কীটের রক্তপানের অনুষঙ্গে শীতল রক্তধারা বইতে লাগল কর্ণের ঊরু থেকে আর সেই শীতল স্পর্শেই পরশুরামের ঘুম ভেঙে গেল। তারও মুখে গায়ে রক্ত লেগে আছে। পরশুরাম বেশ বিরক্ত হলেন। ব্রত-নিয়মের দিনে এই রক্তের স্পর্শে তিনি বড়ো অশুচি বোধ করলেন। কর্ণকে বললেন–তুমি কী করছ বসে বসে, আজ আমি এই শোণিতস্পর্শে এইভাবে অশুচিতা লাভ করলাম–অহোস্মি অশুচিতাং প্রাপ্তঃ কিমিদং ক্রিয়তে ত্বয়া। তুমি নির্ভয়ে সব কথা খুলে বলো তো আমাকে, কী হয়েছে?
কর্ণ সবিনয়ে সেই কৃমিকীটের ভক্ষণ-যন্ত্রণা নিবেদন করলেন পরশুরামকে। মহাভারতের কবিকল্পে এই কীট পূর্বজন্মে এক অভিশাপগ্রস্ত রাক্ষস ছিল। তার নাম মেঘবাহন। সে পরশুরামের দর্শনে মুক্ত হবে এই ভবিতব্যে আজ তার পরম মুক্তিও ঘটল। কিন্তু নিজে মুক্ত হয়ে সে কর্ণকে যে যন্ত্রণা দিয়ে গেল, তাই শুধু নয়, সেও কর্ণের ভবিতব্য তৈরি করে গেল। পরশুরাম এই প্রথম সন্দেহ করলেন কর্ণকে।
পরশুরাম কর্ণের দিকে রক্তচক্ষু তাকিয়ে বললেন–ওরে মূর্খ! এই নিদারুণ কষ্ট কোনও ব্রাহ্মণের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। সামান্য কীট দংশনেই কোমল–প্রকৃতি ব্রাহ্মণ চেঁচিয়ে উঠবে–অতিদুঃখমিদং মূঢ় ন জাতু ব্রাহ্মণঃ সহে। এতক্ষণ ধরে এই ভয়ানক দংশন সহ্য করে তুই যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিস–এ শুধু ক্ষত্রিয়ের পক্ষেই সম্ভব। তুই ঠিক ঠিক বল তো তুই ব্রাহ্মণ না ক্ষত্রিয়? কর্ণ আবারও অভিশাপের ভয় পেলেন এবং সত্যি কথা বলতেও বাধ্য হলেন। বললেন–গুরুদেব। আমি ব্রাহ্মণও নই, ক্ষত্রিয়ও নই। আমার জন্ম হয়েছে সেই ঘরে, যে ঘরে এক ক্ষত্রিয় পুরুষ পরম প্রেমে এক ব্রাহ্মণীর পাণিগ্রহণ করেছিল। আমি সূত জাতীয়–ব্রহ্ম-ক্ষত্রান্তরে জাতং সূতং মাং বিদ্ধি ভার্গব। আমাকে লোকে রাধেয় কর্ণ-রাধার ছেলে বলে ডাকে।
আজকের এই বিপন্ন মুহূর্তে কর্ণ তার মিথ্যা শব্দ–আমি ভার্গব ব্রাহ্মণ–এই মিথ্যা পরিচয় মিথ্যা করে দিয়ে সত্যবাক্য উচ্চারণ করলেন–আমি অধিরথ সূতপুত্র রাধা-গর্ভজাত–রাধেয়ঃ কর্ণ ইতি মাং প্রবদন্তি জনা ভুবি।
.
১০৬.
