যাই হোক, মহেন্দ্র-পর্বতে কর্ণের অস্ত্রশিক্ষা আরম্ভ হল। অর্জুনের সঙ্গে তুলনায় যাই হোন, কর্ণ মানুষটিও তো আর কম বড় নন! অতএব সেখানে থাকতে থাকতে অনেক দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ-রাক্ষসের সঙ্গে কর্ণের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কর্ণ ভৃশ্রেষ্ঠ পরশুরামের কাছে অস্ত্রবিদ্যার পাঠ নিয়মিত নিয়ে যাচ্ছেন, এই সময়েই একটি অঘটন ঘটে গেল। দিন-রাত মুক্ত তরবারি আর ধনুক-বাণ ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এবং যেখানে সেখানে লক্ষ্যভেদ অনুশীলন করার ফলে একদিন নিজেরই অজ্ঞাতে কর্ণ এক গভীর অন্যায় করে ফেললেন।
জায়গাটা ছিল সমুদ্রের তীরঘেঁষা এক অরণ্যভূমি। প্রাকৃতিক পরিবেশ অতি মনোরম। আর ঠিক এইখানেই এক আরণ্যক মুনির আশ্রম। কর্ণ এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ধনুক-বাণ কাঁধে, হাতে খঙ্গস কদাচিৎ সমুদ্রান্তে বিচরন্নাশ্রমান্তিকে। ব্রাহ্মণ অগ্নিহোত্র করতে বসেছেন আশ্রমের বাইরে আর তার হোমধেনুটি কাছেই চরে বেড়াচ্ছিল বৃক্ষচ্ছায়াসমন্বিত বনভূমির এখানে ওখানে। কর্ণ অতশত খেয়াল করেননি। হোমধেনুটির নড়াচড়া দেখেই তিনি একটি বাণ মুক্ত করলেন অজ্ঞাত কোনও পশু মনে করে। ধেনুটি মারা পড়ল এবং কর্ণ প্রমাদ গণলেন অগ্নিহোত্রে নিযুক্ত ব্রাহ্মণের কথা মনে করে। কোনও উপায় না দেখে কর্ণ ব্রাহ্মণের পায়ে পড়ে বললেন–আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি বুঝতেই পারিনি এটি একটি হোমধনু। আমি অজ্ঞানতাবশত এই অন্যায় করে ফেলেছি–অবুদ্ধিপূর্বং ভগবন্ ধেনুরেষা হতা তব! আপনি প্রসন্ন হোন।
সেকালের দিনে এক অযাচিতবৃত্তি ব্রাহ্মণ, যিনি লোকালয় ছেড়ে সমুদ্রের তীরে অরণ্যভূমিতে বাসা বেঁধেছেন, তার কাছে একটি দুগ্ধবতী গাভাই তার জীবন-ধারণের একমাত্র উপায়। অতএব সে ক্ষতি তো আছেই, তার ওপরে আছে গোহত্যার পাপ। দুগ্ধবতী গাভী যেহেতু বৈদিক এবং বৈদিকোত্তর যুগেও জীবন ধারণের উপায় ছিল, অতএব গোহত্যা ভয়ঙ্কর পাপ বলেই গণ্য হত। ব্রাহ্মণ তাই মোটেই প্রসন্ন হলেন না। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে কর্ণের প্রতি অভিশাপ–বাক্য উচ্চারণ করলেন–তুই যার সঙ্গে প্রতিস্পর্ধা করে দিনরাত এই অস্ত্রাভ্যাস করে যাচ্ছিস, তারই সঙ্গে শেষ যুদ্ধ করার সময় তোর রথের চাকা বসে যাবে মাটিতে–যুধ্যতস্তেন তে পাপ ভূমিশ্চক্রং গ্রসিষ্যতি। সেই মরণ-যুদ্ধে তোর শত্রুই তোকে বধ করবে, নরাধম! তুই এখন যা এখান থেকে। তুই যেমন পাগলের মতো এই হোমধেনুটিকে মেরেছিস, মেদিনী রথচক্র গ্রাস করলে তেমনই পাগল দশা হবে তোর। আর সেই অবস্থাতেই তোর শত্রু তোর শিরচ্ছেদ করবে।
কর্ণ অনেক অনুনয়-বিনয় করলেন ব্রাহ্মণের কাছে। অনেক টাকা-পয়সা ধন-রত্ন এমনকি অনেক গোরুও কিনে দিতে চাইলেন–গোভির্ধনৈশ্য রত্নেশ্চ। কিন্তু ব্রাহ্মণের মন গলল না তাতে। তিনি বললেন–তুই এখান থেকে চলেই যাস, আর এখানেই বসে থাক, অথবা যা ইচ্ছে কর, আমার কথা মিথ্যে হবে না–গচ্ছ বা তিষ্ঠ বা যদ্বা কার্যং তে তৎ সমাচর। আর কোনও উপায় নেই দেখে কর্ণ ভীতমনে ফিরে এলেন পরশুরামের আশ্রমে। কিন্তু এই ঘটনা সম্বন্ধে পরশুরামকে তিনি কিচ্ছুটি বললেন না।
