আসলে কর্ণ এটাও বুঝে গিয়েছিলেন যে, যেখানে তিনিও আছেন এবং অর্জুনও আছেন, সেখানে অর্জুনকে অতিক্রম করে তার পক্ষে গুরু দ্রোণাচার্যের কাছ থেকে কিছু বাগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তার এই মানসিক প্রস্তুতি ছিল বলেই তিনি দ্রোণাচার্যকে সঙ্গে সঙ্গে সেলাম ঠোকার মতো সামান্য অভিবাদন জানিয়েই–আমন্ত্র প্রতিপূজ্য চ–সোজা চলে গিয়েছিলেন মহেন্দ্র পর্বতে। মহেন্দ্র পর্বতে আছেন পরশুরাম। সেই পরশুরাম যিনি একুশবার ক্ষত্রিয় নিধন করেছেন নির্বিচারে। সেই পরশুরাম, যাঁর কাছে ভীষ্ম অস্ত্র শিক্ষা করেছিলেন, যাঁর কাছে দ্রোণাচার্য লাভ করেছিলেন দিব্য অস্ত্রশস্ত্র। অবশ্য ভীষ্ম-দ্রোণের গুরু পরশুরাম আর কর্ণের গুরু পরশুরাম এক ব্যক্তি নাও হতে পারেন। কারণ আগেই বলেছি–পরশুরাম মানে একটি ইনস্টিটিউশন। শিষ্য-পরম্পরায় এই ইনস্টিটিউশন চলে আসছে এবং এঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ক্ষত্রিয় রাজশক্তির বিরুদ্ধতা। অর্থাৎ কোথাও কুত্রাপি যদি ক্ষত্রিয় রাজশক্তি ব্রাহ্মণ্যের বিরুদ্ধ আচরণ করে, তবে পরশুরামগণ পরম্পরাগতভাবে তাদের শাস্তি দেন।
অতএব এমনই এক পরশুরামের কাছে বিদ্যালাভ করতে এসে আমি ক্ষত্রিয়–এই পরিচয় দেওয়া কর্ণের পক্ষে কঠিন ছিল, ঠিক যতটা কঠিন ছিল কর্ণের পক্ষে বলা–আমি অধিরথ–সূতপুত্র রাধাগর্ভজাত। কারণ এই পরিচয় তৎকালীন সমাজের চাতুর্ণিক তারতম্যের নিরিখে পরশুরামের কাছে তত সম্মানজনক হত না; বিশেষত পরশুরাম ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কাউকে অস্ত্রশিক্ষা দেন না। অতএব মহেন্দ্র পর্বতে গিয়ে পরশুরামের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে কর্ণ বললেন–আমি ভার্গব গোত্রের ব্রাহ্মণ, আপনার কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে চাই–ব্রাহ্মণো ভার্গবোশ্মীতি গৌরবেনাভ্যগচ্ছত। ভরদ্বাজ নয়, কাশ্যপ নয়, একেবারে ভার্গব। পরশুরাম নিজে ভূগুবংশীয় জাতক। তিনি নিজে ভার্গব। অতএব এতদিন পর একটি ভার্গব ব্রাহ্মণ তাঁর কাছে বিদ্যা শিখতে আসায় পরশুরাম বেশ খুশি–খুশি মনে কর্ণকে রীতিমতো স্বাগত জানালেন–স উক্তঃ স্বাগতঞ্চেতি প্রতিমাংশ্চভব শম্।
কর্ণ যে পরশুরামের কাছে মিথ্যা কথা বলে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন, তার কারণ। একটাই। তিনি সেই মারণাস্ত্র ব্রহ্মাস্ত্র লাভ করতে চান অর্জুনের সমকক্ষ হবার জন্য। টীকাকার নীলকণ্ঠ কর্ণকে একটু বাঁচাবার চেষ্টা করেছেন। আর করবেনই বা না কেন! শৈশবে পিতৃ-মাতৃহীন কর্ণের প্রতি আমাদের যেমন মায়া আছে, তেমনই নীলকণ্ঠেরও মায়া আছে। পরবর্তী সময়ে কর্ণের একটি মন্তব্য মনে রেখে নীলকণ্ঠ লিখেছেন–কর্ণ যে নিজেকে ভার্গব বলে নিজের পরিচয় দিলেন, তার কারণ তিনি ভেবেছিলেন–শিষ্য তো পিতার সমান। অতএব ভার্গব পরশুরামকে তিনি যখন গুরু বলে মেনেছেন, সেখানে নিজেকে ভার্গব বলে পরিচয় দিলে ক্ষতি কী–গুরুরেব পিতেতি অভিসন্ধায় আহ-ব্রাহ্মণো ভার্গবোস্মি।