পুরুষকারের জয়ঘোষে কর্ণ চিরকাল নিজেকে রাধেয় কর্ণ বলে নিজের পরিচয় দিয়ে এসেছেন, আজকে গুরু পরশুরামের সামনে তিনি সেই আত্মপরিচয় দিলেন মিনমিন করে। কারণ তিনি মিথ্যা কথা বলে পরশুরামের শিষ্যত্ব লাভ করেছিলেন। আজকে যখন গুরুর সামনে ধরা পড়ে গেলেন, তখন নিরুপায় হয়ে নিজের পরিচয় দিয়েছেন, তবু কিন্তু পিতার নাম উচ্চারণ করেননি। আমি সূত-জাতীয় এই পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও সূত-জাতির মূল যেহেতু ক্ষত্রিয় পিতা এবং ব্রাহ্মণী মাতা তাই হয়তো উঁচু ঘরের মেয়ে রাধার পরিচয়ে কর্ণ বিখ্যাত হতে চেয়েছেন। অথবা একজন ব্রাহ্মণীর পরিচয়ে যদি পরশুরামের হৃদয় বিগলিত হয়, তাই কর্ণ সূত পরিচয় দিয়েই–লোকে আমাকে রাধার ছেলে রাধেয় বলেই ডাকে বলে পরশুরামকে জানিয়েছেন।
কর্ণ নিজের লোভাতুরতার কথাও গোপন করেননি। দ্রোণাচার্যের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র-লাভের আতুরতা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি যে ব্রহ্মাস্ত্রের লোভেই পরশুরামের কাছে এসেছিলেন, সে কথা অকপটে স্বীকার করে তিনি বললেন–আমি অস্ত্রের লোভেই আমার মিথ্যা পরিচয় দিয়েছিলাম, আপনি ক্ষমা করুন ভগবন–প্রসাদং কুরু মে ব্ৰহ্মণ অস্ত্রলুব্ধস্য ভার্গব। বিপন্ন অবস্থায় নিজের তৈরি অজুহাতটুকুও ব্যক্ত করতে ভুললেন না কর্ণ। বললেন–দেখুন, গুরু মানেই তো পিতা। তো আমি যখন আপনার শিষ্য হলাম, তখন আমি তো আপনার পুত্ৰই হলাম। অতএব আপনার গোত্ৰনামেই আমি আমার নিজের পরিচয় দিয়েছি ভার্গব বলে–অতো ভার্গব ইত্যুক্তং ময়া গোত্রং তবান্তিকে।
লক্ষণীয়, গুরুপরম্পরায় শিষ্যের যে পুত্রত্ব সিদ্ধ হয়, সেটা খুবই পুরনো কথা। বৈয়াকরণ-পিতা পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীতে পুত্রের মতো একই তদ্ধিত প্রত্যয়ে শিষ্যের পুত্রত্ব সিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হল গুরুর গোত্রে শিষ্যের পুত্র-পরিচয় সিদ্ধ হয় শিষ্যত্ব লাভের পর, শিষ্য হবার আগেই নয়। এতে আরও ভাল করে বোঝা যায় যে, ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের লোভেই কর্ণ ঈষৎ চাতুরী করেছিলেন পরশুরামের সঙ্গে। এখন সব ধরা পড়ে যাবার পর হাজার সত্য কথা বলেও পরশুরামকে তিনি বোঝাতে পারছেন না। গুরুর জন্য, গুরুভক্তির জন্য যে অসহ্য কীট-দংশন তিনি সহ্য করলেন, তাতেও যেমন পরশুরামের হৃদয় বিগলিত হল না, তেমনই তার এই মুহূর্তের সত্যভাষণের কোনও ফল হল না। আপন সত্য পরিচয় দিয়ে কর্ণ এখন ভয় পেয়েছেন। ভয়ে কম্পমান এখন তিনি হাত জোড় করে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন পরশুরামের পায়ের কাছে–ভূমৌ নিপতিতং দীনং বেপমানং কৃতাঞ্জলি।
পরশুরামের দয়া হল না। বেচারা কর্ণ, ভাগ্যের দোষে এবং নিজের দোযে বিড়ম্বিত কর্ণ। পরশুরাম অভিশাপ উচ্চারণ করে বললেন,–তুই যখন শুধুমাত্র অস্ত্রের লোভে আমার সঙ্গে মিথ্যাচারণ করেছিসযস্মান্মিথ্যোপচরিতো হ্যস্ত্রলোভাদিহ ত্বয়া–অতএব এই ব্রহ্মাস্ত্র তোর কাছে প্রতিভাত হবে না। যদি বা অন্য কোনও সময়ে এই ব্রহ্মাস্ত্রের শিক্ষা তোর মাথাতে আসেও, কিন্তু বিপন্ন মুহূর্তে যখন তোর বধকাল ঘনিয়ে আসবে, তখন এই ব্রহ্মাস্ত্র ক্ষেপণের কৌশল তোর মাথায় কাজ করবে না। তুই মিথ্যাবাদী, তুই অব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র কখনও থাকতে পারে না–অব্রাহ্মণে ন হি ব্ৰহ্ম ধ্রুবং তিষ্ঠেৎ কদাচন।