আসলে কর্ণের ভাগ্যটাও খুব খারাপ। শুধুমাত্র পুরুষকারে একটি মানুষ বহুদূর যেতে পারে বটে, কিন্তু ভাগ্য সহায় থাকলে তার আরও উন্নতি ঘটে। কিন্তু কর্ণের ভাগ্য সব সময় তার সঙ্গে প্রতারণা করছে। এমনকি গুরু পরশুরামের আশ্রমেও তাঁর শেষ রক্ষা হল না। কর্ণের আপন বাহুবীর্যে, গুরুসেবায় এবং শম-দমের চেষ্টা দেখে গুরু পরশুরাম যথেষ্টই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তিনি খুশি হয়ে কর্ণের বহু কামিত সেই ব্রহ্মাস্ত্র-ক্ষেপণের বিধি-নিয়ম এবং তা সম্বরণ করার উপায়–সবটাই শিখিয়ে দিলেন কর্ণকে–তস্মৈ স বিধিবৎ কৃৎস্নং ব্রহ্মাস্ত্রং সনিবর্তন। কর্ণের কতকালের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হল। গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে চেষ্টা করে যা হয়নি, এখানে তা অনায়াসলভ্য হল পরশুরামের সন্তুষ্টিতে। তিনি ধনুর্বেদে আরও যত্ন নেওয়া আরম্ভ করলেন এবং এমনও হয়তো ভাবলেন যে পূর্বোক্ত ব্রাহ্মণের অভিশাপটুকু ফলবার আগেই তিনি অর্জুনকে শেষ করে ফেলবেন। এই ভেবেই কর্ণ ধনুর্বেদ অভ্যাস, ব্রহ্মাস্ত্র ক্ষেপণ-সম্বরণের অভ্যাস করে যাচ্ছিলেন যথাসাধ্য যথামতি। এই সময়ে আবারও একটি ঘটনা ঘটল যা তার চরম পুরুষকারের গতি রোধ করল।
সেদিন কোনও বিশেষ ব্রত-নিয়ম পালন করার জন্য বৃদ্ধ পরশুরাম উপবাস করে ছিলেন। সারাদিন ব্রত–নিয়ম উপবাসে তার বৃদ্ধ শরীর কিছু ক্লান্ত হয়েছে। তিনি কর্ণের সঙ্গে আশ্রমের কাছেই একটা ফাঁকা জায়গায় একটু হাঁটাহাঁটি করছিলেন–কর্ণেন সহিতো ধীমান্ উপবাসেন কর্শিতঃ। কিন্তু উপবাস–ক্লিষ্ট শরীরে এই হাঁটাহাঁটি তার পোযাচ্ছিল না তিনি এক জায়গায় বসে পড়লেন। মুক্ত প্রকৃতি এবং আরণ্যক সমীরণে তার নিদ্রাকর্ষণ হচ্ছিল। এক সময় তিনি কর্ণের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন–কর্ণস্যোৎসঙ্গ আধায় শিরঃ ক্লান্তমনা গুরুঃ।
ঘুমিয়ে আছেন গুরু–এই সময়ে একটি কাঁকড়া বিছে ধরনের একটি কীট অথবা মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী সেটি একটি জোঁকও হতে পারে–অথ কৃমি শ্লেষ্ম-মেদো-মাংস শোণিত-ভোজনঃ–সেই রকম একটি কীট কর্ণের উরুভেদ করে রক্ত খেতে লাগল। গুরু পরশুরামের ঘুম ভেঙে যাবে বলে কর্ণ একটুও নড়লেন না, কৃমিকীটটিকে দূরে নিক্ষেপ করারও চেষ্টা করলেন না অথবা সেটাকে মেরে ফেলারও চেষ্টা করলেন না–ন চৈনমশকৎ ক্ষেং হং বাপি গুরোর্ভয়াৎ! কীট কর্ণের উরুমাংস ভেদ করে যথেচ্ছ রক্তপান করতে লাগল, কর্ণের যন্ত্রণাও বাড়তে লাগল। অসহ্য বেদনা ভোগ করেও কর্ণ বীর স্থৈর্য নিশ্চল হয়ে রইলেন–কর্ণস্তু বেদনাং ধৈর্যাদসহ্যং বিনিগৃহ্য তাম্। অপেক্ষা করতে লাগলেন–কখন গুরুর ঘুম ভাঙে। নিষ্কম্প, ধীর, নিশ্চল কর্ণ গুরুর মাথাটি ধারণ করে রইলেন আপন মহিমায়–অকম্পয়ন্ অব্যথয়ন্ ধারয়ামাস ভার্গবম্।