কর্ণের প্রতি মায়ায় আমাদেরও এই যুক্তি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু অর্জুনের প্রতি কর্ণের অসম্ভব হিংসা লক্ষ্য করে আমরা প্রথম থেকেই কর্ণ-চরিত্রের নিরপেক্ষ বিচার করতে চাই। কর্ণ যে ছোটবেলা থেকেই পাণ্ডবদের প্রতি ভয়ঙ্কর রকমের বিদ্বিষ্ট হয়ে উঠলেন, তার পিছনে নির্দিষ্ট কোনও কারণ থাকতে পারে না, একমাত্র দুর্যোধনের প্ররোচনা ছাড়া। মহাভারতের কবি এই বিদ্বেষের কারণ হিসেবে একটি অসাধারণ মন্তব্য করে বলেছেন–দৈবাচ্চাপি স্বভাবতঃ। অর্থাৎ এক পরম দুর্দৈব তো বটেই, কিন্তু এখানে কর্ণের স্বভাবও কিছুটা দায়ী। দুর্দৈব এইজন্য যে, কর্ণ কুন্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্রের মর্যাদা পেতে পারতেন, অথচ তিনি তাঁর পাঁচ ভাইকে ভাই বলে জানেনই না। আর স্বভাবটার জন্য তিনি নিজে যত দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী তার পরম বন্ধু দুর্যোধন।
শৈশব থেকে পিতা-মাতার পরিত্যক্ত এবং অন্যের ঘরে লালিত বলে তিনি স্বভাবতই একটু আবেগপ্রবণ, আর দুর্যোধনের সঙ্গে দ্রোণের শিক্ষাশ্রমেই তার বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়ায় এই আবেগ দুর্ব্যবহৃত হয়েছে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে, বিশেষত তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অর্জুনের বিরুদ্ধে। নইলে দেখুন, সেই বাল্যকালে–যখন অর্জুনের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি, কর্ণেরও নয়, তখনই কর্ণের মনে অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধের প্রবৃত্তি আসবে কেন–অর্জুনেন সমং চাহং যুদ্ধেয়মিতি মে মতিঃ। শুধুমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এই যুদ্ধবাসনা তৈরি হয়েছে, তা নয়। হয়েছে প্রতিহিংসায় এবং এই প্রতিহিংসা জাগিয়ে তুলেছেন স্বয়ং দুর্যোধন। মহাভারতের কবির মন্তব্য-স্বভাব শব্দটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টীকাকার নীলকণ্ঠ একটি শ্লোক তুলে কর্ণের সম্বন্ধে বলেছেন–একজন মানুষ যদি হীন কুলে জন্মগ্রহণ করে, তবে তার মধ্যে অনেক সামাজিক জটিলতা কাজ করতে থাকে এবং এই জটিলতার মধ্যে সে মানুষ আবার যদি অসাধারণ গুণসম্পন্ন বা অসামান্য শক্তিধর হয় এবং তার ওপরেও সে যদি খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে–বীর্যাধিকো নীচকুলো দুঃসঙ্গেন সমেধিতঃ–তবেই সে বড় মানুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে থাকে, তাদের তাচ্ছিল্যও করতে থাকে।
নীচকুল কথাটা যদি তৎকালীন চাতুর্বর্ণের নিরিখে খারাপ লাগে শুনতে, তবে আজকের নিরিখে শব্দটাকে অল্পসত্ত্বতা বা হীনসত্ত্বতায় রূপান্তরিত করুন। অর্জুন কর্ণের প্রতিস্পর্ধী হতেই পারেন, কিন্তু দুর্যোধনের সঙ্গে মিলে মিশে দুর্যোধনের পাণ্ডব-বিদ্বেষের ছায়া খুব সহজেই পড়েছিল তার আবেগপ্রবণ মনে আর সেই জন্যই সোজাসুজি অতি-পরিশ্রমে অতি বিনয়-শিক্ষায় তিনি ব্রহ্মাস্ত্র লাভের কথা ভাবছেন না। ভাবছেন–যেন তেন প্রকারেণ ব্রহ্মাস্ত্র তার চাই। আর সেই জন্যই তার মহেন্দ্রপর্বতে পরশুরামের কাছে আসা এবং মিথ্যা পরিচয় দিয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করাটা কর্ণ চরিত্রের সঙ্গে বেমানান হয়নি।
