিথ্যা কথা বললেন। বললেন–~দুর্যোধন আমি সমস্ত অস্ত্রে সিদ্ধ হয়ে ফিরেছি–দুর্যোধনমুপাগম্য কৃস্ত্রো স্মীতি চাব্রবীৎ। শাশ্বতিক বিরোধ–বশে যিনি পাণ্ডব–বিদ্বেষী হয়েছেন সেই দুর্যোধন যে পরশুরামের শিক্ষাগার–ফেরত কর্ণকে আরও বেশি পছন্দ করবেন, তাতে সন্দেহ কী? অতএব দুজনে দুজনকে পেয়ে পরম আহ্লাদিত হলেন–দুর্যোধনেন সহিতো মুমুদে ভারতৰ্ষভ।
আমরা আগে বলেছি–অতিশয় শক্তিমান মানুষ যদি কুসঙ্গে বর্ধিত এবং লালিত হয় তবে তা অন্যতর বিপদ ডেকে আনে। মহেন্দ্র পর্বত থেকে ফিরে এসে কর্ণ সেই মানুষটার সঙ্গে আবারও জুটে গেলেন, যার সঙ্গে অর্জুনের শত্রুতা আছে, যার সঙ্গে পাণ্ডবদের বৈরিতা আছে। পরশুরাম তার বীরোত্তমের সার্টিফিকেট দিয়েছেন সেই ভরসায় কর্ণ আবারও অর্জুন-বিরোধিতায় মন দিলেন।
যাঁরা ভাবেন–অস্ত্রপরীক্ষার দিনে কর্ণ ধূমকেতুর মতো রঙ্গস্থলে উদয় হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন, তাদের জানাই। তারা যেন মহাভারতের কবির সংবাদটুকু মাথায় রাখেন। যেন মনে রাখেন–কর্ণ মহেন্দ্র-পর্বত থেকে এসে সোজা দুর্যোধনের সঙ্গেই দেখা করেছিলেন। পিতা অধিরথের কাছেও তিনি যাননি, জননী রাধার কাছেও না। সুদূর চম্পানগরীতে বসে পিতা অধিরথ হয়তো শুধু এইটুকু খবর পেয়েছিলেন যে, কর্ণ হস্তিনাপুরে পৌঁছেছেন কুশলে। তিনি হয়তো পুত্ৰমুখ দেখার জন্য রওনা দিয়েছেন হস্তিনার পথে।
আমাদের বিশ্বাস–এইমাত্র যে অসাধারণ যুবক উন্মুক্ত রঙ্গমঞ্চে বাহু-স্ফোটন করতে করতে প্রবেশ করলেন, তার প্রবেশ পূর্বেই পরিকল্পিত এবং হয়তো বা তা দুর্যোধনেরই পরিকল্পনা। আমরা জানি–দ্রোণাচার্যের প্রতি কর্ণের কিছু মানসিক আক্রোশ ছিলই, কেন না তিনি তাকে ব্রহ্মাস্ত্র-শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অন্যদিকে কর্ণ জানতেন যে, আজকের রঙ্গমঞ্চে কুরুবৃদ্ধদের সামনে এবং সমবেত পৌর-জনপদবাসীদের সামনে দ্রোণের প্রধান আকর্ষণ থাকবেন অর্জুন। তিনি তাঁর অস্ত্রের কৌশলে জনতার জয়কার লাভ করবেনই এবং দ্রোণ-গুরুর বক্ষ স্ফীত হবে তাতে। অতএব যে মুহূর্তে অর্জুনের ধনুর্বেদ কৌশল চরমে উঠবে তখন যদি কর্ণ রঙ্গমঞ্চে আকস্মিকভাবে উপস্থিত হয়ে অর্জুনের সমস্ত ক্ষমতা নস্যাৎ করে দেন, তাতে যেমন অর্জুনের ধনুঃশরের ক্রীড়ারস খাটো হয়ে যাবে, তেমনই তাতে দ্রোণগুরুরও পরোক্ষ অপমান ঘটবে যথেষ্ট। কেন না দ্রোণের কাছে শিক্ষা গ্রহণ না করেও যদি অর্জুনের মতোই ধনুঃবেদকৌশল প্রমাণ করা যায়, তাতে অর্জুনের যত অপমান, দ্রোণেরও ততই অপমান।
আমরা তাই অনুমান করি–কর্ণ যে আজ এই মুহূর্তে হাততালি দিতে দিতে রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন সে ঘটনা মোটেই কাকতালীয় নয়। দুর্যোধনের সঙ্গে পূর্বেই তিনি মিলিত হয়েছেন এবং হয়তো দুর্যোধনের পরিকল্পনামতোই আজ অর্জুনের অস্ত্র–প্রদর্শনীর শেষ মুহূর্তে তিনি উপস্থিত হয়েছেন রঙ্গমঞ্চে। কর্ণকে দেখে দুর্যোধনরা একশো ভাই ঘিরে ধরলেন তাকে। তাদের সাদর অভিবাদন গ্রহণ করতে করতে কর্ণ রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন। হাততালি বা বাহু-স্ফোটন করার সময় তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন দৌবারিকের পিছনে। কিন্তু কৌরব রাজপুত্রেরা কর্ণকে সাদর আলিঙ্গন করার সঙ্গে সঙ্গে দৌবারিকেরা সসম্ভ্রমে কে না কে এসেছেন ভেবে বিস্ময়ে চোখ বড় করে কর্ণকে পথ ছেড়ে দিল–দত্তেবকাশে পুরুষৈ-বিস্ময়োৎফুল্ললোচনৈঃ। শত্রুর নগর বিজয় করে এলে যে মর্যাদা এক মহাবীরকে স্পর্শ করে কর্ণ ঠিক সেই মর্যাদায় রঙ্গ-প্রবেশ করলেন।
